ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

এগিয়ে বিদ্যুৎ পিছিয়ে গ্যাস

এগিয়ে বিদ্যুৎ পিছিয়ে গ্যাস
×

সবুজ ইউনুস

প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩:১৮

অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস। গত এক দশকে বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক অগ্রগতি হলেও গ্যাস খাত কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন এখন উদ্বৃত্ত। সঞ্চালন ও বিতরণ খাতও দ্রুত এগোচ্ছে। দেশে বর্তমানে ৯৫ ভাগ মানুষ বিদ্যুতের সুবিধা ভোগ করছে। সরকারের ঘোষিত মহাপরিকল্পনার লক্ষ্যমাত্রায় বলা হয়, ২০২১ সালে সবার ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া হবে। কিন্তু বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বীরবিক্রম সমকালকে বলেছেন, ২০২১ নয়, ২০২০ সালের মধ্যেই বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হবে। কারণ, বর্তমানে উৎপাদন উদ্বৃত্ত রয়েছে। বিতরণ লাইনের অভাবের কারণে সরবরাহ করা যাচ্ছে না। তবে নতুন সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন নির্মাণের কাজ চলছে দুর্বার গতিতে। এদিকে, পুরোনো জরাজীর্ণ লাইনও প্রতিস্থাপনের কাজ চলছে। ফলে বর্তমানে গ্রামগঞ্জে যে লোডশেডিং হচ্ছে, সেটাও কয়েক বছরের মধ্যে আর থাকবে না।

গত ১০ বছর বিদ্যুৎ খাত যে গতিতে এগিয়েছে, সে গতিতে এগোতে পারেনি গ্যাস খাত। ২০০৯ সালে সারাদেশে প্রতিদিন বিদ্যুৎ উৎপাদিত হতো মাত্র সাড়ে ৪০০ মেগাওয়াট। লোডশেডিং আর বিদ্যুৎ বিভ্রাট ছিল গ্রাহকের নিত্যসঙ্গী। ২০১৯ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ২৩ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ মাত্র ১০ বছরে ১৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বেড়েছে।

বর্তমানে সারাদেশে প্রতিদিনই গ্যাসের চাহিদা আছে বেসরকারি হিসাবে ৪২০ থেকে ৪৫০ কোটি ঘনফুট। সেখানে দেশের গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন করা হয় ২০০ কোটি ঘনফুটের কিছু বেশি। বাকি ১০০ কোটি ঘনফুট আমদানি করা হচ্ছে। এভাবে আপাতত আমদানি করা গ্যাস দিয়ে পরিস্থিতি কোনোরকমে সামাল দেওয়া হচ্ছে। তারপরও ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে শিল্প উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে ব্যাপকভাবে। বিশ্নেষকরা বলছেন, শিল্পের মূল চালিকাশক্তি হলো গ্যাস ও বিদ্যুৎ। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ পেলে দেশ আরও দ্রুত এগিয়ে যাবে।

ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা ব্যক্ত করে বলেছেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন না বাড়িয়ে সরকার আমদানির দিকেই বেশি নজর দিচ্ছে। এতে গ্যাসের দাম বাড়ছে ব্যাপকভাবে। ফলে পণ্যের উৎপাদন খরচও বাড়ছে। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় টিকে থাকা মুশকিল হয়ে পড়ছে। সরকারকে এদিকটাও ভাবতে হবে। আমাদের রপ্তানি আয়ের ৮০ ভাগের বেশি আসে পোশাক খাত থেকে। চীনের পর পৃথিবীর দ্বিতীয় প্রধান পোশাক রপ্তানি দেশ বাংলাদেশ। ভিয়েতনাম তৃতীয় অবস্থানে। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, যেভাবে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, তাতে ভিয়েতনাম বাংলাদেশকে টপকে যাবে খুব তাড়াতাড়ি। এসব দিকও সরকারকে মাথায় রাখার পরামর্শ দেন ব্যবসায়ীরা।

তেল-গ্যাস অনুসন্ধানকারী বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় সংস্থার নাম বাপেক্স। যেমন মালয়েশিয়ার পেট্রোনাস বা ভারতের ওএনজিসি। বিদেশি এ দুটো সংস্থা শুধু নিজের দেশেই নয়, বিদেশেও তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে কাজ করছে; অর্জন করছে বৈদেশিক মুদ্রাও। এদিকে, আমাদের বাপেক্সকে এক প্রকার অলস বসিয়ে রাখা হয়েছে। তাদের হাতে বর্তমানে তেমন কাজ নেই। বিদেশে কাজ করার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাও নেই। বাংলাদেশে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে কয়েকটি বিদেশি কোম্পানিকে কাজ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নানা কারণে তারাও সক্রিয় নয়। ফলে বিদেশ থেকে এখন অতিরিক্ত দামে তরলীকৃত ন্যাচারাল গ্যাস বা এলএনজি আমদানি করে চাহিদা পূরণ করতে হচ্ছে।

বিশ্নেষকরা বলছেন, বিদ্যুৎ খাতে সরকার অনেক সক্রিয় হলেও তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে তেমন সক্রিয় নয়। গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম জোরদার করা না হলে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। দীর্ঘকাল আমদানি গ্যাসের ওপর নির্ভর থাকা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

