ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

প্রদর্শনী

পাথরের বুকে নারীর জীবনগাথা

পাথরের বুকে নারীর জীবনগাথা
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬ | ২২:১৯

নদীর স্রোতে ঘষেমেজে মসৃণ হয়ে ওঠা একটি পাথর। বাহ্যিকভাবে সে নিঃশব্দ, স্থির। অথচ তার শরীরে জমে থাকে সময়ের ইতিহাস, ক্ষয়ের চিহ্ন, যাত্রার স্মৃতি। সেই পাথরকেই ক্যানভাস করে নারীজীবনের বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা, অনুভব ও রূপান্তরের গল্প তুলে এনেছেন শিল্পী অনিন্দিতা অনি। রাজধানীর হাজারীবাগের দাগী আর্ট গ্যারাজে শুক্রবার শুরু হয়েছে তাঁর প্রথম একক শিল্পপ্রদর্শনী ‘শি ইন স্টোন’।

প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে মোট ৩০টি শিল্পকর্ম। প্রাকৃতিক পাথরের ওপর অ্যাক্রিলিক রঙে তৈরি এসব কাজে নারীজীবনের শৈশব, কৈশোর, স্বপ্ন, প্রেম, মাতৃত্ব, সংগ্রাম, নীরবতা, সহনশীলতা এবং আত্ম-উন্মোচনের নানা স্তরকে প্রতীকী ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রদর্শনী চলবে আগামী ২৩ জুন পর্যন্ত। প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এটি খোলা থাকবে।

প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন শিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক সোনিয়া বিনতা হাসান। উদ্বোধনী আয়োজনে শিল্পী, শিল্প সমালোচক, সংস্কৃতিকর্মী এবং শিল্পপ্রেমীদের উপস্থিতিতে গ্যালারিটি যেন রূপ নেয় নারীর অভিজ্ঞতার এক নীরব কিন্তু গভীর সংলাপ মঞ্চে।

অনিন্দিতা অনির শিল্পচর্চার বিশেষত্ব তাঁর মাধ্যম নির্বাচন। বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীপথ থেকে সংগ্রহ করা প্রাকৃতিক পাথরকে তিনি কেবল আঁকার পৃষ্ঠ হিসেবে ব্যবহার করেননি। প্রতিটি পাথরের স্বাভাবিক রেখা, গঠন, খাঁজ ও বর্ণকে শিল্পভাবনার অংশ করে তুলেছেন। ফলে প্রতিটি কাজ হয়ে উঠেছে স্বতন্ত্র; যেন প্রকৃতি ও শিল্পীর যৌথ নির্মাণ।

প্রদর্শনীর শিল্পকর্মগুলোর নামেও ফুটে উঠেছে নারীর জীবনের বহুবর্ণ যাত্রাপথ– ইমার্জেন্স, এ টাইম অব ড্রিমস, এ সিড অব হোপ, রিয়েলম অব ইম্যাজিনেশন, দ্য আনফোল্ডিং উইংস, ইনার ফ্লেম কিংবা ফেস অব রেজিলিয়েন্স। প্রতিটি কাজ একেকটি মানসিক ও সামাজিক অবস্থানের প্রতীক।

আবার হেল্ড, মেমোরি আওয়ার, ভেইল অব সাইলেন্স, দ্য আনস্পোকেন ওয়েট, জেনারেশনস, রুটস অব বিকামিং কিংবা দ্য রেড উইটনেসের মতো শিল্পকর্ম স্মৃতি, সম্পর্ক, নীরবতা, উত্তরাধিকার এবং আত্মপরিচয়ের জটিল অভিজ্ঞতাকে ধারণ করেছে।

শিল্পীর ভাষ্য, পাথর এখানে কেবল একটি উপাদান নয়। এটি স্মৃতি, স্থায়িত্ব ও সময়ের প্রবাহের প্রতীক। যেমন নদীর জল পাথরকে ধীরে ধীরে নতুন রূপ দেয়, তেমনি জীবন, সম্পর্ক, ভালোবাসা, সংগ্রাম ও সময় একজন নারীর সত্তাকেও নির্মাণ করে। সেই রূপান্তরের চিহ্নই ধরা পড়েছে শিল্পকর্মের বুননে।

প্রদর্শনীর ভাবনায় রয়েছে মানবসভ্যতার প্রাচীন শিল্প-ঐতিহ্যের অনুরণন। গুহাচিত্রের যুগে মানুষ যেমন পাথরের গায়ে তার অভিজ্ঞতা ও অস্তিত্বের চিহ্ন এঁকে রাখত, তেমনি অনিন্দিতা অনি সমকালীন শিল্পভাষায় পাথরের ওপর নারীর জীবনগাথা লিপিবদ্ধ করেছেন। ফলে প্রদর্শনীটি একদিকে যেমন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রকাশ, অন্যদিকে মানবসভ্যতার দীর্ঘ শিল্প-ঐতিহ্যের সঙ্গে এক সৃজনশীল সংলাপ।

গ্যালারিতে সাজানো পাথরগুলো প্রথম দেখায় ছোট ছোট শিল্পবস্তু মনে হলেও কাছে গেলে উন্মোচন হয় তাদের অন্তর্গত গল্প। কোথাও স্বপ্নবীজের অঙ্কুরোদ্গম, কোথাও মাতৃত্বের কোমলতা, কোথাও বা নিঃশব্দ বেদনার স্তর। রঙ, টেক্সচার ও পাথরের স্বাভাবিক আকৃতির সম্মিলনে প্রতিটি শিল্পকর্ম যেন নিজস্ব ভাষায় কথা বলে।

আরও পড়ুন

×