প্রতিক্রিয়া
এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা বাড়ল, সংস্কারের অগ্রগতি কতদূর?
সেলিম রায়হান
সেলিম রায়হান
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | ১২:৩৫ | আপডেট: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | ১৩:৫০
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের জন্য প্রস্তুতির সময়সীমা আরও তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এর ফলে পূর্বনির্ধারিত ২৪ নভেম্বর, ২০২৬-এর পরিবর্তে বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ২৪ নভেম্বর, ২০২৯। এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে বাড়তি প্রস্তুতির সুযোগ তৈরি করলেও একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা এবং প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কারের অসম্পূর্ণ চিত্রও তুলে ধরেছে।
কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধজনিত অর্থনৈতিক অভিঘাত, বিশ্ববাজারের অস্থিরতা, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং দেশের রাজনৈতিক ও আর্থিক অনিশ্চয়তা এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকে নিঃসন্দেহে কঠিন করে তুলেছে। তবে এসব প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ বিগত কয়েক বছরে কতটা কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। কারণ, একটি দেশের উন্নয়নের প্রকৃত চিত্র কেবল মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি কিংবা কয়েকটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকের ইতিবাচক পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, কর্মসংস্থানের সুযোগ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতাও উন্নয়নের অপরিহার্য মাপকাঠি।
এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বর্তমানে পাওয়া বিভিন্ন শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার ও অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা হারাতে পারে। এর প্রভাব বিশেষভাবে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে তৈরি পোশাক খাতে, কারণ এই শিল্পই দেশের রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় অংশ জোগান দেয়। সুবিধা কমে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে এ খাতকে অধিক প্রতিযোগিতা এবং অতিরিক্ত শুল্কের মুখোমুখি হতে হবে। পাশাপাশি স্বল্প ব্যয়ে বৈদেশিক ঋণ ও অর্থায়ন, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও নতুন বাস্তবতা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের রপ্তানি খাত এখনো অল্প কয়েকটি পণ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এর সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ, বিনিয়োগে ধীরগতি, রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা এবং প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তির অভাব অর্থনীতির টেকসই অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। তাই কেবল এলডিসি উত্তরণের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করাই বাংলাদেশের জন্য চূড়ান্ত অর্জন হতে পারে না। বরং উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখা এবং প্রতিযোগিতায় সক্ষম থাকার জন্য একটি সুদৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলাই হওয়া প্রয়োজন মূল অগ্রাধিকার। এ কারণে এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর বাড়ার বিষয়টিকে জাতীয় অর্জন হিসেবে প্রচার না করে অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার একটি বাড়তি সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানো জরুরি।
আগামী তিন বছরে ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি এবং রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধিতে বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের সম্প্রসারণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সম্প্রসারণকেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
সবচেয়ে জরুরি হলো, এসব সংস্কার যেন শুধু সরকারি পরিকল্পনা, নীতিগত ঘোষণা কিংবা কাগজে-কলমের প্রতিশ্রুতির মধ্যে আটকে না থাকে। বাস্তব অর্থনীতিতে সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগ ও ইতিবাচক ফলাফল দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, ২০২৯ সাল এলেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর স্বয়ংক্রিয় সমাধান হয়ে যাবে না। এখন থেকেই প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন না করা হলে নতুন সময়সীমা শেষ হওয়ার পরও দেশকে একই ধরনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হতে পারে। তাই মূল বিবেচ্য বিষয় সময়সীমা বৃদ্ধি নয়; বরং এই অতিরিক্ত তিন বছরকে কতটা পরিকল্পিত, কার্যকর ও ফলপ্রসূভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে, তার ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও টেকসই উন্নয়নের পথ।
লেখক : অর্থনীতির অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, সানেম