ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬

বাজেট ২০২৬-২৭

প্রশ্ন ছাড়াই কালো টাকা সাদা করার সুযোগ ফিরল

আবাসন খাতের জন্য এ সুযোগ রাখা হয়েছে অর্থবিলে

প্রশ্ন ছাড়াই কালো টাকা সাদা করার সুযোগ ফিরল
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬ | ২১:১৯

কোনো প্রশ্ন করা ছাড়াই আবাসন খাতে কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ সাদা করার সুযোগ রাখা হয়েছে আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে। আবাসন খাতে জমি, বিল্ডিং বা ফ্ল্যাট কেনাবেচার ক্ষেত্রে দলিলমূল্যের চেয়ে প্রকৃত মূল্য বেশি হলে স্বপ্রণোদিত হয়ে ঘোষণা দিলে অপ্রদর্শিত অতিরিক্ত অর্থ নিয়মিত কর দিয়ে বৈধ করা যাবে। ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই এই সুবিধা পাবেন। বিভিন্ন মহল থেকে এ ধরনের সুযোগ না রাখার আহ্বান জানানো হলেও শেষ পর্যন্ত আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অর্থবিলে এ সংক্রান্ত বিধান রাখা হয়েছে। 

তবে বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে দেওয়া অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তব্যে এ বিষয়ে কিছু উল্লেখ করা হয়নি। কালো টাকা সাদা বা বৈধ করার প্রস্তাবিত বিধান সংসদে আলোচনা করা ছাড়াই অর্থবিলে অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছে। 

অর্থবিলে আয়কর আইন, ২০২৩-এর প্রথম তপশিলের সংশোধনী অনুযায়ী, কোনো করদাতার জমি, বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্ট কেনাবেচার প্রকৃত মূল্য দলিলমূল্যের চেয়ে বেশি হলে তিনি ওই অপ্রদর্শিত অর্থের ওপর ব্যক্তিশ্রেণির জন্য প্রযোজ্য নিয়মিত করহারে আয়কর পরিশোধ করতে পারবেন। অর্থ আইন বা বাংলাদেশে প্রচলিত অন্য কোনো আইনে যা-ই থাকুক না কেন কোনো ব্যক্তি স্বপ্রণোদিত হয়ে এই কর পরিশোধ করলে সেই বিষয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন বা কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে না।

যদি অর্থ আইনের অধীনে কোনো ব্যক্তির এ ধরনের বিষয়ে কোনো কার্যক্রম ইতোমধ্যে গ্রহণ করা হয়ে থাকে, তাহলে অতিরিক্ত ক্রয় বা বিক্রয়মূল্যের ওপর প্রযোজ্য করের সঙ্গে অতিরিক্ত ২০ শতাংশ কর পরিশোধ করতে হবে। 

কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার জন্য আয়কর বিবরণী বা রিটার্নের ‘জীবনযাপনসংশ্লিষ্ট ব্যয়ের বিবরণী’তে ‘উৎসে কর্তিত’ বা ‘সংগৃহীত কর’ উল্লেখ করার বিধান রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমেই কর্মকর্তারা বুঝতে পারবেন এবং তাঁকে এ নিয়ে আর কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা বা উৎস নিয়ে প্রশ্ন করা হবে না। তবে এ বিনিয়োগ কার্যক্রমের জন্য আদালতে আগে থেকেই দোষী প্রমাণিত হওয়া কোনো ব্যক্তি এই ধরনের সুবিধা পাবেন না।

আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ করার সুযোগ দিলে টাকা পাচার কমে আসবে। অচল মূলধন অর্থনীতির মূলধারায় ফিরবে। ফলে স্থবিরতা কাটবে বেসরকারি বিনিয়োগে।

এ বিষয়ে আবাসন খাতের সংগঠন রিহ্যাবের সভাপতি ড. আলী আফজাল সমকালকে বলেন, ‘রিহ্যাবের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট এবং সময়োপযোগী। অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন খাতে যে বিপুল পরিমাণ অপ্রদর্শিত বা অলস অর্থ জমে আছে, সেগুলোকে উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত করার বাস্তব সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি। আবাসন শিল্প এমন একটি খাত, যেখানে বিনিয়োগ দ্রুত অর্থনৈতিক চক্রে ফিরে এসে নির্মাণ শিল্প, ইস্পাত, সিমেন্ট, সিরামিক, পরিবহনসহ অসংখ্য লিংকেজ শিল্পকে সক্রিয় করে তোলে।

তিনি বলেন, সরকার যদি স্বচ্ছ নীতিমালার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে অপ্রদর্শিত অর্থ আবাসন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ দেয়, তাহলে তা একদিকে যেমন রিয়েল এস্টেট বাজারে গতিশীলতা আনবে, অন্যদিকে সামগ্রিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে আবাসন সংকট মোকাবিলা, নগর উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। 

এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয় বলে মনে করেন আলী আফজাল। তাঁর মতে, দীর্ঘ মেয়াদে এমন কর ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে করহার যৌক্তিক হবে, কর প্রদান সহজ হবে এবং মানুষ স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উৎসাহিত হবে। করের বোঝা অতিরিক্ত হলে মানুষ কর ফাঁকির পথ খোঁজে, কিন্তু করহার যৌক্তিক হলে রাজস্ব আদায়ও বাড়ে এবং অপ্রদর্শিত অর্থ সৃষ্টির প্রবণতাও কমে।

কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়াকে অসাংবিধানিক, দুর্নীতি সহায়ক ও বৈষম্যমূলক বলে মনে করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সমকালকে বলেন, এমন সুযোগ দেওয়ার অর্থ হচ্ছে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্নীতিকে আইনগত সুরক্ষা দেওয়া ও বিচারহীনতার শামিল। 

তিনি বলেন, আবাসন খাতে ব্যবসায় স্থবিরতা দূর, শিল্প খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার অজুহাতে এ জাতীয় দুর্নীতি সহায়ক সুযোগ দেওয়া সরকারের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে। এমন সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্নীতি ও অনিয়মকে স্বাভাবিকতায় পরিণত করার সমান মন্তব্য করে তিনি এই সুযোগ চিরতরে বন্ধ করার আহ্বান জানান।

আরও পড়ুন

×