মেগা প্রকল্পে মেগা বরাদ্দ, সবচেয়ে বেশি রূপপুরে
আবু হেনা মুহিব
প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬ | ০৮:৪৩
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছর নতুন কোনো মেগা প্রকল্প হাতে নেয়নি সরকার। বড় ব্যয়ের নতুন প্রকল্প নেওয়ার চেয়ে চলমান মেগা প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের কাজ শেষ করার কৌশল নেওয়া হয়েছে। পরিবহন ও যোগাযোগ খাত এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের মেগা প্রকল্পেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আগামী অর্থবছরের অনুমোদিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বড় আকারের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে কয়েকটি প্রকল্পে।
এডিপির বরাদ্দ বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগামী অর্থবছরের এডিপিতে মেগা ১৫টি বৃহৎ প্রকল্পের জন্য মোট ৫৩ হাজার ৬২২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা এডিপির মোট আকারের প্রায় ১৮ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে। বরাদ্দের পরিমাণ ১৫ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছর প্রকল্পটিতে বরাদ্দ ছিল ১০ হাজার ১১ কোটি টাকা। গত বছরের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কাজ ৬৮ দশমিক ২৮ শতাংশ শেষ হয়েছে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। আগামী ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের। রাশিয়া প্রকল্পের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে।
জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সমকালকে বলেন, সরকারের অগ্রাধিকার অনুযায়ী মেগা প্রকল্পে বড় বরাদ্দ দিয়ে আগে শেষ করার পরিকল্পনা ঠিকই আছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে পরে নির্মাণকালে ব্যয় বেড়ে যায়। বড় অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করে সেবা সৃষ্টির পদক্ষেপ ভালো উদ্যোগ। তবে প্রকল্পের ব্যয় সাশ্রয়ী করা, গুণমানসম্পন্ন ব্যয় ও প্রকল্পের গোটা প্রক্রিয়ায় সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। কেননা অতীতে প্রকল্প নিয়ে অনেক অনিয়ম, ব্যত্যয় ও বিচ্যুতি দেখা গেছে।
আগামী অর্থবছরের এডিপিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাত হাজার ৩৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এমআরটি-১ প্রকল্পে, যা দেশের প্রথম পাতাল রেল প্রকল্প। এ প্রকল্পে চলতি অর্থবছরে সংশোধিত বরাদ্দ ছিল মাত্র ৮০১ কোটি টাকা। এ প্রকল্পে ইতোমধ্যে ডিপোর ভূমি উন্নয়ন কাজ শেষ হয়েছে। বিমানবন্দর পর্যন্ত ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তরের কাজ শেষ হয়েছে। ২০২৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০৩০ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। গত অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পে খরচের পরিমাণ তিন হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৩ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা। প্রকল্পটি জাইকার কারিগরি ও ঋণ সহায়তায় নির্মিত হওয়ার কথা। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৩ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা, যার মধ্যে জাইকার ঋণ দেওয়ার কথা ৪০ হাজার কোটি টাকা। মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)।
জানতে চাইলে ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাওগাতুল আলম সমকালকে বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী মেট্রোরেলের প্রকল্পগুলোর কাজ এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছেন তারা। বাড়তি বরাদ্দ দিয়ে আগামী অর্থবছর এমআরটি লাইন-১-এর অবশিষ্ট আটটি আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনের জায়গার পরিষেবা স্থানান্তর, বিমানবন্দর সড়ক ও প্রগতি সরণি অংশে আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশন তৈরি ও পূর্বাচল রুটে ভায়াডাক্টের পাইলিং কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের। দ্রুততম সময়ে প্রকল্পের সেবা উৎপাদনের জন্য বড় বরাদ্দ দিয়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে চায় সরকার। এই বিবেচনায় আগামী এডিপিতে তৃতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প। প্রকল্পটিতে আগামী অর্থবছরের জন্য চার হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের এক হাজার ৭৮ কোটি টাকার বরাদ্দের চেয়ে চার গুণেরও বেশি। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৬ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকা। গত বছরের জুন মাস পর্যন্ত প্রকল্পে নির্মাণকাজে ব্যয় করা হয়েছে ৫০ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা। জাপান সরকারের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা প্রকল্পে কারিগরি ও ঋণ সহায়তা দিচ্ছে।
আগামী এডিপিতে চতুর্থ সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত রুট নিয়ে এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পটি ঢাকার পশ্চিম অংশের সঙ্গে পূর্ব অংশের পরিবহন যোগাযোগ সহজ করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে। আগামী অর্থবছরের এডিপিতে প্রকল্পটির বরাদ্দ প্রায় পাঁচ গুণ করে তিন হাজার ৯১০ কোটি টাকা করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে যা ছিল মাত্র ৮৬৩ কোটি টাকা। প্রকল্পে আগামী অর্থবছরে হেমায়েতপুরে অবস্থিত ডিপোর ভূমি উন্নয়নকাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য কয়েকটি প্যাকেজের দরপত্র চূড়ান্ত করা ও প্রকল্পের জন্য সংশোধিত ডিপিপি তৈরি এবং তা অনুমোদনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উত্তরা থেকে মতিঝিল– দেশের প্রথম মেট্রোরেল ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-৬ নামে প্রকল্পটির কাজ এখনও শেষ হয়নি। মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের কাজ চলছে। সরকার দ্রুত এই কাজ শেষ করতে চায়। এ জন্য আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। আগামী অর্থবছরের এডিপিতে প্রকল্পটিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এক হাজার ৯০০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে যা ছিল এক হাজার ২৩ কোটি টাকা। বাড়তি বরাদ্দ দিয়ে আগামী অর্থবছরে কমলাপুর অংশ পর্যন্ত বাণিজ্যিক কার্যক্রমে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এ প্রকল্পে ৭৫৫ কোটি টাকা ব্যয় কমানো হয়। এতে প্রকল্পের সম্ভাব্য মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা। গত বছরের জুন পর্যন্ত ব্যয় করা হয়েছে ২৫ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। জাইকা এ প্রকল্পে কারিগরি ও ঋণ সহায়তা দিচ্ছে। জাইকার ঋণের পরিমাণ ২০ হাজার ১৯৬ কোটি টাকা। মেগা অন্যান্য প্রকল্পের বরাদ্দও বেড়েছে।
