ঢাকা মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬

‘এলডিসি থেকে উত্তরণ মাথায় রেখে জ্বালানির পরিকল্পনা নিতে হবে’ 

‘এলডিসি থেকে উত্তরণ মাথায় রেখে জ্বালানির পরিকল্পনা নিতে হবে’ 
×
×

ছবি-সংগৃহীত

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ | ২২:১৫

দেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে কারখানাভিত্তিক উদ্যোগের পাশাপাশি সমন্বিত অবকাঠামো, সহজ শর্তে অর্থায়ন ও সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। এ খাতের জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর জোর দিয়েছেন তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা।  

সোমবার চট্টগ্রামের হোটেল আগ্রাবাদে আয়োজিত এক সম্মেলনে তাঁরা এসব কথা বলেন। ‘র‍্যাপিড এনার্জি ট্রানজিশন কনফারেন্স: পাওয়ারিং সিকিউরিটি, সাসটেইনেবিলিটি অ্যান্ড গ্রোথ ইন বাংলাদেশ আরএমজি’ শীর্ষক এ সম্মেলনের আয়োজন করে এথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ (ইটিআই) বাংলাদেশ। মঙ্গলবার ইটিআই বাংলাদেশের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।

সম্মেলনে বিজিএমইএর পরিচালক ও ভারপ্রাপ্ত সহসভাপতি এবং এইচকে টিজি গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এনামুল আজিজ চৌধুরী বলেন, বর্তমান জ্বালানি সংকট আমদানি নির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর বাংলাদেশের নির্ভরশীলতার দুর্বলতা সামনে এনেছে। টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও কার্বন নিঃসরণ কমানো এখন আর শুধু পরিবেশগত বিষয় বা সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ নয়; আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

তিনি বলেন, সাময়িকভাবে জ্বালানি সংকট মোকাবিলার চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ এবং রপ্তানি বাজারে পরিবেশ ও জলবায়ু-সংক্রান্ত শর্ত কঠোর হওয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে প্রস্তুতি নিতে হবে। তবে এ পরিবর্তন শুধু উদ্যোক্তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এ জন্য সরকারের সহযোগিতা, সহজলভ্য সবুজ অর্থায়ন, কারিগরি সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব প্রয়োজন।

বিকেএমইএর পরিচালক ও সনেট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইয়াসিন বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তিত চাহিদা দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর বিলাসিতা নয়, শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার বৈশ্বিক প্রয়োজন। এলডিসি উত্তরণের আগে প্রস্তুতির সময়টুকু কাজে লাগিয়ে জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ত্বরান্বিত এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মান পূরণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

সম্মেলনে বক্তারা বলেন, কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করেই আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ক্রমবর্ধমান নবায়নযোগ্য জ্বালানির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে না। এ জন্য কারখানার বাইরে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন, অন্য উৎপাদকদের কাছ থেকে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ কেনার ব্যবস্থা এবং জাতীয় গ্রিডের কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহকারী কারখানার জন্য কার্যকর প্রণোদনারও প্রয়োজন রয়েছে।

বিজিএমইএর অতিরিক্ত সচিব লেফটেন্যান্ট কমান্ডার (অব.) মো. কুতুবউদ্দিন চট্টগ্রামে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলগুলোর (ইপিজেড) অব্যবহৃত জমি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে কাজে লাগানো যেতে পারে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ রয়েছে।

বিকেএমইএর জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সম্পাদক (প্রশাসন) মো. আলতাফ উদ্দিন বলেন, আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরের জন্য শিল্পের জ্বালানি চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। রানা প্লাজার দুর্ঘটনার পর কারখানার কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা উন্নয়নে শিল্পের সবাই যেভাবে সম্মিলিত উদ্যোগ নিয়েছিল, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও তেমন সহযোগিতা প্রয়োজন। চট্টগ্রামে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা কারখানাগুলোর জন্য পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল ও সমন্বিত জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

ইটিআই বাংলাদেশের পরিচালক (প্রোগ্রাম, এভিডেন্স অ্যান্ড লার্নিং) মুনির উদ্দিন শামীম বলেন, পোশাকশিল্পের জ্বালানি রূপান্তরে বিচ্ছিন্নভাবে একেকটি কারখানার উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; এ জন্য কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন। বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড, শ্রমিকনেতা ও অন্যান্য অংশীজনের মধ্যে সম্পর্ক ও সহযোগিতা জোরদারে ইটিআই কাজ করছে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ত্বরান্বিত করতে নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের পক্ষেও কাজ করছে সংস্থাটি।

ওয়ার্কার লেড ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (ওয়ার্কার ক্যান) আহ্বায়ক এবং বাংলাদেশ জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের যুব কমিটির সভাপতি মো. হাসান আলী বলেন, জ্বালানি রূপান্তরের ক্ষেত্রে শুধু উৎপাদন ও ব্যবসার প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নয়, শ্রমিকদের অধিকার, কর্মসংস্থান ও জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় শ্রমিক ও ট্রেড ইউনিয়নকে যুক্ত করা হলে শিল্পকে টেকসই করতে তাঁরা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন।

সম্মেলনে দুটি অধিবেশনে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা, অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। ব্র্যাক ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকের প্রতিনিধিরা সবুজ অর্থায়ন এবং পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা তুলে ধরেন। গ্রিনার গার্মেন্টস ইনিশিয়েটিভের (জিজিআই) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নুরে আলম নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি ও তৃতীয় পক্ষের অর্থায়ন ব্যবস্থার সম্ভাবনা তুলে ধরেন। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে কারখানার প্রাথমিক বিনিয়োগের চাপ কমানো সম্ভব বলে আলোচনায় উল্লেখ করা হয়।

সম্মেলনে চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে যৌথ জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে তোলা, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের বাইরে বিকল্প উৎস সম্প্রসারণ এবং কারখানাভিত্তিক জ্বালানি রূপান্তরের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা তৈরির সুপারিশ করা হয়। এতে ৮৫ জন অংশগ্রহণ করেন। তাঁদের মধ্যে ৭০ জন ছিলেন বিভিন্ন কারখানার প্রতিনিধি।

আরও পড়ুন

×