জলবায়ু পরিবর্তন মাথায় রেখে অর্থনীতির সিদ্ধান্ত নিতে হবে
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, অর্থনৈতিক কাঠামোর পুনর্বিন্যাস এবং টেকসই উন্নয়নের সম্ভাবনা নিয়ে এক আলোচনায় বক্তারা দেশের অর্থনীতি নিয়ে নীতি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয় মাথায় রাখার সুপারিশ করেছেন। তারা বলেন, অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরিবেশ রক্ষায় আরও গুরুত্ব বাড়ানো উচিত।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে ‘গ্রিন ডায়ালগ: জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস’ শীর্ষক এ আলোচনার আয়োজন করে দৈনিক বণিক বার্তা। অনুষ্ঠানে সরকারের নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, পরিবেশ ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চার শতাধিক প্রতিনিধি অংশ নেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বণিক বার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ভবিষ্যতের কোনো বিষয় নয়। এর ক্ষতিকর প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। অতিরিক্ত গরমে কারখানার শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা কমছে। কৃষিজমিতে লবণাক্ততা বাড়ছে, যা কৃষিজমি ও পানীয় জলের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি ও বন্যায় কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বেড়ে যেতে পারে পরিবহন ব্যয়। শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন বন্ধ হলে রপ্তানি ও কর্মসংস্থানেও আঘাত আসতে পারে।
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন-বিষয়ক) ড. মো. সাইমুম পারভেজ এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর চিংফেং ঝাং। প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল, টিকে গ্রুপের গ্রুপ ডিরেক্টর মোহাম্মাদ মুস্তাফা হায়দার, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও অনন্ত গ্রুপের এমডি শরীফ জহীর, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের এমডি মো. ফজলুল কাদের, হ্যামস গ্রুপের এমডি প্রকৌশলী শফিকুর রহমান এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) এস.এম. মনিরুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন ও জলবায়ু অর্থায়নে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে হ্যামস গার্মেন্টস ও ইডকলকে সম্মাননা দেওয়া হয়।
ড. সাইমুম পারভেজ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অর্থনীতিরও বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস ঘটছে। জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতির দিকে বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে।
চিংফেং ঝাং বলেন, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে জলবায়ুজনিত অভ্যন্তরীণ অভিবাসীর সংখ্যা দাঁড়াতে পারে ১ কোটি ৩৩ লাখে। সে জন্য সহনশীলতার কথা মাথায় রেখে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ধারাবাহিক উদ্যোগ কী ধরনের সাফল্য এনে দিতে পারে, বাংলাদেশ তা ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে। ১৯৭০ সালের পর থেকে ঘূর্ণিঝড়ে মৃত্যুহার শতভাগ কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। একটি সহনশীল অর্থনীতি গড়ার ক্ষেত্রে একই ধরনের দৃঢ়সংকল্প নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে মোস্তফা কামাল বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে হলে প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। টেকসই উন্নয়ন আমাদের চিন্তা ও কর্মপরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া উচিত। প্রকৃতি, পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখেই শিল্পের প্রকৃত অগ্রগতি সম্ভব।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে, উৎপাদনশীলতা কমায় এবং কৃষি, শিল্প, সেবাসহ অর্থনীতির প্রধান খাতগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ এত দিন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে হিসাব করা হয়েছে, তাতে পরিবেশগত সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকৃত অর্থনৈতিক ব্যয় পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি। এসব ব্যয় প্রবৃদ্ধির হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হলে দেশের প্রকৃত প্রবৃদ্ধি বা মোট দেশজ উৎপাদনের পরিমাণ আরও কম হতে পারে।
প্রকৌশলী শফিকুর রহমান বলেন, শুধু গাছপালা দিয়ে কারখানা সাজানোই পরিবেশবান্ধব কারখানা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য নয়। এর মূল লক্ষ্য হলো জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার হ্রাস করা। পাশাপাশি পানি পুনর্ব্যবহারের ওপরেও গুরুত্ব দিতে হবে।
শরীফ জহীর বলেন, সামনে কপ৩১ সম্মেলন। এ ধরনের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের কার্যকর ও শক্তিশালী দরকষাকষি নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য দক্ষ ও অভিজ্ঞ প্রতিনিধি প্রয়োজন, যাতে ধনী ও উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে বাংলাদেশের প্রাপ্য ক্ষতিপূরণের অংশ আদায় করা সম্ভব হয়।
- বিষয় :
- জলবায়ু