রিজার্ভ চুরি: নিউইয়র্কের আদালতে মামলা বাতিলের আবেদন খারিজ
ফাইল ছবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২০২৩ | ১২:৩০ | আপডেট: ১৬ জানুয়ারি ২০২৩ | ১৭:৩৪
বাংলাদেশের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকসহ ৬ বিবাদীর 'মোশন টু ডিসমিস' বা মামলা না চালানোর আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন নিউইয়র্ক সুপ্রিম কোর্ট বা স্টেট কোর্ট। এতে রিজার্ভ চুরির দায়ে আরসিবিসিসহ অন্য ১৮ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মামলা চলতে কোনো বাধা থাকল না। একই সঙ্গে ২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে আরসিবিসিসহ অন্য বিবাদীদের মধ্যস্থতার নির্দেশ দিয়েছেন স্টেট কোর্ট। চুরির অর্থ উদ্ধারে মধ্যস্থতার দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে। জানা গেছে, চলতি মাসের শেষ দিকে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দল ফিলিপাইনে যাচ্ছে।
সংশ্নিষ্টরা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট কোর্টে বিবাদীদের আবেদন খারিজের রায় হয়েছে গত ১৩ জানুয়ারি। সেখানে আরসিবিসিসহ অন্য বিবাদীদের আগামী ২০ দিন অথবা ২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে আদালতের বাইরে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য মধ্যস্থতার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালতের নির্দেশনার আলোকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়োজিত বাংলাদেশের আইনি প্রতিষ্ঠান কোজেন ও'কনর মধ্যস্থতার বিষয়টি দেখবে। এ প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের রায়ের আলোকে এখন ফিলিপাইনে রিজার্ভ চুরিতে অভিযুক্ত পক্ষগুলোর সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা করা হবে। সমঝোতায় অর্থ ফেরতে রাজি হলে হয়তো চুরির সমপরিমাণ ও আইনি সহায়তার খরচ দাবি করবে বাংলাদেশ। তা না হলে আদালতের রায়ের অপেক্ষায় থাকতে হবে। চূড়ান্ত রায় বাংলাদেশের পক্ষে এলে সুদসহ চুরির অর্থ, যাতায়াতসহ আইনি সব খরচ এবং ক্ষতিপূরণ দাবি করবে বাংলাদেশ। যদিও আদালতের মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তি দীর্ঘমেয়াদি ও সময়সাপেক্ষ বিবেচনায় সমঝোতার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির জোর চেষ্টা করা হবে।
রিজার্ভ চুরির মামলায় বাংলাদেশের আইনজীবী ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি সমকালকে বলেন, এ রায়ের ফলে অর্থ ফেরত পাওয়ার আশা বেড়েছে। রিজার্ভের অর্থ চুরি হয়েছে নিউইয়র্ক থেকে। যে কারণে মামলাটি সেখানে করা হয়। তবে মামলা খারিজের আবেদন জানিয়েছিল আরসিবিসি, কিম অংসহ কয়েকজন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। তাদের আবেদনের শুনানি হয় বছর দেড়েক আগে। এখন মামলার রায়ে সব আবেদন খারিজ হয়েছে। ফলে মামলা চলবে।
মামলা চলবে কিনা, জানতেই এতদিন লাগল। তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে এ মামলার নিষ্পত্তি হতে কতদিন লাগতে পারে- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, নিউইয়র্ক আইন অনুযায়ী, মামলা চলার আগে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মতো মধ্যস্থতায় যেতে হয়। তাদের আইনে এটি বাধ্যতামূলক। সেখানে ফল পেলে মামলা শেষ হয়ে যাবে। তা না হলে সাক্ষ্য-প্রমাণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে হাজির করতে হবে। চূড়ান্ত রায় পেতে আরও ৩ বছর মতো সময় লাগতে পারে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের কাছে রিজার্ভের অর্থ হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে হাতিয়ে দেওয়ার যে তথ্য-প্রমাণ আছে, তাতে ইতিবাচক রায় পাওয়া যাবে। পুরো ক্ষতিপূরণসহ চুরির অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে।
