সাজেকে নিত্যপণ্য, জরুরি ওষুধ সরবরাহ ব্যাহত, জনভোগান্তি
বিজন কান্তি সরকার
রাঙামাটি অফিস ও খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:০৭ | আপডেট: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
পাঁচ দফা দাবিতে গতকাল বুধবার টানা সপ্তম দিনের মতো সড়ক অবরোধ অব্যাহত ছিল রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে। এতে বন্ধ রয়েছে পর্যটন কেন্দ্রের কার্যক্রম। ব্যাহত হচ্ছে যান চলাচল ও পণ্য সরবরাহ। পর্যটক না থাকায় আয় বন্ধ হয়েছে রিসোর্ট, কটেজ, রেস্তোরাঁ ও দোকানপাটের মালিকদের। বিপাকে পড়েছেন পরিবহন শ্রমিকরাও।
অন্যদিকে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও জরুরি ওষুধের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় দুর্ভোগ বাড়ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।
সাজেক রাঙামাটি জেলার অন্তর্ভুক্ত হলেও পর্যটন কেন্দ্রটিতে যাতায়াতের প্রধান পথ খাগড়াছড়ির দীঘিনালা হয়ে। ফলে সাজেকের পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে খাগড়াছড়ির পরিবহন, আবাসন ও খাবারের ব্যবসাও যুক্ত। অবরোধের প্রভাব পড়েছে এসব খাতেও।
খাগড়াছড়ি পার্বত্য যানবাহন সমিতির নেতা আয়ুস কান্তি চাকমা সমকালকে বলেন, সাজেক-দীঘিনালা-খাগড়াছড়ি সড়কে চলাচলকারী প্রায় সব যানবাহনই অচল হয়ে পড়েছে। এতে শত শত পরিবহন মালিক, চালক ও শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। রোজগার না থাকায় তাদের পরিবারগুলো আর্থিক সংকটে পড়েছে। মানুষের দুর্ভোগ বিবেচনায় নিয়ে অবরোধ কর্মসূচি শিথিল বা স্থগিত করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
একসময় পর্যটকদের পদচারণায় মুখর থাকত সাজেকের রিসোর্ট, কটেজ, রেস্তোরাঁ ও দোকানপাট। এখন সেখানে অনেকটাই নীরবতা। পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ থাকায় পর্যটননির্ভর ব্যবসায়ীদের আয়ও বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু তাদের খরচ থেমে নেই। রিসোর্ট ও কটেজের ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন এবং পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে হচ্ছে। অবরোধ দীর্ঘায়িত হলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
পর্যটন খাতের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকরাও কাজ হারিয়েছেন। তাদের অনেকে পর্যটকদের পরিবহন, খাবার সরবরাহ ও আবাসন সেবার ওপর নির্ভরশীল। নিয়মিত আয় বন্ধ থাকায় এসব পরিবারের দৈনন্দিন জীবনেও সংকট তৈরি হয়েছে।
খাদ্য ও ওষুধ নিয়ে উদ্বেগ
অবরোধের প্রভাব শুধু পর্যটন ব্যবসায় সীমাবদ্ধ নেই। সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সাজেকের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন যান চলাচল বন্ধ থাকলে চাল, ডাল, তেলসহ প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর সংকট আরও বাড়তে পারে।
জরুরি ওষুধের সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। দুর্গম এলাকায় চিকিৎসাসামগ্রী সংগ্রহের সুযোগ সীমিত। সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকলে অসুস্থ ব্যক্তি, শিশু ও বয়স্কদের চিকিৎসা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। জরুরি প্রয়োজনে রোগীকে হাসপাতালে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
সাজেকের বাসিন্দা মিন্টি মালা বলেন, দুর্গম এই এলাকায় সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী সংগ্রহে সমস্যা হয়। অবরোধ দীর্ঘায়িত হলে স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
বিশেষ কারবারি সম্মেলন
সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে চলা সড়ক অবরোধের কারণে গতকালও সারাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে সাজেক ভ্যালি।
সকাল থেকে অবরোধকারীরা সড়কের কয়েকটি স্থানে গাছের গুঁড়ি ফেলে আগুন ধরিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। ঘটনাস্থল উজোবাজারে গতকাল সাপ্তাহিক হাট বসলেও লোকজনের সমাগম ছিল খুবই কম। দূরদূরান্ত থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আসতে পারেননি।
ফেসবুক পেজে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি জানায়, সপ্তম দিনেও সাজেক পর্যটন সড়কে শান্তিপূর্ণ অবরোধ পালিত হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্স, সাংবাদিক, ধর্মীয় কাজে ভান্তের (ভিক্ষু) গাড়িসহ জরুরি সেবার জন্য কিছু যানবাহন অবরোধের আওতা মুক্ত রয়েছে।
এদিকে গতকাল সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে বিশেষ কারবারি (গ্রামপ্রধান) সম্মেলন ডাকা হয়। গঙ্গারাম এলাকায় সম্মেলনে সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমার সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন কারবারি উপদেষ্টা কমিটির জ্যোতি লাল চাকমা, সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক বিনয় চাকমা ও সদস্য সুপতি চাকমা। সম্মেলনে সাজেক ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের ৩৭ কারবারি অংশ নেন।
সম্মেলনে বক্তারা ২২ অক্টোবর উজোবাজারে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা, নির্যাতন, ভাঙচুর, লুটপাট ও গুলিবর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদসহ পাঁচ দফা প্রস্তাবনা গ্রহণ এবং দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা জানান, গতকাল সাজেক ইউনিয়নে বিশেষ সম্মেলন করা হয়েছে। সম্মেলন থেকে সাজেকের চলমান আন্দোলনের সমর্থন ও একাত্মতা জানিয়ে কারবারিরা পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেছেন।
আলোচনায়ও কাটেনি অচলাবস্থা
সংকট নিরসনে গত সোমবার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে উজোবাজারে খাগড়াছড়ি আসনের সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া, রাঙামাটি আসনের সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠক করেন। পাঁচ দফা দাবির মধ্যে চার দফা দাবি প্রশাসন মেনে নেয়। আন্দোলনকারীদের অন্যতম দাবি, সাজেক থেকে জনসংহতি সমিতির সন্তু লারমা অংশের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার সময়সীমা নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দেয়। ফলে অচলাবস্থা কাটেনি। প্রশাসন বলছে, সংকট নিরসনে আলোচনা চলমান রয়েছে।
- বিষয় :
- সাজেক