বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা
মধ্যস্বত্বভোগী ও দুর্বল সংরক্ষণ ব্যবস্থা কৃষিপণ্যের দর বাড়াচ্ছে
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
কৃষিপণ্যের বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। উৎপাদক পর্যায়ে ন্যায্যমূল্য না পেলেও পাইকারি ও খুচরাতে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। এতে ভোক্তা পর্যায়ে বাড়তি দামের বোঝা চাপছে। দুর্বল সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং বাজার ব্যবস্থাপনার অদক্ষতার কারণে কৃষক ও ক্ষুদ্র পোলট্রি খামারিরা লোকসানে পড়লেও বড় ব্যবসায়ী ও মিলমালিকরা লাভবান হচ্ছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের মূল্য শৃঙ্খল দক্ষতা’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে গবেষণা দলের প্রধান ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের পরিচালক সেলিম আল মামুন প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
চাল, আলু, পেঁয়াজ, ব্রয়লার মুরগি ও ডিম এই পাঁচটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর গবেষণাটি করা হয়। দুই ধাপে পরিচালিত গবেষণার প্রথম ধাপ সম্পন্ন হয় গত বছরের ৫ থেকে ১৬ জানুয়ারি। আর দ্বিতীয় ধাপের কাজ হয় ১৫ জুন থেকে ২৭ জুলাই। দ্বিতীয় ধাপে ১৮ জেলার ৬১টি উপজেলায় ৪২৬ জন উত্তরদাতার কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গত আগস্টে প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত হয়।
গবেষণায় উঠে এসেছে, বোরো মৌসুমে প্রতি মণ ধান উৎপাদনে কৃষকের গড় খরচ ৮৭২ টাকা। আর বিক্রি করেছেন এক হাজার ১২৫ থেকে এক হাজার ৪৫০ টাকা। এতে কৃষকের মুনাফা থাকলেও চালের বাজার পুরোপুরি মিলারনির্ভর। কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি চালের দাম ৫০ টাকা হলেও খুচরা পর্যায়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৮ দশমিক ৫০ টাকায়। মিলাররা চালের পাশাপাশি তুষ ও কুঁড়া বিক্রি করে প্রতি মণে অতিরিক্ত ১০৬ টাকা আয় করছেন, যা ভোক্তা পর্যায়ে দামের চাপ বাড়াচ্ছে। আবার কৃষক পর্যায়ে শ্রমিকের মজুরি এবং সার ও কীটনাশকের ব্যবহার বাড়ার কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। এ ছাড়া বেশি মুনাফার আশায় কিছু কৃষক গত বছর আলু, পেঁয়াজ, ভুট্টা এবং সরিষা চাষে ঝুঁকে পড়েন। ফলে ধানের উৎপাদন কমেছে। দর সহনীয় রাখতে সার ও কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার নিরুৎসাহিত, শর্ত সাপেক্ষে মিলারদের ধান মজুত করার অনুমতিসহ বিভিন্ন সুপারিশ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আলুর ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব আরও স্পষ্ট। কৃষকের উৎপাদন খরচ কেজিপ্রতি ১০ টাকা ৬৩ পয়সা হলেও কৃষক বিক্রি করেন ১৮ টাকা ৪৪ পয়সা। তবে কোল্ডস্টোরেজ থেকে বের হওয়ার পর দাম বেড়ে ২৮ টাকা ৮০ পয়সা এবং খুচরা বাজারে ৪৫ টাকা ৮০ পয়সা হয়। কোল্ডস্টোরেজ গেট থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত মধ্যস্বত্বভোগীদের উচ্চ মুনাফাই আলুর দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। হিমাগারের কেজিপ্রতি ছয় টাকা ৭৫ পয়সা ভাড়া কমানোর সুযোগ রয়েছে।
পেঁয়াজের বাজারে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও ওজন কমে যাওয়া। দীর্ঘদিন সংরক্ষণে প্রতি মণে প্রায় ১২ কেজি ওজন কমে যায়। পেঁয়াজে মধ্যস্বত্বভোগীর অস্তিত্ব না থাকলেও পোলট্রি খাতে মধ্যস্বত্বভোগী ও ফিড মিল মালিকদের প্রভাব স্পষ্ট। ব্রয়লার মুরগির কেজি প্রতি উৎপাদন খরচ প্রায় ১৬৪ টাকা হলেও খামারিরা বিক্রি করেন ১৭২ টাকা। খুচরা বাজারে গিয়ে যা দাঁড়ায় ১৯৫ টাকা। জরিপের সময় অনেক খামারি প্রতি কেজিতে ১২ টাকা পর্যন্ত লোকসানের কথা জানান। ডিম উৎপাদনেও একই চিত্র দেখা গেছে।
- বিষয় :
- কৃষিপণ্য
