ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে, বাজারও ঊর্ধ্বমুখী

মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে, বাজারও ঊর্ধ্বমুখী
×

 সমকাল প্রতিবেদক 

প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ | ০৮:৫৭ | আপডেট: ০৭ মে ২০২৬ | ১২:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

সরকারি হিসাবে বাজারে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির হার গত মাসে বেড়েছে। এপ্রিলে মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশ ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) গতকাল বুধবার মূল্যস্ফীতির হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। চলতি মে মাসেও জিনিসপত্রের দামে ঊর্ধ্বগতি রয়েছে। 

গতকাল সরেজমিন বাজার ঘুরে দেখা যায়, ডিমের দাম এক সপ্তাহের ব্যবধানে আরও ১০ টাকা বেড়েছে।  চালের দাম বেড়েছে কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা। কোনো সবজির কেজি ৬০ টাকার নিচে নয়। এ ছাড়া সরকার ভোজ্যতেলের দাম বাড়ালেও তার চেয়ে বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। 

বিবিএসের প্রতিবেদন বলছে, এপ্রিল মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। আগের মাস মার্চে যা ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের ১০ মাসের (জুলাই-এপ্রিল) মধ্যে আট মাস মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে ছিল। এপ্রিলের আগে গত ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। 

দেখা যাচ্ছে, গত মাসে খাদ্যের তুলনায় খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি বেশি বেড়েছে। এই হার ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ, যা আগের মাস মার্চে ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। অন্যদিকে, খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ। মার্চে যা ছিল ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ। 

বিভিন্ন পণ্য ও সেবা বাবদ মানুষের খরচের হিসাবের ভিত্তিতে প্রতি মাসের ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) তৈরি করে থাকে বিবিএস। মাঠ পর্যায় থেকে  পণ্য ও সেবার দামের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে থাকে সংস্থাটি। এই সূচক আগের বছরের একই মাসের তুলনায় কতটা বাড়ল তার শতকরা হারই পয়েন্ট টু পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষণা সংস্থা সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান সমকালকে বলেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি সম্ভবত মূল্যস্ফীতিতে ভূমিকা রেখেছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন, উৎপাদন, সেচ, সংরক্ষণ ও বিতরণ খরচ বেড়ে যায়, যা দামে প্রভাব ফেলে। 

সেলিম রায়হানের মতে, এপ্রিলের মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি শুধু জ্বালানির দাম বৃদ্ধি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না।  সরবরাহ ব্যবস্থায় অদক্ষতা, বিনিময় হারের চাপ, আমদানি ব্যয়, বাজার আচরণ এবং মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তিনি বলেন, এপ্রিলের মূল্যস্ফীতির চিত্রে গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর চাপ বিশেষভাবে স্পষ্ট। এই বৃদ্ধি গ্রামীণ দরিদ্র, ক্ষুদ্র কৃষক, কৃষি শ্রমিক, দিনমজুর ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবীদের জন্য বড় সংকট তৈরি করছে।  কারণ তাদের আয় অনিশ্চিত, সঞ্চয় সীমিত এবং বাজার থেকে কেনা খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর নির্ভরতা অনেক বেশি। তাই গ্রামীণ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু খাদ্য সরবরাহ বাড়ানো নয়, কৃষি উপকরণের দাম, পরিবহন ব্যয়, স্থানীয় বাজার তদারকি এবং গ্রামীণ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

গ্রামে মূল্যস্ফীতি বেশি 
এপ্রিলে শহর অঞ্চলের চেয়ে গ্রাম অঞ্চলে মূল্যস্ফীতি বেশি ছিল। শহরে  মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। গ্রামে ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। গ্রামের খাদ্যপণ্যের চেয়ে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি বেশি ছিল। গ্রামে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৮১ শতাংশ।  আগের মাসে যা ছিল ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ। গ্রামে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতিও আগের মাসের চেয়ে বেড়েছে।  ৮ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ থেকে বেড়ে এপ্রিলে এ হার ৮ দশমিক ২৩ শতাংশে এসে ঠেকেছে। 
শহরে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে এপ্রিলের মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের মাসে ছিল ৮ দশমিক ৬২ শতাংশ। তবে খাদ্যপণ্যে  তেমন একটা ফারাক ছিল না। এপ্রিল মাসে শহরের খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ, যা আগের মাসে ছিল ৮ দশমিক ৭৮ শতাংশ।  

বাজার পরিস্থিতি
ভোজ্যতেলের পর এবার ডিমের বাজার চড়ছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ডজনে ১০ টাকা বেড়ে ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকায়। সবজির বাজারও চড়া। ৬০ টাকার কমে বাজারে কোনো সবজি মিলছে না। চালের বাজারও বাড়তি। 

ব্যবসায়ীরা জানান, সাম্প্রতিক বৃষ্টির কারণে ডিমের চাহিদা বেড়েছে। এর ফলে দাম বাড়ছে। একই কথা জানান সবজি ব্যবসায়ীরাও। তাদের দাবি, বৃষ্টির কারণে অনেক সবজি নষ্ট হয়ে গেছে। এতে সরবরাহ কমেছে। এর ফলে দাম বাড়ছে। 

তেজকুনিপাড়া এলাকার মায়ের দোয়া স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. হেলাল সমকালকে বলেন, দুই সপ্তাহ ধরে তেজগাঁও ও কাপ্তান বাজারে পাইকাররা ডিমের দর বাড়িয়েছেন। এ কারণে খুচরা বাজারেও দর বেড়েছে।

সপ্তাহখানেক আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৭৬ টাকা থেকে চার টাকা বাড়িয়ে ১৮০ টাকা এবং খোলা পাম অয়েলের দর ১৬৬ টাকা অপরিবর্তিত রাখে। তবে বাজারে এ দরে খোলা ভোজ্যতেল পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন ১৯৪ থেকে ১৯৫ এবং পাম অয়েল কমবেশি ১৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। যদিও বোতলজাত সয়াবিন তেল নতুন দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।

এখন বোরো মৌসুম। চালের দাম কমার কথা থাকলেও বাজারে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। মোটা ও মাঝারি চালের কেজিতে সপ্তাহখানেকের ব্যবধানে দুই থেকে তিন টাকা বেড়েছে। প্রতি কেজি মোটা চাল ৫৫ থেকে ৫৮ এবং মাঝারি চাল ৬০ থেকে ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

সবজির বাজারেও স্বস্তির খবর নেই। ৬০ টাকার কমে কোনো সবজি মিলছে না। বেশির ভাগ সবজি ৭০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে চিচিঙ্গা, ধুন্দুল ও ঝিঙার কেজি বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৯০ টাকা দরে। পটোল ও ঢ্যাঁড়শ কেজি কেনা যাচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকায়। তবে কাঁচামরিচের দর কিছুটা কম। প্রতি কেজি কেনা যাচ্ছে ৬০ থেকে ৯০ টাকায়। 

কারওয়ান বাজারের সবজি ব্যবসায়ী দুলাল হোসেন বলেন, বৃষ্টির কারণে কৃষকরা সবজি তুলতে না পরায় ক্ষেতেই অনেকটা পচে যায়। এর ফলে বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় সবজি আসা কমে যায়। এ কারণে দামও বেড়ে যায়। 

 

আরও পড়ুন

×