চীনকে অবিলম্বে পক্ষে আনতে হবে
আহমদ রফিক
প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৩:৪৪
'যাহা আশঙ্কা করা গিয়াছিল, অবশেষে তাহাই ঘটিল।' আমরা একাধিক লেখায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সমস্যার সমাধান সম্পর্কে বারবার বলে এসেছি, এর চাবিকাঠি চীনের হাতে। তাদের মৌখিক আশ্বাসের ওপর নির্ভর করা ঠিক হবে না, যতক্ষণ তাদের পক্ষে কোনো কার্যকর, ফলপ্রসূ পদক্ষেপ না নেওয়া হয়। চীনকে ওই পর্যায়ে তৎপর করাতে হবে।
হেগ আন্তর্জাতিক আদালতের রায় প্রকাশের পরও আমাদের বক্তব্য ছিল, এ রায়ে বাংলাদেশের আত্মতৃপ্তির সুযোগ নেই; যতক্ষণ না জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এ বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেয়। চীনের সম্ভাব্য বিরোধিতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল। আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন ইস্যুটি ঝুলে থাকার সম্ভাবনা নিয়ে।
এবার (৬.২.২০২০) একটি দৈনিকে ছোট খবর- 'রোহিঙ্গা ইস্যুতে ফের চীনের বাধা', 'মিয়ানমারের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ নিরাপত্তা পরিষদ'। এ সম্বন্ধে প্রতিবেদনে প্রকাশ :'রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন ও ভিয়েতনামের আপত্তির কারণে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নিতে আবারও ব্যর্থ হয়েছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ।'
অনুমান করা গিয়েছিল যে, আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারকদের রোহিঙ্গা গণহত্যা ইস্যুতে ঘোষিত রায় সম্পর্কে নিরাপত্তা পরিষদ বৈঠকে বসতে পারে এ সম্বন্ধে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে। ঠিকই তারা বৈঠকে বসে এবং এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনাও হয়। কিন্তু পরিষদের স্থায়ী সদস্য চীন এবং অস্থায়ী সদস্য ভিয়েতনামের বিরোধিতার কারণে এ সম্বন্ধে কোনো যৌথ বিবৃতি প্রকাশের ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি পরিষদ।
কাজেই ওই রায় কার্যকর হওয়া এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে অগ্রগতির বিষয়টি ঝুলেই থাকল। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শেষে প্রকাশিত বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক আদালতের রায় মেনে চলার জন্য মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। সংশ্নিষ্ট দেশগুলো হচ্ছে- ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়াম ও এস্তোনিয়া। এরা সবাই নিরাপত্তা পরিষদে বর্তমান সদস্য। এদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে নিরাপত্তা পরিষদের সাবেক সদস্য পোল্যান্ড।
কিন্তু মিয়ানমারের পক্ষে চীনের গৃহীত অনড় ভূমিকার কারণে নিরাপত্তা পরিষদ রোহিঙ্গা ইস্যুতে যুক্তিসঙ্গত ও ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলো। এ ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বলিষ্ঠ সরব ভূমিকাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
মিয়ানমার মূল জাতিসত্তা বাদে একাধিক ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু জাতিসত্তার দেশ। তাদের কারও কারও সঙ্গেও মিয়ানমারের সামরিক জান্তার, এমনকি বর্তমান মিশ্র চরিত্রের শাসকশ্রেণির সংঘাত চলছে। চলছে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা কারেন, কাচিন প্রভৃতি জাতির সঙ্গে। ফলে অবাঞ্ছিত সহিংসতার প্রকাশ এবং জন্ম নিচ্ছে প্রতিবাদী ছোট ছোট সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী; বিশেষ করে রাখাইন, কাচিন, শান প্রভৃতি রাজ্যে।
তবে সাগর-তীরবর্তী রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর যে সহিংস অভিযান চালানো হয়েছে, তা বর্বর গণহত্যার চরিত্রের- নর-নারী, শিশু হত্যা এবং অবাধ নারী ধর্ষণে। ফলে পর্যায়ক্রমে গণহত্যার চাপে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের নদীপথে চট্টগ্রাম সীমান্তে আশ্রয় গ্রহণ শরণার্থী হিসেবে- সংখ্যাটি এখন ১০ থেকে ১১ লাখের মতো, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক-সামাজিক সমস্যা তৈরি করে চলেছে। স্বভাবতই এ অমানবিক সমস্যার মানবিক সমাধান জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইতোপূর্বে চীন বাংলাদেশকে আশ্বাস দিয়েছিল যে, তারা এ সমস্যার সমাধানে তথা রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে সহযোগিতা-সহায়তা করবে। কিন্তু বর্তমানে বাস্তব বিচারে তাদের সম্পূর্ণ ভিন্ন ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে চীনা পণ্যের ব্যাপক বাজার, গুরুত্বপূর্ণ চীনা বিনিয়োগ ইত্যাদি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিত বিচারে বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনের সঙ্গে নতুন করে কূটনৈতিক-রাজনৈতিক আলোচনা শুরু করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দুই.
ইতোমধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইতালি সফর। এই সফরের বিশেষ গুরুত্ব রোহিঙ্গা ইস্যুতে ইতালীয় প্রধানমন্ত্রী জিউসেপ কোঁতের সহযোগিতার আশ্বাস। শুধু আশ্বাসই নয়, রোহিঙ্গাদের জন্য ইতালির বর্তমান সহযোগিতার অতিরিক্ত আরও ১০ লাখ ইউরো দানের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা ও সম্পর্ক জোরদার করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৯৭১-এ পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সূচিত গণহত্যার প্রতিক্রিয়ায় যে বিপুল সংখ্যক শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল, সে বিষয় এবং গোটা সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্য নিয়ে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বিশ্ব সফর তথা মূলত ইউরোপ-আমেরিকা সফরে বেরিয়ে ছিলেন। তার লক্ষ্য ছিল- ব্রিটেন, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্রসহ শক্তিমান দেশগুলোর অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক সমর্থন আদায়।
সমর্থন যেমন শরণার্থীদের বিষয়ক সমস্যা নিয়ে, ততোধিক ঘটনার রাজনৈতিক দিক নিয়ে। আমাদের বর্তমান সমস্যা রোহিঙ্গা ইস্যু মূলত রাজনৈতিক, অংশত অর্থনৈতিক চরিত্রের। আর সে সমস্যা হলো, ইউরোপ-আমেরিকার মানবিক সমর্থনসহ এশিয়ায় ভারত ও চীনের মতো মিত্র দেশগুলোর আন্তরিক সমর্থন; যাতে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা তাদের স্বদেশে অর্থাৎ রাখাইন রাজ্যে পূর্ণ নিরাপত্তায় ফিরে যেতে পারে।
নিরাপত্তা পরিষদের এ মুহূর্তে রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনের ভূমিকার পরিপ্রেক্ষিতে আমার মনে হয়, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর জন্য অনুরূপ একটি বিশ্ব সফরের কর্মসূচি জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে; বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রোহিঙ্গা ইস্যুতে কার্যকর সমর্থন আদায়, সেই সঙ্গে চীনকে প্রভাবিত করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর পরিপ্রেক্ষিতে। মিত্র দেশ, প্রতিবেশী দেশ ভারতকে এ ব্যাপারে সক্রিয় করে তোলা অনুরূপ গুরুত্ব বহন করে।
আন্তর্জাতিক মহল, বিশেষ করে পরাশক্তির কূটনৈতিক চাপ ছাড়া চীন সহজে মিয়ানমারকে কিছু বলবে বলে মনে হয় না। কারণ মিয়ানমারে চীনের গভীর স্বার্থ রয়েছে, বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যের সমুদ্র সীমান্ত কেন্দ্র করেও। সম্ভবত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, পুনর্বাসন সে ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তা না হলে রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফেরত যাওয়ার ক্ষেত্রে চীনের এত বিরোধিতা কেন, এর অর্থই-বা কী?
তাই কাজটা যে সহজ-সরল নয়, তা বলাই বাহুল্য। তাদের উদ্দেশ্য, নানা অজুহাতে সমস্যাটিকে জিইয়ে রাখা এবং কালক্ষেপণ। সময় যত গড়াবে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা ততই কঠিন হতে থাকবে। সময় এ ক্ষেত্রে একটি বড় ফ্যাক্টর। পরে একসময় এমন অবস্থার সৃষ্টি হবে যে, রোহিঙ্গারাই হয়তো নিরাপত্তার অজুহাত তুলে নিজ বাসভূমে ফিরে যেতে চাইবে না। বাংলাদেশের জন্য তৈরি করবে এক আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক সংকট।
তাই এ সমস্যার দ্রুত সমাধানও একটি জরুরি দিক, যা আমাদের সরকারকে গুরুত্বপূর্ণ দ্রুত সমাধানযোগ্য সমস্যা হিসেবে ধরে নিয়ে বিচক্ষণ পদক্ষেপে এগিয়ে যেতে হবে। তা না হলে এ সমস্যার জট কাটবে না। আর একটি বিষয় মনে রাখা দরকার যে, রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প বিহারি জনঅধ্যুষিত জেনেভা ক্যাম্প নয়।
এ সমস্যাটির চরিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং তা বহুমাত্রিক। এর সঙ্গে অতীত আরাকানি ইতিহাসও জড়িত। তাছাড়া রোহিঙ্গাদের প্রকৃতি ও সাম্প্রতিক আচরণ সামাজিক-রাজনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশের অনুকূল নয়। কাজেই এ ক্ষেত্রে ধীর পায়ে চলা আত্মঘাতী চলার শামিল হবে- এ রাজনৈতিক চিন্তা বাংলাদেশ সরকারকে মাথায় রেখে দ্রুত চলার কর্মসূচি প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়নে সক্রিয় হতে হবে। দ্বিতীয় কোনো পথ বাংলাদেশের জন্য খোলা আছে বলে মনে হয় না।
প্রসঙ্গত হেগের আন্তর্জাতিক আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে অং সান সু চির রোহিঙ্গা, আরাকান রাজ্য ও চট্টগ্রামবিষয়ক কিছু তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য নিশ্চয়ই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও কূটনৈতিক মহল লক্ষ্য করেছে, যা উদ্দেশ্যমূলকই নয় শুধু, রাজনৈতিক-কূটনৈতিক বিচারে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী। এতে করে মিয়ানমারের অন্তর্নিহিত মূল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এ কথা প্রমাণ করা যে, রোহিঙ্গারা মূলত অতীত বিচারে চট্টগ্রাম-অঞ্চলবাসী। কাজেই তাদের মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। সু চির কৌশলী ভাষণে নিহিত এ বক্তব্যটি খুব অস্পষ্ট নয়। কাজেই বাংলাদেশকে সাবধানী পদক্ষেপে এগিয়ে যেতে হবে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে।
ভাষাসংগ্রামী, কবি, প্রাবন্ধিক, রবীন্দ্র গবেষক
- বিষয় :
- রোহিঙ্গা ইস্যু
- আহমদ রফিক
