স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত তহবিল জমায় ভাটা
সরকারি কোষাগার
.
মেসবাহুল হক
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৪ | ২৩:৩৪
স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত অর্থ কাঙ্ক্ষিত হারে সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে না। আইন করার পর ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৫-১৬ হাজার কোটি টাকা করে জমা হয়। কিন্তু সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা নেমেছে ১১৩ কোটি টাকায়। পাঁচ অর্থবছরে এ খাত থেকে সরকারের কোষাগারে মোট ৪০ হাজার ৭০৯ কোটি টাকা জমা হয়েছে। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত থাকা ২ লাখ ১২ হাজার কােটি টাকা কোষাগারে নিয়ে আসতে ২০২০ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি এ-সংক্রান্ত আইন করে তৎকালীন সরকার।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, মূলত সরকারের ব্যয়ে ঋণ কমিয়ে আনার লক্ষ্যেই এ আইন করা হয়। সরকারের জনকল্যাণমূলক অনেক প্রকল্প আর্থিক সংকটের কারণে করা যায় না। এসব প্রতিষ্ঠানের অলস অর্থ কোনো ভালো কাজে বিনিয়োগ করতেই এ উদ্যোগ। তবে এসব সংস্থা চালাতে যে খরচ হয় এবং নিজস্ব অর্থায়নে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বছরে যে অর্থ লাগে, তা তাদের নিজস্ব তহবিলে জমা রাখা যায়। তাছাড়া আপৎকালীন ব্যয় নির্বাহের জন্য পরিচালন ব্যয়ের আরও ২৫ শতাংশ অর্থ এসব সংস্থা সংরক্ষণ করতে পারে। ওই সংস্থার কর্মীদের পেনশন বা প্রভিডেন্ড ফান্ডের অর্থও তারা সংরক্ষণ করতে পারে। এর পর যে অর্থ বাকি থাকবে, সেটা সরকারের কোষাগারে জমা দিতে হয়।
আইন হওয়ার পর দুই অর্থবছর বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান প্রায় লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি অর্থ জমা দিয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখ যায়, ওইসব প্রতিষ্ঠানে আর্থিক সক্ষমতা কমে গেলে তারা আর অর্থ জমা দেয় না। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও নানা অজুহাতে উদ্বৃত্ত অর্থ জমা দেওয়া থেকে বিরত থাকছে। এতে সরকারের কর ব্যতীত রাজস্ব একেবারেই কমে গেছে। তবে সম্প্রতি অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
স্বশাসিত সংস্থার উদ্বৃত্ত টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে নেওয়ার জন্য ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে আইনের খসড়া অনুমোদন হয় মন্ত্রিসভায়। তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম ওই বছরের মে মাস পর্যন্ত হিসাব দিয়ে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যান্সিয়াল করপোরেশনসহ দেশের মোট ৬৮টি স্বশাসিত সংস্থার উদ্বৃত্ত থাকা ২ লাখ ১২ হাজার ১০০ কোটি টাকা ‘অলস’ হিসেবে বিভিন্ন ব্যাংকে জমা আছে।
স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত অর্থ জমা-সংক্রান্ত অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে সরকারি কোষাগারে আসে ১৬ হাজার ৪৬ কোটি টাকা। এর পরের অর্থবছর জমা হয় ১৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তবে এর পরের বছরগুলো থেকে এ জমার হার কমতে থাকে। ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে জমা হয় যথাক্রমে ৩ হাজার ৫০ কোটি এবং ৬ হাজার কোটি টাকা। আর সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জমা হয় মাত্র ১১৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। আর চলতি বছরের আগস্ট মাসে একটি মাত্র প্রতিষ্ঠান জমা দিয়েছে ৬৫০ কোটি টাকা।
গত পাঁচ অর্থবছরে সব মিলিয়ে ১৭টি প্রতিষ্ঠান মোট ৪০ হাজার ৭০৯ কোটি টাকা জমা দিয়েছে। অথচ স্বশাসিত এই ১৭টি সংস্থার গত মে পর্যন্ত ব্যাংক স্থিতি ছিল ৯০ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা। গত চার অর্থবছর সবচেয়ে বেশি ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। গত মে পর্যন্ত সংস্থার ব্যাংক স্থিতি ৩৩ হাজার কোটি টাকার বেশি থাকলেও তারা গত অর্থবছর এক টাকাও জমা দেয়নি। এ ছাড়া পাঁচ বছরে জমা দেওয়া উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে– পেট্রোবাংলা ৯ হাজার ৮৭১ কোটি, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ৪ হাজার ৬০০ কোটি, চট্টগ্রাম কর্তৃপক্ষ ৪ হাজার ৮০০ কোটি, রাজউক ২ হাজার ৫৫০ কোটি এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা।
সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ সমকালকে বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংক স্থিতির পুরোটাই সরকারি কোষাগারে নিয়ে আসা ঠিক হবে না। তবে নিজস্ব খরচে প্রকল্প নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পরিচালন ব্যয়ের পরও কিছু অলস অর্থ থাকে। এ অর্থ ওইসব প্রতিষ্ঠান এফডিআর আকারে ব্যাংকে রেখে সেই সুদ যোগ করে বাড়তি লাভ দেখায়। এই বাড়তি লাভের ওপর তারা আবার বাড়তি বোনাস নেয়। এ বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে প্রকৃত উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে হবে।
- বিষয় :
- তহবিল ছাড়
