আগুনের ওপর বসে আছি: বাণিজ্যমন্ত্রী
বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি- ফাইল ছবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২০ | ১০:০১
লোকজন তার পদত্যাগ চাচ্ছে জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, 'আমি আগুনের ওপর বসে আছি।'
আসন্ন রমজান মাসকে সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মজুদ, সরবরাহ, আমদানি, মূল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক এবং স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বড় বড় ব্যবসায়ী গ্রুপের প্রতিনিধি, আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ী এবং সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার প্রতিনিধিরা সভায় উপস্থিত ছিলেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, রমজানে চাহিদা বাড়ে- এমন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার সব ধরনের সহযোগিতা করবে। ভোজ্যতেল, ছোলা, পেঁয়াজ, রসুন আদাসহ সব ধরনের মসলা, খেজুরসহ সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা, উৎপাদন ও আমদানি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় মজুদ সৃষ্টি করা হবে। তবে ব্যবসায়ীদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। মুনাফা যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে হবে।
বৈঠকে পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মাওলা বলেন, পেঁয়াজের যে সংকট হয়েছে সেক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের ওপর সরকারের বিভিন্ন সংস্থার জরিমানা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা অনেকখানি দায়ী। অনেক ব্যবসায়ী আতঙ্কে হাত গুটিয়ে নিয়েছিলেন। আগামীতে পেঁয়াজের বাজার ঠিক রাখতে তিনি কমপক্ষে চার মাস ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রাখার প্রস্তাব করেন। তিনি বলেন, ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি শুরু করলে মিসর, তুরস্ক থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ নিয়ে ব্যবসায়ীরা সমস্যায় পড়বেন।
গোলাম মাওলার এ বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বাণিজ্যমন্ত্রী তার কাছে জানতে চান- ভারত ২৯ সেপ্টেম্বর পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার ১২ ঘণ্টা পর ৩০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম কেন দ্বিগুণ হল। টিপু মুনশি বলেন, 'আমি ব্যবসায়ী বলে সবাই বলছে, আমি আপনাদের (ব্যবসায়ীদের) পক্ষ নিচ্ছি। আমার পদত্যাগ চাচ্ছে লোকজন। আমি আগুনের ওপর বসে আছি।'
তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা অবশ্যই লাভ করবে। তবে তা যৌক্তিক হতে হবে। একই বাজারে একই পেঁয়াজ কেউ ২২০ টাকা কেজি দরে, আবার কেউ ১৬০ টাকা দরে বিক্রি করেছে। এভাবে চলতে পারে না। এ জন্য সরকার অনেক ক্ষেত্রে বাধ্য হয়েছে।'
ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্য বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, রোজার মাসে যেন সবাই যৌক্তিক লাভ করে। বাজার কী আছে এটা এক ঘণ্টার মধ্যে বের করা যেতে পারে। ফলে গ্রাহকদের ব্যাপকভাবে ঠকালে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান চালাবে। রমজান মাসে ২ লাখ টন অতিরিক্ত পেঁয়াজ প্রয়োজন হয়। এই অতিরিক্ত চাহিদার পেঁয়াজ বিশেষ ব্যবস্থায় আমদানি করা হবে। ভারত যদি রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় তাহলে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হতে পারে। সেটা সরকার পুষিয়ে দেবে।
ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, 'রাতারাতি বড়লোক হওয়ার চেষ্টা করবেন না। রাতারাতি ভাগ্য পরিবর্তন করা যাবে না।'
শ্যামবাজারের পেঁয়াজ ব্যবসায়ী হাজী মো. মাজেদ বলেন, ভবিষ্যতে আবারও সর্তক হবার প্রয়োজন আছে। গত এক সপ্তাহে পেঁয়াজের ঘাটতির জন্য দাম বেড়ে গেছে। বৃষ্টি হলেই পেঁয়াজ নিয়ে বেশি সমস্যা তৈরি হয়। ডাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শফি মাহমুদ বলে, ছোলা নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। তবে রমজানের সময় কিছু অহেতুক খরচ তৈরি হয়, তা বন্ধ করতে হবে সরকারকে।
বৈঠকে তোফায়েল আহমেদ জানান, রমজানে পেয়াজের সরবরাহ ঠিক রাখতে আগামী ৩১ মার্চের আগেই টিসিবি ৫০ হাজার টন এবং সিটি গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ ও এস আলম গ্রুপ দেড় লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করবে।
তিনি বলেন, এর আগে বড় বড় শিল্পগ্রুপ পেঁয়াজের সংকট মোকাবেলায় সরকারকে সহযোগিতা করেছে। এখন তারা আমদানি করে নিজেরাই বিক্রি করবে। পাশাপাশি পেঁয়াজের নিয়মিত ব্যবসায়ীদের পেঁয়াজ আমদানি অব্যাহত থাকবে। বাজারে গুজব রটিয়ে কেউ যাতে আতঙ্ক ছড়াতে না পারে সে বিষয়ে সজাগ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
তোফায়েল আহমেদ বলেন, ধড়-পাকড় বা কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে পণ্যমূল্য স্বাভাবিক রাখা যাবে না। ব্যবসায়ীদের আপন করে নিতে হবে। আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বারবার সভা করতে হবে।
পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে পণ্যমূল্য নির্ধারণ করে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও এ সময় উল্লেখ করেন সাবেক এই বাণিজ্যমন্ত্রী।
সভায় বাণিজ্য সচিব ড. মো. জাফর উদ্দিন, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারপারসন মফিজুল ইসলাম, ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান তপন কান্তি ঘোষ, টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহাঙ্গীর, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক বাবলু কুমার সাহা, মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
