ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক কর্মপরিকল্পনা থাকতে হবে নির্বাচনী ইশতেহারে

বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক কর্মপরিকল্পনা থাকতে হবে নির্বাচনী ইশতেহারে
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৩৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নে দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকরভাবে এগোতে না পারলে অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে না। এ ক্ষেত্রে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজনৈতিক অর্থনীতি একই রেখায় থাকতে হবে। তাই আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া রাজনৈতিক দলগুলোকে কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার অঙ্গীকার নয়, বরং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তারা কীভাবে, কখন ও কোন পথে এগোবে তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। নির্বাচনী ইশতেহারে সুস্পষ্ট, সময়বদ্ধ ও বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। 
গতকাল বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে আয়োজিত ‘অর্থনীতি কি দুষ্ট চক্রের ফাঁদে?’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নিয়ে অর্থনীতিবিদরা এসব কথা বলেন। ভয়েস ফর রিফর্ম এবং ব্রেইন যৌথভাবে এ আলোচনার আয়োজন করে। 

অনুষ্ঠানে দেওয়া উপস্থাপনায় অর্থনীতিবিদ জ্যোতি রহমান বলেন, আগামী ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে প্রতিবছর ৮ শতাংশের বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। কিন্তু এখন যেটা রয়েছে ৪ শতাংশের আশপাশে। ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির জন্য প্রতি বছর ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বেসরকারি খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তবে এই অগ্রযাত্রায় সবচেয়ে বড় সমস্যা উচ্চ মূল্যস্ফীতি, চলতি হিসাবে ঘাটতি এবং ব্যাংক খাতের সমস্যা। এসব সমস্যার সমাধানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা খুবই প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, দেশের অর্থনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সাময়িক নীতিগত সহায়তা দিয়ে আর সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিক তথ্য অনুযায়ী, প্রবৃদ্ধির গতি নেমে এসেছে সাড়ে ৩ থেকে ৪ শতাংশে, অথচ মূল্যস্ফীতি রয়ে গেছে উচ্চ পর্যায়ে। গত কয়েক বছর থেকেই বিশেষ করে করোনার সময় থেকে মূল্যস্ফীতি বাড়লেও প্রবৃদ্ধির হার কমছে। এই পরিস্থিতিকে অর্থনীতিবিদরা ‘মডারেট স্ট্যাগফ্লেশনারি’ হিসেবে দেখছেন– যেখানে প্রবৃদ্ধি কমছে, কিন্তু জিনিসপত্রের দাম নামছে না।
তিনি বলেন, এই সংকটের শেকড় শুধু সামষ্টিক অর্থনীতিতে নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে। অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে রাজনীতির মাটির ওপর। সেই মাটি যদি স্থিতিশীল না থাকে, তাহলে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বা ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্য বাস্তবতা হারায়। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মতে, বর্তমান কাঠামোতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধি হার সাড়ে ৬ শতাংশের বেশি নয়। অর্থাৎ কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন,  বিনিয়োগ না বাড়ায় এবং উৎপাদন সম্প্রসারণে বাধা থাকায় ব্যক্তি খাত প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে না। এ ছাড়া অর্থনীতির বিভিন্ন সমস্যা একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এই বাস্তবতা থেকেই সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, সম্পদের সুষ্ঠু সঞ্চালন এবং কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো জরুরি। ব্যাংক, শ্রমবাজার ও জ্বালানি খাতে সংস্কার অপরিহার্য।

তিনি মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকার কিছু সংস্কার উদ্যোগ নিলেও অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এর পেছনে কাঠামোগত দুর্বলতার পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব বড় কারণ। রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া ভালো প্রস্তাব বাস্তবায়ন হয় না। সামনে নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে সংস্কারের স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি থাকলেও, আসল চ্যালেঞ্জ হবে সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ। রাজনৈতিক দুষ্টচক্র ও স্বার্থান্বেষী আচরণ ভাঙতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রাশেদ মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বেশ কয়েক বছর থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একটি কাঠামোগত ফাঁদে আটকে আছে। ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলার অভাব, দুর্বল রাজস্ব ব্যবস্থা ও উৎপাদন খাতে বৈচিত্র্যের ঘাটতি এই দুষ্টচক্রকে আরও গভীর করছে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও জবাবদিহি ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। এ সংকট উত্তরণে আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া সব রাজনৈতিক দলগুলো কী ধরনের কর্মপরিকল্পনা দেয় সেটিই দেখার বিষয়। 
পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. মঞ্জুর হোসেন বলেন, ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকার সীমিত রাজস্ব, বাড়তি সামাজিক ব্যয় ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে অর্থনীতি পরিচালনার কঠিন বাস্তবতার মুখে পড়বে। বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও অগ্রাধিকার নির্ধারণে ব্যর্থ হলে অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়বে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

আরও পড়ুন

×