সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার পথনকশা তৈরি হচ্ছে
সোমবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ন্যাশনাল কনফারেন্স অন সোশ্যাল প্রটেকশনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজমসহ অতিথিরা- সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৭:০২ | আপডেট: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১১:৩৮
পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পাশাপাশি বাংলাদেশ উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হচ্ছে। এ অবস্থায় প্রত্যেক নাগরিককে ন্যূনতম সামাজিক নিরাপত্তা না দিতে পারার কোনো অজুহাত চলবে না। তাই সময় এসেছে সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার। অন্তর্বর্তী সরকার এ ব্যবস্থার রোডম্যাপ বা পথনকশা দিয়ে যেতে চায়; যাতে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার সেখান থেকে শুরু করতে পারে।
সোমবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে তিন দিনব্যাপী ন্যাশনাল কনফারেন্স অন সোশ্যাল প্রটেকশন ২০২৫-এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম।
পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, আমাদের এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটছে। নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশেও যেতে চায় বাংলাদেশ। এমন অবস্থায় সমতাভিত্তিক রাষ্ট্রে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি সবাইকে বাঁচার জন্য ন্যূনতম যা দরকার, তা দিতে হবে। সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকতে হবে। এর সঙ্গে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা জড়িত। এ জন্য জাতীয় পর্যায়ে নিবন্ধন ব্যবস্থা শুরু করতে চায় সরকার। নিবন্ধনের মাধ্যমে ডিজিটালি উপকারভোগী নথিভুক্ত করা হবে। তবে প্রতিবছর এটি পরিবর্তন হবে। মাঠ পর্যায়ে কাদের উপকারভোগী হওয়া উচিত এবং কী ধরনের উপকার তাদের দরকার, সেগুলোও নথিভুক্ত থাকবে।
এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ে সরকারের ঘাটতি থাকলে তা কটিয়ে উঠতে এ সম্মেলন থেকে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব আশা করেন ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেন, আর কয়েক মাস পরই তারা নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন। তবে এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে পথনকশা রেখে যেতে চায়। এরই অংশ হিসেবে তারা সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা রোডম্যাপ দিয়ে যেতে চান। সেটা করা গেলে ভবিষ্যতে নির্বাচিত সরকারের সুবিধা হবে। সেখান থেকে তারা শুরু করতে পারবে।
সামাজিক ভাতা দেওয়ার ক্ষেত্রে উপকারভোগী নির্ধারণে সমস্যা আছে উল্লেখ করে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, বর্তমানে যারা ভাতা পান, তাদের ৫০ শতাংশই এ সুবিধা পাওয়ার যোগ্য নন। তারা ভূতুড়ে অথবা রাজনৈতিক বিবেচনায় সুবিধা পাচ্ছেন। জাতীয়ভাবে সমন্বিত তালিকা তৈরি করা ও মাঠপর্যায়ে তদারক করা গেলে প্রকৃত উপকারভোগী ও যোগ্যদের নাম বের হয়ে আসবে।
তিনি বলেন, ব্যয়ের ক্ষেত্রে আমরা যত দরিদ্র, তার চেয়ে বেশি দরিদ্র আয়ের দিক থেকে। প্রতিবছর এই দরিদ্রের হার বাড়ছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ দরিদ্র না হলেও দারিদ্র্যসীমার ঠিক ওপরেই অবস্থান করছেন। তাদের অবস্থান টেকসই নয়, সামান্য ধাক্কায় তারা দরিদ্র হয়ে যেতে পারেন। এ শ্রেণির মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় কোনোভাবে শুধু জীবনধারণ করে যাচ্ছেন। ন্যায্যতাভিত্তিক সমাজে চরম দারিদ্র্য থাকতে পারে না। কোনো দেশ এত গরিব হতে পারে না যে তার সব মানুষের জন্য সে অন্তত জীবনধারণের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারবে না।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলে মত দেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য মনজুর হোসেন। তিনি বলেন, গত এক দশকে জিডিপিতে আমরা বেশ উন্নতি করেছি, গড়ে প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। কিন্তু এই সময়ে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২ শতাংশ। অর্থাৎ কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর কারণ সুশাসনের অভাব, আর্থিক খাতে অনিয়ম, প্রতিষ্ঠান দুর্বল করা, ন্যায়বিচার না থাকা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের হেড অব ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন মিচেল ক্রেৎজা বলেন, তিন বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশে দারিদ্র্য ১৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৮ শতাংশ হয়েছে। প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার বেশি। তাই সামাজিক সুরক্ষা আগের চেয়েও বেশি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মোখলেস উর রহমান, মন্ত্রিপরিষদের সমন্বয় ও সংস্কার বিভাগের সচিব জাহেদা পারভীন, ইউএনডিপি বাংলাদেশের প্রতিনিধি স্টেফেন লিলার প্রমুখ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. খালেদ হাসান।
- বিষয় :
- সামাজিক নিরাপত্তা
- পরিকল্পনা উপদেষ্টা