বঙ্গোপসাগরে সীমানা নিষ্পত্তি হওয়ার পর বর্তমানে বাংলাদেশ প্রান্তে মোট চারটি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ চলছে অত্যন্ত ঢিমেতালে। সাগরে কোথায়, কী পরিমাণ তেল-গ্যাসপ্রাপ্তির সম্ভাবনা আছে, সে বিষয়ে গ্রহণযোগ্য জরিপতথ্য বাংলাদেশের হাতে নেই। ফলে বিদেশি কোম্পানিগুলোও এখানে কাজ করতে তেমন আগ্রহী নয়। বিশ্নেষকরা বলছেন, এরপরও সাগরে যদি কোথাও কোনো গ্যাসাধারের সন্ধান মেলে, সেখানে কূপ খনন করে নিশ্চিত হতে হবে যে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস বা তেল আছে। সেই গ্যাস বা তেল সমতলে আনতে পাইপলাইনের ব্যবস্থা করতে হবে। এটা যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এমনকি পাইপলাইনে গ্যাস আনা সম্ভব না হলে এলএনজিতে রূপান্তর করে জাহাজে করেও আনতে হতে পারে। এটা অনেক সময়ের ব্যাপার।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বহু আগেই সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি ছিল। সাগরে তেল-গ্যাসপ্রাপ্তির সম্ভাবনা উজ্জ্বল। কারণ পাশের দেশগুলো যেহেতু পেয়েছে, সেহেতু আমরাও পাব। এ বিষয়ে সরকারকে অবশ্যই অধিক নজর দিতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, পৃথিবীর বদ্বীপ দেশগুলো তেল-গ্যাসসমৃদ্ধ। তেমনি বাংলাদেশে এখনও অনেক গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরে সম্ভাবনা ব্যাপক। সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বড় বাধা ছিল সীমানা সমস্যা। সে সমস্যা সমাধান হয়েছে মিয়ানমারের সঙ্গে ২০১২ ও ভারতের সঙ্গে ২০১৪ সালে। মিয়ানমার তাদের প্রান্তে গ্যাস আবিস্কার করে সেই গ্যাস তুলে বিদেশে রপ্তানি করছে। ভারতও তাদের সীমানায় সাগরে গ্যাস আবিস্কার করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনও সাগরে জোরেশোরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানকাজই শুরু করতে পারেনি।

গত বছরের জুনে গ্যাসের দাম এক লাফে ৩২ শতাংশ বাড়ানো হয়। এখন ফের বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। কয়েক মাসের মধ্যেই বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়েও কোনো উপায় নেই। কারণ, এত ভর্তুকি দেওয়ার সক্ষমতাও সরকারের নেই। চলতি বাজেটে রাজস্ব আহরণের যে টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জন করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন ওই বিভাগের কর্মকর্তারা। ফলে তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের দাম ক্রমান্বয়ে বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে অনেকেই মনে করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর ইউএসজিএস ২০০১ সালে বলেছিল, বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশ সীমানায় অন্তত ৮ টিসিএফ উত্তোলনযোগ্য গ্যাস থাকতে পারে। ২০০৪ সালে মার্কিন তেল-গ্যাস কোম্পানি ইউনিকল একটি জরিপ করে বলেছিল, দক্ষিণের জেলা ভোলায় কমবেশি ৪ টিসিএফ গ্যাস থাকতে পারে। ফলে শুধু সাগর ও ভোলাতেই মোট ১১ টিসিএফ গ্যাসপ্রাপ্তির সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া বর্তমানে আবিস্কৃত যে ক্ষেত্রগুলো আছে, সেখানে উত্তোলনযোগ্য মজুদ রয়েছে এখনও ৮ টিসিএফ। দেশে বর্তমানে প্রতিবছর গ্যাসের চাহিদা হলো গড়ে ১ টিসিএফ। অর্থাৎ এ হিসাবেই দেশে মোট ২০ বছরের চাহিদা পূরণ করার মতো গ্যাস আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুসন্ধানকাজ যদি জোরদার থাকত, তাহলে এসব তেল-গ্যাস আবিস্কার করা সম্ভব হতো। এই বিপুল পরিমাণ গ্যাস উত্তোলন করতে পারলে অতি উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি করার প্রয়োজন হতো না। পরবর্তী ১০ বছরে এলএনজি আমদানিতে যে কয়েক লাখ কোটি টাকা খরচ হবে, সেটাও হতো না।

মালয়েশিয়ার পেট্রোনাস ও ভারতের ওএনজিসি কয়েক দশকে ব্যাপক সক্ষমতা অর্জন করেছে। শুধু নিজের দেশই নয়, তারা বিদেশে গিয়ে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও তোলার কাজ করছে। সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের সক্ষমতাও অর্জন করেছে এ দুই কোম্পানি। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি বাপেক্স সেই সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। কারণ, এখানে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্বলতা ছিল। বাপেক্স সাগরের বাইরে সমতলভূমিতে মাটির নিচে গ্যাস অনুসন্ধান ও তুলতে ব্যাপক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। কিন্তু সমুদ্রে অনুসন্ধান বা উত্তোলনের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা নেই।

আরও পড়ুন

×