ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ডিমের নিলামে সরবরাহ ও চাহিদার বাস্তব চিত্র

ডিমের নিলামে সরবরাহ ও চাহিদার বাস্তব চিত্র
×

ফাইল ছবি

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৫ মার্চ ২০২৬ | ১৯:৪১ | আপডেট: ০৫ মার্চ ২০২৬ | ১৯:৫২

ডিমের সরবরাহ চাহিদার চেয়ে বেশি হওয়ায় দাম কমে গেছে এবং এই কম দাম কয়েক মাস ধরে স্থায়ী আছে। যখন ডিমের দাম বেশি ছিল, তখন সরকারি কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছিলেন যে ডিমের বাজার একটি সিন্ডিকেট দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু বর্তমান কম দাম সেই অভিযোগকে ভুল প্রমাণ করেছে।

ঢাকার কাছে আশুলিয়ায় কাজী ফার্মসের বিক্রয় কেন্দ্রে প্রতিদিন প্রায় ৭ লাখ ডিম নিলামে বিক্রি করা হয়। পাইকারি ব্যবসায়ীরা এই ডিম কিনতে প্রতিযোগিতা করেন। তারা প্রতিদিন সকালে একটি মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে নিজেদের দর প্রস্তাব দেন।

কাজী ফার্মসের পরিচালক কাজী জাহিন হাসান নিলামের পদ্ধতি ব্যাখ্যা করে বলেন, “আমরা প্রতিদিনের জন্য একটি প্রাথমিক মূল্য (Floor Price) ঘোষণা করি। এরপর ব্যবসায়ীরা তাদের দর এবং চাহিদাকৃত পরিমাণ উল্লেখ করে প্রস্তাব জমা দেন। যারা সবচেয়ে কম দর দেন, তারা সাধারণত ডিম পান না। সফল দরদাতারা সবাই একই দামে ডিম কিনে থাকেন, যেটি ওই দিনের নিলামের মূল্য।

ধরা যাক, কোনো একটি দিনে আশুলিয়ায় আমাদের বিক্রির জন্য ৬ লাখ ডিম আছে এবং প্রাথমিক মূল্য ধরা হয়েছে প্রতি ডিম ৮.০০ টাকা। এই  ঘোষণার পর ক্রেতারা তাদের দর এবং প্রয়োজনীয় পরিমাণ জানান।

ধরা যাক, আমরা নিম্নলিখিত দরগুলো পেলাম–
A: প্রতি ডিম ৮.৫০ টাকা, পরিমাণ ১,০০,০০০
B: প্রতি ডিম ৮.৩০ টাকা, পরিমাণ ২,০০,০০০
C: প্রতি ডিম ৮.২৫ টাকা, পরিমাণ ১,০০,০০০
D: প্রতি ডিম ৮.২০ টাকা, পরিমাণ ২,০০,০০০
E: প্রতি ডিম ৮.১০ টাকা, পরিমাণ ২,০০,০০০

সর্বোচ্চ চারজন দরদাতার মোট চাহিদা ৬ লাখ ডিম, যা আমাদের বিক্রির সমান। তাই এই চারজনই ডিম পাবেন। চতুর্থ সর্বোচ্চ দরদাতা D প্রতি ডিম ৮.২০ টাকা প্রস্তাব দিয়েছেন, তাই বিক্রয় মূল্য হবে ৮.২০ টাকা।

A, B ও C কম দামে (তাদের প্রস্তাবের চেয়ে কম) ডিম পেয়ে সন্তুষ্ট থাকবে। D ঠিক তার প্রস্তাবিত দামেই কিনবে, তাই সেও সন্তুষ্ট থাকবে।
A, B, C এবং D তাদের চাহিদা অনুযায়ী ডিম পাবে, কিন্তু সর্বনিম্ন দরদাতা E কোনো ডিম পাবে না।

