মৃত ব্যক্তির নামে ঋণ দেখিয়ে অর্থ লোপাট
আবু কাওসার
প্রকাশ: ২০ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৩:১৪
মৃত ব্যক্তির নামে ঋণ বিতরণ করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ ছাড়া
ভুয়া নাম এবং অস্তিত্বহীন সমিতির সদস্য দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা তছরুপ করা
হয়েছে। এভাবে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও
সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীন পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশনের (পিডিবিএফ)
আওতায় বাস্তবায়নাধীন বিভিন্ন প্রকল্পে। কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর
জেনারেলের (সিএজি) হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে।
গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য বিমোচনে কাজ করে পিডিবিএফ। হাঁস-মুরগি পালন,
মৎস্যচাষসহ বিভিন্ন আয়বর্ধনমূলক ছোট ছোট প্রকল্পে নিজ সদস্যদের বিনা
জামানতে ঋণ বিতরণ করে সংস্থাটি। সারাদেশে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল নিয়ে গঠিত
সমিতির মাধ্যমে ঋণ দেওয়া হয়। সেই ঋণের টাকা লোপাট করা হয়েছে জালিয়াতির
মাধ্যমে। এ অনিয়ম ঘটেছে পিডিএফের বাগেরহাট, পিরোজপুর ও বরিশাল কার্যালয়ে। এ
সব জেলার মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এ অনিয়মে জড়িত বলে সিএজির প্রতিবেদনে
উল্লেখ করা হয়।
সিএজি কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, মাঠ পর্যায়ে পিডিবিএফের ঋণ
প্রদান ও আদায় কর্মকাণ্ডে তদারকি খুবই দুর্বল। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ
ব্যবস্থাও ভালো নয়। ফাউন্ডেশন থেকে সমিতির মাধ্যমে সুবিধাভোগীদের ঋণ
বিতরণে যে নিয়ম-কানুন রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে তা মানা হয় না। এসব কারণে ঋণ
বিতরণের নামে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।
জানা গেছে, গত বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সিএজির তিন সদস্যের
একটি প্রতিনিধি দল এ নিয়ে মাঠ পর্যায়ে নিরীক্ষা চালিয়েছে। তবে এসব অভিযোগ
অস্বীকার করে পিডিবিএফ কর্তৃপক্ষ বলেছে, সিএজির প্রতিবেদনে যে সব অনিয়মের
কথা বলা হয়েছে তা সঠিক নয়। পিডিবিএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত)
কৃষিবিদ আমিনুল ইসলাম সমকালকে বলেন, সিএজির প্রতিবেদন ভিত্তিহীন। সংশ্নিষ্ট
অভিযোগে সংস্থার পক্ষ থেকে তদন্ত চালিয়ে কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, পিডিবিএফ একটি বড় প্রতিষ্ঠান। সারাদেশে এর কার্যক্রম চলছে।
শতভাগ কাজ যে সঠিকভাবে চলছে, তা জোর দিয়ে বলা যায় না। কিছু অনিয়ম তো হতেই
পারে। তিনি দাবি করেন, সরকারি খাতে পিডিবিএফ সবচেয়ে ভালো প্রতিষ্ঠান। এই
প্রতিষ্ঠানের ঋণ আদায়ের হার ৯৭ থেকে ৯৮ শতাংশ। এটা সম্ভব হয়েছে নিবিড়
তদারকির কারণে।
সিএজির নিরীক্ষক দল সরেজমিন পরিদর্শনে প্রমাণ পেয়েছে যে বাগেরহাট সদরে
দারিদ্র্য বিমোচনের নামে বিভিন্ন প্রকল্পে ২৪টি সমিতির মাধ্যমে জালিয়াতি
করে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এমন ঘটনাও ঘটেছে, সমিতির সদস্য মারা গেলেও তার
নামে ঋণ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বেনামি/ভুয়া সদস্য দেখিয়ে ঋণের টাকা আত্মসাৎ
করা হয়েছে। এসব অনিয়মের মাধ্যমে বাগেরহাট সদর অফিসে প্রায় ৩ কোটি ৪১ লাখ
টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে সিএজির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এ অনিয়মের সঙ্গে পিডিবিএফের বাগেরহাট অফিসের তিন কর্মকর্তা জড়িত বলে জানা
গেছে। তারা হলেন- পুলকচন্দ্র দাস, কামরুল ইসলাম ও রিতা রায়। একইভাবে ঋণের
টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে পিরোজপুর ও বরিশালে। এর মধ্যে পিরোজপুর সদর ও
মঠবাড়িয়া কার্যালয়ে চারটি সমিতির মাধ্যমে ৪৬ লাখ ৩০ হাজার, বরিশাল সদর
কার্যালয়ে আটটি সমিতির মাধ্যমে ৬৯ লাখ, বরিশালের বানারীপাড়া কার্যালয়ে ১৯টি
সমিতির মাধ্যমে ৮৯ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। মঠবাড়িয়ায় সুদেপ কুমার
মসিদ, বরিশাল সদর ও বানারীপাড়ায় রানী হালদার, রানী মজুমদার ও নাসরিন বেগম
জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত বলে নিরীক্ষক দল প্রমাণ পেয়েছে। সব মিলে এসব জেলায়
৫৫টি সমিতির মাধ্যমে ৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে সিএজির
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পিডিবিএফ সূত্রে জানা গেছে, শুরু থেকে এ পর্যন্ত সারাদেশে প্রায় ১১ লাখ
সুবিধাভোগীর কাছে ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। ছোট ছোট দল গঠনের
মাধ্যমে সংস্থার অধীনে সমিতির সদস্যদের এ ঋণ দেওয়া হয়। প্রত্যেক সদস্য
সর্বনিম্ন ২০ হাজার ও সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণ সুবিধা
পান। সদস্যদের আত্মনির্ভরশীল করার লক্ষ্যে আয়বর্ধনমূলক কর্মকাণ্ড (আইজিএ),
যেমন- পশু মোটাতাজাকরণ, ছাগল পালন, শাকসবজি চাষসহ বিভিন্ন প্রকল্পে ঋণ
সহায়তা দেওয়া হয়।
এদিকে পিডিবিএফ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সিডর পুনর্বাসনের নামে অর্থ লোপাটের
চিত্রও উঠে এসেছে সিএজির প্রতিবেদনে। মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শনকালে সিএজির
প্রতিনিধি দল প্রমাণ পেয়েছে, ওই চার জেলায় সিডর পুর্নবাসন কার্যক্রমে
কানাডিয়ান উন্নয়ন সংস্থা সিডার দেওয়া প্রায় ৪ কোটি টাকা যথাযথভাবে খরচ
করেনি পিডিবিএফ। নিরীক্ষক দল বলেছে, ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে
সিডা ওই টাকা দিলেও পিডিবিএফ তা সমিতির সদস্যদের মাঝে ঋণ হিসেবে বিতরণ ও
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ খরচ করা হয়। এটা আইনসঙ্গত হয়নি।
বিপুল খেলাপি ঋণ : সংস্থার 'স্মল লোন এন্টারপ্রাইজ প্রোগ্রামের' আওতায়
বিতরণ করা প্রায় ১৬ কোটি টাকার ঋণ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে বলে সিএজির
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। নিরীক্ষক দল বলেছে, বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরিশাল
সদর ও বানারীপাড়ায় সমিতির প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার সদস্যের মধ্যে ওই টাকা
বিতরণ করা হলেও তা আদায় করা হয়নি।
সিএজি কর্তৃপক্ষ বলেছে, মাঠ পর্যায়ে তদারকি না থাকায় বিপুল ঋণ
মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। এই টাকা আদায়ে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সিএজি
কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ওই খেলাপি ঋণ আদায়ের বিষয়ে সংশ্নিষ্ট
মন্ত্রণালয় ও পিডিবিএফ কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে অবহিত করা হলেও কোনো জবাব
পাওয়া যায়নি। অবশ্য, পিডিবিএফের এক কর্মকর্তা বলেছেন, খেলাপি ঋণের মাত্রা
সহনীয়। ঋণ আদায়ের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
- বিষয় :
- অর্থ লোপাট