২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি করে হ্যাকাররা। শ্রীলঙ্কায় নেওয়া দুই কোটি ডলার ওই সময়ই ফেরত পায় বাংলাদেশ। আর ফিলিপাইনে নেওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের মধ্যে দেশটির আদালতের নির্দেশে ক্যাসিনো মালিক কিম অং ২০১৬ সালের নভেম্বরে প্রায় দেড় কোটি ডলার ফেরত দেন। বাকি ৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার উদ্ধারে চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। অর্থ উদ্ধারে সহায়তার জন্য ফিলিপাইনের বিভিন্ন সরকারি সংস্থা তখন সে দেশের আদালতে বাংলাদেশের পক্ষে ১২টি মামলা করে। শুরুর দিকে এ নিয়ে জোর তৎপরতা ছিল। তবে দেশটিতে সরকার পরিবর্তনের পর আর মামলা এগোয়নি। একটি মামলারও রায় হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, রিজার্ভ থেকে চুরির অর্থ ফেরত ও দোষীদের চিহ্নিত করতে প্রথমে ২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানহাটান সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে মামলা করে বাংলাদেশ। ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংক, ক্যাসিনো মালিক কিম অংসহ ২০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এ মামলা হয়। তবে মামলা করার এক বছর দুই মাস পর ২০২০ সালের মার্চে ম্যানহাটান সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট জানিয়ে দেন, মামলাটি তাঁদের এখতিয়ারভুক্ত নয়। এর পর ২০২০ সালের ২৭ মে নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট কোর্টে মামলার আবেদন করা হয়। মামলার বিষয়ে বাংলাদেশের আইনি সহায়তা প্রতিষ্ঠান কোজেন ও'কনর বিবাদীদের নোটিশ দেয়। এরপর বিবাদীরা আদালতে 'মোশন টু ডিসমিস' বা মামলাটি না চালানোর অনুরোধ জানিয়ে আবেদন করে। তাদের আবেদনের বিষয়ে ২০২১ সালের ১৪ জুলাই এবং ১৪ অক্টোবর শুনানি হয়। গত বছরের ৮ এপ্রিল আংশিক রায় হয়। সেখানে সোলায়ের ক্যাসিনো ও ইস্টার্ন হাওয়ায়েকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ আপিল করে, যা এখন শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। গত ১৩ জানুয়ারি বাকিদের বিষয়ে রায় হয়েছে।
চলতি মাসে ফিলিপাইন যাচ্ছেন কর্মকর্তারা
ফিলিপাইনের মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠান ফিলরেমের সম্পত্তি ক্রোকের এক মামলায় সাক্ষ্য দিতে চলতি মাসে দেশটিতে যাচ্ছে একটি প্রতিনিধি দল। মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্সের আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আবেদনের বিষয়ে শুনানিতে অংশ নিতে চলতি মাসের শেষ দিকে বিএফআইইউ প্রধান মো. মাসুদ বিশ্বাস, ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসিসহ কয়েকজনের একটি দল ফিলিপাইনে যাওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে শুনানি শুরু হবে আগামী ৩১ জানুয়ারি। প্রতিনিধি দল ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করবে।
এ বিষয়ে ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি সমকালকে বলেন, আন্তর্জাতিক
কনভেনশন অনুযায়ী ফিলিপাইনের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিসের কাছে মিউচুয়াল
লিগ্যাল অ্যাস্টিস্ট্যান্সের আওতায় আবেদন করা হয়। যারা টাকা নিয়ে গেছে বা
যাদের হাত হয়ে টাকা চলে গেছে, তাদের সম্পদ ক্রোকের জন্য আবেদন করা হয়। এ
পর্যায়ে মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠান ফিলরেমের বিরুদ্ধে শুনানি চলছে।
প্রতিষ্ঠানটি ডলার থেকে স্থানীয় মুদ্রা পেসোতে রূপান্তর করে গ্যামলার,
ক্যাসিনোসহ বিভিন্ন জায়গায় পাঠিয়েছিল। বাংলাদেশের অর্থ চুরি করে মানি
লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে সেখানে গিয়েছিল।
- বিষয় :
- বাংলাদেশ ব্যাংক
- রিজার্ভ চুরি
