রাজস্ব কর্মকর্তাদের এনবিআর চেয়ারম্যান
ব্যবসা সংকুচিত করে বাজেটে এমন কর প্রস্তাব নয়
ছবি-সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ | ২২:১২
কর আদায় বাড়ানোর লক্ষ্যে এমন কোনো অবাস্তব কর প্রস্তাব করা যাবে না, যা শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যবসা খাতকেই সংকুচিত করে।
সোমবার ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (ফিকি) প্রতিনিধিদলের অনুরোধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান রাজস্ব কর্মকর্তাদের এমন নির্দেশ দিয়েছেন।
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, সবসময় গাণিতিক হারে কর বাড়ালে রাজস্ব বাড়ে না। ঐকিক নিয়ম সব কাজে লাগে না। এনবিআর এখন আর কেবল হার বাড়ানোর মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধি করতে চায় না। বরং ব্যবসা পরিচালনার সহজীকরণ এবং অটোমেশনের মাধ্যমেই টেকসই রাজস্ব আদায়ের পথে হাঁটতে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওস্থ এনবিআর ভবনে রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে ফিকির প্রাক-বাজেট আলোচনায় এসব কথা বলেন তিনি। সভায় ফিকির সভাপতি রূপালী চৌধুরীসহ বিভিন্ন বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় ফিকির পক্ষ থেকে কর সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে বেশ কিছু বাস্তব উদাহরণসহ সুনির্দিষ্ট সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
প্রাতিষ্ঠানিক করহার কমানো সম্ভব নয়
আলোচনার শুরুতে এনবিআর চেয়ারম্যান স্পষ্ট করেন, সরকারের পক্ষ থেকে রাজস্ব আদায়ের প্রচণ্ড চাপ থাকায় কর্পোরেট করহার কমানো সম্ভব নয়। তবে তিনি ফিকির উদ্বেগের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, অতিরিক্ত করের বোঝার ফলে যখন একটি ব্যবসা টিকে থাকতে হিমশিম খায়, তখন সেই খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আহরণও নিম্নমুখী হয়। এ সময় তিনি জানান- ব্যক্তি করদাতাদের পর আগামী বছর কর্পোরেট আয়কর রিটার্নও শতভাগ অনলাইনে আনা হবে। রাজস্ব আদায় বাড়াতে, করদাতাদের হয়রানি কমানো সবক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে ‘অটোমেশন’ ও অনলাইন ব্যবস্থা প্রচলনে এনবিআর কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
ভুল করনীতির বাস্তব উদাহরণ বেভারেজ খাত
আলোচনায় কোমল পানীয় বা কার্বনেটেড বেভারেজ খাতের ওপর আরোপিত করের ফলে সরকারের রাজস্ব কমার বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে আসে। ফিকি জানায়, অতীতে কার্বনেটেড বেভারেজ কোম্পানিগুলো অন্য করদাতাদের মতো মোট প্রাপ্তির ওপর মাত্র শূন্য দশমিক ৬০ শতাংশ হারে ন্যূনতম কর দিত। হঠাৎ তা পাঁচগুন বাড়িয়ে ৩ শতাংশে উন্নীত করা হয়। পাশাপাশি ৩০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক এবং ১৫ শতাংশ ভ্যাট মিলিয়ে মোট করের হার দাঁড়িয়েছে ৫৪ শতাংশ, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। ভারতে এ হার ৪০ শতাংশ, নেপালে ৩৮ শতাংশ।
ফিকি জানায়- এই উচ্চ কর হারের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কোকা-কোলা এবং পেপসির মতো বড় ব্র্যান্ডগুলোর বিক্রির ওপর। করের বোঝা বইতে গিয়ে কোম্পানিগুলো দাম বাড়ালে ভোক্তার চাহিদা কমেছে। ২০২৩ সালে এ খাতের ১০ হাজার কোটি টাকার বাজার গত অর্থবছরে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকায় নেমেছে। এমনকি আগে সরকার এ খাত থেকে যেখানে ১ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা রাজস্ব পেত, গত বছর তা কমে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকায় নেমেছে।
কার্যকর কর হার ও শিল্পের বিকাশ
