উদ্যোক্তা তৈরির ইসিএফ তহবিলে অর্থছাড় সামান্য
ওবায়দুল্লাহ রনি
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:১১
| প্রিন্ট সংস্করণ
উদ্যোক্তা তৈরির জন্য মাত্র দু্ই শতাংশ সুদে সরকারের এন্টারপ্রেনারশিপ সাপোর্ট ফান্ডের (ইএসএফ) ঋণে বেশ ধীরগতি দেখা দিয়েছে। ২০১৮ সাল থেকে গত জুন আবেদন পর্যালোচনা করে সংক্ষিপ্ত তালিকায় জায়গা পেয়েছে এক হাজার ৪৮২টি প্রকল্প। তবে এ পর্যন্ত ১৭০টি প্রকল্পের জন্য ৩৪৭ টাকা কোটি অনুমোদন হয়েছে। এর মধ্যে ২৭টি প্রকল্পে ছাড় হয়েছে ৪১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০০১ সালে ১০০ কোটি টাকা নিয়ে যাত্রা করে ইক্যুইটি অ্যান্ড এন্ট্রারপ্রেনারশিপ ফান্ড (ইইএফ)। পরে তহবিলের আকার বাড়িয়ে আড়াই হাজার কোটি টাকা করা হয়। ২০০৯ সাল পর্যন্ত তহবিল দেখভালের দায়িত্বে ছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। পরবর্তীতে সময়ে তহবিল ছাড়ের দায়িত্ব সরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আইসিবি এবং নীতি প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় বাংলাদেশ ব্যাংককে। ২০১৪ থেকে পাঁচ বছর আবেদন গ্রহণ বন্ধ থাকার পর ২০১৮ সালের ৭ আগস্ট ইইএফকে সুদভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি ঋণের তহবিলে রূপান্তর করা হয়। নাম দেওয়া হয় এন্ট্রারপ্রেনারশিপ সাপোর্ট ফান্ড (ইএসএফ)।
ইসিএফ থেকে ২ শতাংশ সুদে আট বছর মেয়াদি ঋণ পাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। ঋণ পাওয়ার ৪ বছর পর থেকে কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। একজন উদ্যোক্তা ৮০ লাখ থেকে ১২ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারেন। উদ্যোক্তার ৫১ শতাংশ বিনিয়োগের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৪৯ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হয়। মূলত বিনা সুদের ইইএফে নানা জালিয়াতির কারণেই এই পরিবর্তন করা হয়। সরকারি অডিটে দেখা যায়, যেসব প্রকল্পে ঋণ দেওয়া হয়েছে অনেক প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই। এমনকি খাস জমি দেখিয়েও অনেককে ঋণ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ইএসএফের আওতায় চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সংক্ষিপ্ত তালিকায় জায়গা পাওয়া এক হাজার ৪৮২টি প্রকল্পের মধ্যে আইটি খাতের ৮টি। বাকি এক হাজার ৪৭৪টি কৃষি খাতের প্রকল্প। এখন পর্যন্ত আইটি খাতের দুটিসহ ১৭০টি প্রকল্প চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে। এসব প্রকল্পের বিপরীতে ঋণ দেওয়া হবে ৩৪৭ কোটি ১৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে কৃষি খাতের ১৬৮টি প্রকল্পের বিপরীতে অনুমোদন হয়েছে ৩৪৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। আর আইটি খাতের দুই প্রকল্পে দেড় কোটি টাকা। আইটি খাতের এক টাকাও এখনও ছাড় হয়নি। কৃষি খাতের ২৭টি প্রকল্পে ছাড় হয়েছে ৪১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এ পর্যন্ত একটি প্রকল্পের ৮৬ লাখ টাকা ফেরত এসেছে।
