ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শিশুর এসিড রিফ্লাক্স: লক্ষণ ও করণীয়

শিশুর এসিড রিফ্লাক্স: লক্ষণ ও করণীয়
×

 ড. আহাদ আদনান

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ | ০৭:২৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের খাদ্যনালি ও পাকস্থলীর সংযোগস্থলে প্রাকৃতিকভাবে একটি আংটা বা ভালভ থাকে, যা খাবারকে পাকস্থলীতে আটকে রাখে এবং ওপরে উঠে আসা প্রতিরোধ করে। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে অনেক সময় এই সংযোগস্থলটি ঢিলে থাকে, ফলে পাকস্থলীর খাবার পুনরায় খাদ্যনালিতে উঠে আসে; যাকে আমরা রিফ্লাক্স বমি বলি। এটি সাধারণত জন্মের দ্বিতীয় বা তৃতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু হয়ে ১-২ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
ঘটনা ১: ১২ মাস বয়সী শিশু শ্বাসকষ্ট ও বুকের ভেতর বাঁশির মতো শব্দের সমস্যায় ভুগছিল। বারবার নেবুলাইজ করার পরও উন্নতি হচ্ছিল না। কারণ অনুসন্ধানে দেখা যায়, শিশুটিকে পাতলা সুজি খাওয়ানো হতো এবং সে খাওয়ার সময় নিয়মিত বমি করত।
ঘটনা ২: ৬ মাস বয়সী একটি শিশু তীব্র অপুষ্টি ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিল। জন্মের পর থেকে পাতলা কৌটার দুধ খাওয়ানোর ফলে বমির অংশ শ্বাসনালিতে ঢুকে এই জটিল অবস্থার সৃষ্টি হয়।
ঘটনা ৩: চার বছর বয়সী একটি শিশু কেবল বমির সমস্যায় নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে আসত। তার শারীরিক বিকাশ ও ওজন স্বাভাবিক থাকলেও কেবল খাওয়ানোর ভুল ভঙ্গির কারণে সমস্যার সমাধান হচ্ছিল না।

রিফ্লাক্সের লক্ষণ ও জটিলতা
এই সমস্যায় আক্রান্ত শিশুরা খিটখিটে মেজাজের হয়, খাবার দেখলেই কান্নাকাটি বা অনীহা প্রকাশ করে। এছাড়া শরীর বা ঘাড় বাঁকা করে মোচড়ানো এবং দম আটকে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। দীর্ঘমেয়াদি রিফ্লাক্সের ফলে নিচের জটিলতাগুলো হতে পারে:
শ্বাসনালিতে খাবার ঢুকে দম বন্ধ হওয়া
বুক থেকে দীর্ঘমেয়াদি শোঁ-শোঁ শব্দ হওয়া (যা অনেক সময় হাঁপানির মতো মনে হয়)।
কান পাকা রোগ, সাইনাসের প্রদাহ ও গলার স্বর ফ্যাঁসফ্যাঁসে হওয়া।
বুকের ব্যথা এবং ওজন ঠিকমতো না বাড়া।

রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা
বয়স ও লক্ষণের ওপর ভিত্তি করে রোগ নির্ণয় করা হয়। প্রয়োজনে বেরিয়াম এক্স-রে, খাদ্যনালির পিএইচ পরীক্ষা কিংবা এন্ডোস্কোপির প্রয়োজন হতে পারে। প্রচলিত ওষুধের পাশাপাশি জীবনযাত্রায় বিশেষ কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়।

করণীয়
খাবারের ধরন: পাতলা খাবার (সুজি, কৌটার দুধ, গরুর দুধ বা পাতলা সিরিয়াল) পরিহার করে ঘন ও শক্ত খাবার (হাতে মাখা ভাত, সবজি ইত্যাদি) অভ্যস্ত করতে হবে।
খাওয়ানোর নিয়ম: একবারে বেশি খাবার না দিয়ে অল্প অল্প করে বারেবারে খাওয়াতে হবে। জোরাজুরি করা যাবে না।
শারীরিক অবস্থান: শিশুকে শোয়ানো বা ভাঁজ করা অবস্থায় খাওয়ানো যাবে না। শরীর উঁচু করে খাড়া অবস্থায় রেখে খাওয়াতে হবে। (উল্লেখ্য: শুইয়ে খাওয়ানোর অভ্যাস শিশুদের কান পাকা রোগের ঝুঁকি বাড়ায়)।
পরিত্যাজ্য খাবার: অতিরিক্ত ঝাল, মশলা, লবণযুক্ত চিপস, কৃত্রিম রংযুক্ত জুস, চকলেট, টমেটো, পুদিনা, কোমল পানীয় ও কফি এসিড রিফ্লাক্স বাড়িয়ে দেয়, তাই এগুলো এড়িয়ে চলতে হবে।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে এবং শিশুকে ধোঁয়া ও ধূমপানের পরিবেশ থেকে দূরে রাখতে হবে।
রিফ্লাক্স যদি শিশুর ফুসফুসের গুরুতর ক্ষতি করে বা ওজন অস্বাভাবিকভাবে কমিয়ে ফেলে, তবে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে ছোট একটি অপারেশনের মাধ্যমে এই সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধান করা সম্ভব। 
[শিশু-রোগ বিশেষজ্ঞ, আইসিএমএইচ, মাতুয়াইল, ঢাকা]

আরও পড়ুন

×