আমাদের বিক্রয় মূল্য সর্বোচ্চ দর নয়। এখানে সর্বোচ্চ দর ছিল ৮.৫০ টাকা (A-এর), কিন্তু নিলামের দাম হয়েছে ৮.২০ টাকা। এই পদ্ধতিতে বেশির ভাগ ক্রেতাই সন্তুষ্ট থাকে, কারণ তারা নিজের প্রস্তাবের চেয়ে কম দামে কিনতে পারে। আমরা সবসময় এমন প্রাথমিক মূল্য দিই, যা ক্রেতাদের আকর্ষণ করে। যদি প্রাথমিক মূল্য বেশি হয়, তাহলে ব্যবসায়ীরা অন্য সস্তা সরবরাহকারীর দিকে চলে যাবেন।”

কাজী ফার্মসের জেনারেল ম্যানেজার (সেলস) আবু কাওসার মো. ছালেহ বলেন, “সব ব্যবসায়ীই কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে ডিম কিনতে চান। কেউ যদি অন্যদের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করতে চান, তাহলে কেউ (ক্রেতারা) তার কাছ থেকে কিনবেন না। একইভাবে খুচরা বিক্রেতারাও কম দামে কিনতে চান। তাই কেউ এককভাবে দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না।

২৩ ফেব্রুয়ারি আমাদের নিলামের দাম ছিল প্রতি ডিম ৭.৪০ টাকা। এখন দাম কম, কারণ চাহিদা কম। আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে (২০২৫) দাম ১০ টাকার বেশি ছিল, কারণ তখন চাহিদা বেশি ছিল। সরকার হিসাব করেছে একটি ডিম উৎপাদনের খরচ প্রায় ১০.১৯ টাকা।”

তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালে ডিমের উচ্চমূল্য কৃষকদের উৎপাদন বাড়াতে উৎসাহিত করেছে। ফলে ২০২৫ সালে উৎপাদন অনেক বেড়েছে এবং বছরের বেশির ভাগ সময় (মার্চ, এপ্রিল, জুন, জুলাই, নভেম্বর, ডিসেম্বর) দাম কম ছিল।

আশুলিয়ার কাছে গোমাইল এলাকার ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম (৩৯) প্রতিদিন প্রায় ৩০,০০০ ডিম কেনেন; যার বেশির ভাগই নিলাম থেকে। তিনি বলেন, কিছু কোম্পানি এসএমএস করে ডিম বিক্রির প্রস্তাব দেয়, তবে তিনি সাধারণত কাজী ফার্মস থেকে কম দামে কিনতে পারেন।

সর্দার মার্কেটের ব্যবসায়ী তানভীর ইসলাম (৪৩) প্রতিদিন প্রায় ৮০,০০০ ডিম কেনেন। তিনি বলেন, দাম কম থাকলে কৃষকরা যদি কিছু ডিম কোল্ডস্টোরেজে রাখতে পারতেন, তাহলে ক্ষতি এড়াতে পারতেন।

তিনি বলেন, ‘এখনকার কম দাম প্রমাণ করে কেউই বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এই প্রতিযোগিতামূলক বাজারে সিন্ডিকেট গঠন করা সম্ভব নয়।’

কাপ্তানবাজারের ব্যবসায়ী জাহিদুল ইসলাম (৪৮) প্রতিদিন প্রায় ৩,০০,০০০ ডিম বিক্রি করেন। তিনি বলেন, কিছু কোম্পানি বেশি দামে বিক্রির চেষ্টা করে, তবে কাজী ফার্মসের দাম সাধারণত কম থাকে।

তিনি বলেন, ‘প্রতি ডিমে আমি ১০ পয়সা লাভ করি, কিন্তু বিক্রি না হলে লোকসান হয়।’ তিনিও কোল্ডস্টোরেজের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
ঢাকা শহরে প্রতিদিন অন্তত ১.৫ কোটি ডিম বেচাকেনা হয়। প্রায়ই বলা হয় তেজগাঁওয়ের ডিম বাজার থেকেই দাম নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তবে ডিম ব্যবসায়ী বহুমুখী সমিতির (Egg Traders Multipurpose Samity) বিদায়ী সভাপতি আমানত উল্লাহ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তিনি বলেন, তেজগাঁওয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ডিম বিক্রি হয় এবং আরও অনেক পাইকারি বাজার রয়েছে। ‘চাহিদা ও সরবরাহ ছাড়া আর কেউ দাম নির্ধারণ করতে পারে না। তিনি বলেন, আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, ডিমের বাজার মুক্ত’। সি ৮৭৯

আরও পড়ুন

×