বিদ্যমান নিয়মে ঋণের জন্য অফেরতযোগ্য পাঁচ হাজার টাকার ব্যাংক ড্রাফটসহ আবেদন করতে হয়। মূলত খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, কৃষিভিত্তিক এবং আইসিটি খাতের উদ্যোক্তারা এখান থেকে সহায়তা পান। সাধারণভাবে একটি প্রকল্পে ৮০ লাখ থেকে পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়া যায়। তবে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কৃষিভিত্তিক প্রকল্প যন্ত্রপাতিনির্ভর হলে ১২ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হয়। আট বছর মেয়াদি ঋণের কিস্তি পরিশোধের মেয়াদ শুরু হয় ঋণ ছাড়ের চার বছর পর থেকে। পরবর্তী চার বছরে সমান আটটি কিস্তিতে সুদসহ আসল পরিশোধ করতে হবে। মঞ্জুরিপত্র পাওয়ার এক বছরের মধ্যে আবশ্যিকভাবে কোম্পানির অনুকূলে দলিলায়নসহ মূলধনি অংশের ৫১ শতাংশ বিনিয়োগ করতে হবে। প্রথম কিস্তি পাওয়ার এক বছর ছয় মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ কিস্তি গ্রহণসহ কার্যক্রম সম্পন্ন করতে না পারলে মেয়াদপূর্তির আগেই সুদসহ সব ঋণ ফেরত দিতে হবে। কোনো কারণে উদ্যোক্তা কিস্তি খেলাপি হলে অতিরিক্ত ২ শতাংশ হারে দন্ড সুদসহ পুরো দায় পরিশোধের বিধান রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, আগের খারাপ অভিজ্ঞতার কারণেই এখন অনেক সতর্কতার সঙ্গে প্রকল্প বাছাই, ঋণ অনুমোদন ও ছাড় করা হচ্ছে। ইতোপূর্বে বিনা সুদের ইইএফ তহবিলের ক্ষেত্রে দেখা গেছে সরকারি খাস জমিকে উদ্যোক্তার বিনিয়োগ দেখিয়ে অর্থছাড় হয়েছে। আবার ব্যাংকের খেলাপি কিন্তু তিনি ঋণ পেয়েছেন। এ ছাড়া অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান বা ভুয়া জমির দলিলে এ তহবিলের টাকা নিয়ে গেছে। আবার অন্য যে কোনো ঋণের চেয়ে অনেক কম সুদের কারণে অনেক আকর্ষণীয়। তহবিল পেতে ব্যাপক তদবির হয়। এসব কারণে সব পক্ষ এখন অনেক সতর্কতার সঙ্গে কার্যক্রম চালাচ্ছে।
ইইএফের টাকা ফেরত দেয়নি অনেক প্রতিষ্ঠান
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ইইএফের আওতায় মোট দুই হাজার ৪৩টি প্রকল্পে তিন হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা অনুমোদন হয়। আর এক হাজার ৩৯টি প্রকল্পের বিপরীতে ছাড় করা হয় এক হাজার ৬২৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে কৃষি খাতের ৯৩৪টি প্রকল্পে এক হাজার ৪৯০ কোটি টাকা দেওয়া হয়। বাকি ১০৫টি প্রকল্পে দেওয়া হয় ২১৮ কোটি টাকা। তবে এখন পর্যন্ত ফেরত এসেছে মাত্র ৬০৩ কোটি টাকা। যার মধ্যে কৃষি খাতের ৫৩৫ কোটি টাকা। আর আইটি খাতের ৬৮ কোটি টাকা। যারা টাকা ফেরত দিয়েছে এদের মধ্যেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আংশিক টাকা ফেরত দিয়ে উদ্যোক্তারা গা ঢাকা দেন। পুরো অর্থ ফেরত দিয়েছে মাত্র ২১৪টি প্রকল্প। যার মধ্যে কৃষি খাতের ২১৪টি প্রকল্পে ৩৯৯ কোটি টাকা। আর আইটি খাতের ৩০টি প্রকল্প দিয়েছে ৪৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এক টাকাও ফেরত না দেওয়া প্রতিষ্ঠান রয়েছে ২২২টি। এর মধ্যে কৃষি খাতের ২০০টি প্রতিষ্ঠান নিয়ে গেছে ২৯৯ কোটি টাকা। আর আইটি খাতের ২২টি প্রকল্প নিয়েছে ১৯ কোটি ২৬ লাখ টাকা। অর্থ ফেরত না দেওয়ায় বর্তমানে এক হাজার ৩৯টি আইনি ব্যবস্থা চলমান আছে। এদের মধ্যে চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়েছে ৪০৭টি। অর্থঋণ আদালতে ২১৮টি মামলা করা হয়েছে। আর ৩৮৪টি আইনি নোটিশ এবং অর্থ ফেরতের নোটিশ দেওয়া হয়েছে ৫৩টি।
- বিষয় :
- তহবিল ছাড়