ফিকি তাদের প্রস্তাবনায় উল্লেখ করেছে যে, বাংলাদেশে কর্পোরেট করের নামমাত্র হার কম মনে হলেও বিভিন্ন ধরণের অননুমোদিত ব্যয় এবং উৎসে কর কর্তনের কারণে কার্যকর কর হার অনেক ক্ষেত্রে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশও ছাড়িয়ে যায়।
বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের জন্য ন্যূনতম কর বিধানটি একটি মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। যদি কোনো কোম্পানি লোকসানেও থাকে, তবুও তাকে মোট বিক্রয়ের ওপর ভিত্তি করে কর দিতে হচ্ছে, যা তাদের চলতি মূলধন সংকুচিত করছে এবং নতুন বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করছে।
ফিকির প্রধান প্রস্তাবনা
ফিকি প্রস্তাব করেছে যে, প্রকৃত আয়ের ভিত্তিতে কর নির্ধারণ নিশ্চিত করতে ধারা ১৬৩ অনুযায়ী ন্যূনতম করের বিধানটি পর্যায়ক্রমে তুলে নেওয়া উচিত। উৎপাদনমুখী শিল্পের জন্য কাঁচামাল আমদানিতে উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করা উচিত যাতে ব্যবসায়িক খরচ বাড়ে না। উপকরণ কর রেয়াত পাওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান ১৮টি নেতিবাচক তালিকার সীমাবদ্ধতা কমিয়ে আনার দাবি জানানো হয়েছে। ফিকির মতে, রেয়াত সুবিধা সংকুচিত করার ফলে পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।
এছাড়া কর জালিয়াতি রোধ ও স্বচ্ছতা বাড়াতে এনবিআর অনুমোদিত প্ল্যাটফর্মে ই-ইনভয়েস চালু করার জোরালো দাবি জানানো হয়েছে। এনবিআর চেয়ারম্যানও জানান যে, আগামী বছর থেকে কর্পোরেট ট্যাক্স রিটার্ন পুরোপুরি অনলাইনে চলে আসবে।
প্রমোশনাল ব্যয় সীমা টার্নওভারের মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ ‘প্রমোশনাল’ ব্যয় অনুমোদনের সীমা বাস্তবসম্মত নয় বলে দাবি করেছে ফিকি। তাদের মতে, এটি শিল্পের বিপণন কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে।
রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান জানান, তারা কর প্রশাসনকে আরও জনবান্ধব এবং প্রযুক্তি নির্ভর করার কাজ করছেন। তিনি স্বীকার করেন যে, অডিট সিলেকশন এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ম্যানুয়াল পদ্ধতির কারণে ব্যবসায়ীরা অনেক সময় হয়রানির শিকার হন। এজন্য 'রিস্ক বেসড অডিট' এবং 'অটোমেটেড সিস্টেম' এর ওপর জোর দিচ্ছে এনবিআর। এজন্য ফিকির সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
সভায় ফিকির পক্ষ থেকে জানানো হয়- দেশে নিবন্ধিত কোম্পানি তিন লাখ হলেও ২১টি খাতের মাত্র ২১০ বিদেশি কোম্পানি মোট রাজস্বের প্রায় ৩০ শতাংশ প্রদান করে। তাই এই 'গ্যারান্টিড ক্যাশ সোর্স' শিল্পগুলোকে যদি কর ভীতির পরিবর্তে কর স্বস্তি দেওয়া হয়, তবে তারা বিনিয়োগ বাড়াতে উৎসাহিত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে।
‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’ জবাই না করার আহ্বান জানিয়ে ফিকির সভাপতি রূপালী চৌধুরী বলেন, সরকারের রাজস্ব আদায় বাড়ানো প্রয়োজন, কিন্তু তা করতে গিয়ে যেন ‘গোল্ডেন গুজ’ বা সোনার ডিম পাড়া হাঁসকে (ব্যবসা প্রতিষ্ঠান) মেরে ফেলা না হয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ফিকি সদস্যরা স্বেচ্ছায় কর প্রদানকারী এবং তাঁরা চান দেশের রাজস্ব বাড়ুক, তবে তা যেন ব্যবসার স্বাভাবিক গতিকে রুদ্ধ না করে।
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, আমরা চাই শিল্পের প্রসার হোক। কর আদায় বাড়াতে গিয়ে আমরা যেন শিল্পের ঘাড় মটকে না দিই। তিনি আশ্বস্ত করেন যে, ফিকির দেওয়া প্রস্তাবগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হবে এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট প্রণয়নের চেষ্টা করা হবে যা একই সাথে সরকারের রাজস্ব চাহিদা পূরণ করবে এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখবে।
