নকশিশিল্পে দিন বদল
--
প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ০৫:০৩
চিরায়ত বাংলার ঐতিহ্যের অন্যতম অনুষঙ্গ নকশিকাঁথা। সুঁই-সুতোর নিখুঁত গাঁথুনিতে কাপড়ে ফুটে ওঠে দৃষ্টিনন্দন নকশা। গ্রামীণ নারীদের অবসর যাপনের কাজ হিসেবে বিবেচিত হলেও নকশিকাঁথা বা নকশিশিল্পের চাহিদা বর্তমানে আকাশচুম্বী। এ শিল্পকে কেন্দ্র করে জামালপুর জেলায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন কয়েক হাজার নারী। সরেজমিন সেখান থেকে ঘুরে এসে জানাচ্ছেন সিরাজুল ইসলাম আবেদ
সুঁই-সুতায় জীবনের সুখ-দুঃখের ছবি আঁকা বাংলার নারীর অনেক পুরোনো অভ্যেস। সংসারের সব কাজের শেষে, কাপড়ের ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলা সে ছবির নাম নকশিকাঁথা। সংসারের প্রয়োজনে প্রায় সারাদেশেই এর প্রচলন থাকলেও কোনো কোনো জায়গার নারীরা একে দেন অনিন্দ্য শিল্পরূপ। জামালপুর ঠিক তেমনই একটি জেলা। সময়ের পরিবর্তন, প্রয়োজন ও উদ্ভাবনে নকশিকাঁথার সেই নকশা স্থান করে নিয়েছে শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, শাল, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, টি-শার্ট, শাড়ির পাড়, ওড়না, মাথার ব্যান্ড, মোবাইল ব্যাগ, পার্স, কলমদানি, স্কার্ট, টিভি কভার, জায়নামাজ, দস্তরখানা, মোড়ার কভার, টেবিল কভার, টিস্যু পেপার ডেস্ক, ফুলদানি কভার, ফ্লোর কুশন, ডেস্ক ক্যালেন্ডার, ডায়েরি কভার, অলংকার বক্স, ছাইদানি, শপিং ব্যাগ, ভ্যানিটি ব্যাগ, গিফট বক্স, স্কুলব্যাগ, বুকশেল্কম্ফ, ড্রেসিং টেবিল, কম্পিউটার কভারসহ অর্ধশতাধিক ব্যবহারিক সামগ্রীতে। সম্প্র্রতি করোনাকালে অতি প্রয়োজনীয় মাস্কেও শোভা পাচ্ছে নকশিকাঁথার সেলাই। এই নকশিকাঁথা আর তার নকশাকে পুঁজি করে জেলায় গড়ে উঠেছে সাড়ে পাঁচ হাজার উদ্যোক্তা, যার ৯৫ ভাগই নারী। এই উদ্যোক্তাদের সঙ্গে যুক্ত প্রায় আড়াই লাখ নারী শুধু নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাননি, এখন স্বপ্ন দেখাচ্ছেন 'দরিদ্র জেলা' হিসেবে পরিচিতি পাওয়া জামালপুরের অর্থনীতির চাকা উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার।
বন্যা, নদীভাঙনসহ নানা দুর্যোগের আঘাতে জামালপুরের অসংখ্য মানুষ বিপর্যস্ত হয় প্রতিবছর। প্রকৃতির সঙ্গে নিরন্তর লড়াই করা মানুষগুলো পরনির্ভরশীলতার বিপরীতে শুরু করে নতুন এক মুক্তির সংগ্রাম। প্রকাশ পায় নিজেকে সয়ম্ভর করার অদম্য সাহস। ভাগ্যবঞ্চনার শিকার নারীরা নিজেদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে সুঁই-সুতার শৈল্পিক বুননে উদ্ভাসিত করে তুলেছেন নিজেদের আঙিনার পাশাপাশি জামালপুরের মুখ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৮ সালের জরিপে জামালপুর ছিল দেশের সবচেয়ে দরিদ্র ১০ জেলার মধ্যে তৃতীয় স্থানে। ২০২১ সালে এসে দরিদ্রতম দশে আর এ জেলার নাম নেই। এখন তারা গর্ব করে বলেন- 'জামালপুরের নকশিকাঁথা, বাংলাদেশের গর্বগাথা।' এটিই এখন জেলার ব্র্যান্ডিং স্লোগান।
এলাকার সংগ্রামী মানুষ মার খেতে খেতে নিজেদের ঐতিহ্য নিয়েই নতুন জীবনের সন্ধানে ঘুরে দাঁড়ায়। শুরুটা ১৯৮২ সালের দিকে। বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক 'আয়েশা আবেদ ফাউন্ডেশন'-এর মাধ্যমে শত বছরের ঐতিহ্য সূচিশিল্পকে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্য নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে হস্তশিল্প বা নকশিকাঁথা সেলাই কার্যক্রম শুরু করে। উদ্যোগ নেয় প্রশিক্ষণের। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৮ সাল থেকে জামালপুরের বৃহত্তর বেসরকারি সংস্থা উন্নয়ন সংঘ উপকারভোগী দরিদ্র জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারীদের কর্মসংস্থান ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ব্যাপক ভিত্তিতে এই শিল্পকর্ম শুরু করে। গড়ে ওঠে কারুনিলয়, দীপ্ত কুটির, শতদল, রংধনুসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। যারা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে জামালপুরের নকশিকাঁথাকে পৌঁছে দিচ্ছে বিদেশের বাজারে। এখন হাজারো নারী উদ্যোক্তার পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে জামালপুরের সমগ্র অঙ্গন।
স্থানীয় উন্নয়ন কর্মী ও গবেষক জাহিদ সেলিম জানালেন, জামালপুরের নজরকাড়া নকশিকাঁথা আজ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বেও দারুণভাবে সমাদৃত হচ্ছে। তবে নানা প্রতিকূলতার কারণে এই শিল্পটিকে সমৃদ্ধ এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপে দাঁড় করানো সম্ভব হচ্ছিল না। সেই কাজটি সহজ করে দেন এই জনপদের কৃতী সন্তান বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান। তার পৃষ্ঠপোষকতায় ন্যাশনাল ব্যাংক সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করে। এখন অনেক ব্যাংকই এগিয়ে এসেছে। উদ্যোক্তারা সহজ শর্তে নিয়মিত ঋণ পাচ্ছেন এবং পরিশোধও করছেন। 
আয়েশা আবেদ ফাউন্ডেশন, শতদল, রংধনু, জীবিকা, দীপ্ত কুটির, কারুনিলয়, কারুকলা, কারুপণ্য, প্রত্যয় ক্রাফট, ঝিনুক, আশ্রম, কারুনীড়, সৃষ্টি হস্তশিল্প, সৃষ্টি নকশাশিল্প, উত্তরণ, মীম, নিপুণ, অয়নসহ দুই হাজারের বেশি ছোট-বড় প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। আবার ব্যক্তি উদ্যোগেও অনেকেই এই কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই সমাজসেবা অথবা মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধিত। অনেকেই আবার এনজিও-বিষয়ক ব্যুরোর নিবন্ধন করিয়েছে।
করোনার সময় বিভিন্ন সেক্টরে হতাশার কথা শোনা গেলেও জামালপুরের উদ্যোক্তরা শোনালেন ভিন্ন গল্প। নকশা বুটিকের শিলা আহমেদ বলেন, করোনার সময় অনলাইন ব্যবসা তাদের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। আগে বিভিন্ন জায়গায় বাকিতে পণ্য দিতে হতো, অনেক সময় টাকা খোয়াও যেত কিন্তু এখন প্রায় প্রত্যেকেই অনলাইনে সরাসরি ব্যবসা করছি। সজীব হস্তশিল্পের বিলকিস বেগম বলেন, ২০০০ সালে মাত্র তিন হাজার টাকা পুঁজিতে ব্যবসা শুরু করি। বিভিন্ন জায়গায় মাল নিয়ে নিজেকেই যেতে হতো। তিনবার ডাকাত ধরেছে, অনেকে মাল নিয়ে টাকা মেরে দিয়েছে, এখন আর সেই সমস্য নেই।
সঠিক পরিকল্পনা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সাংগঠনিক শক্তির বিকাশ এবং আধুনিক ডিজাইনসহ তথ্যপ্রযুক্তির সমাহার ঘটাতে পারলে বিশেষ করে ই-কমার্সের আওতায় নিয়ে আসতে পারলে জামালপুরে নকশিকাঁথা শিল্পে অভাবনীয় সাফল্য আসবে বলে মত ব্যক্ত করেন জামালপুর পৌরসভার মেয়র ও উদ্যোক্তা ছানোয়ার হোসেন ছানু। তিনি বলেন, আমাদের নকশিকাঁথা শিল্প বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। তার জন্য প্রয়োজন কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ। ইন্টারনেটের মাধ্যমে বাজার খুঁজে বের করা এবং বায়ারদের আকৃষ্ট করা। বিজনেস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, সরাসরি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এগিয়ে আসা। এ লক্ষ্য পূরণে কাজ শুরু হয়েছে 'শেখ হাসিনা নকশিপল্লি'র। সরকার ২৯৪ একর এলাকায় গড়ে তুলছে এই পল্লি; যা আগামী দিনে বদলে দেবে জামালপুরের অর্থনীতি, এমনটাই মনে করেন সংশ্নিষ্টরা।
- বিষয় :
- নকশিশিল্প
- নকশিকাঁথা
- শেখ হাসিনা নকশিপল্লি
