ঢাকা রোববার, ২৮ জুন ২০২৬

কর্তৃত্ববাদ ও আধিপত্যের ভেতরে

কর্তৃত্ববাদ ও আধিপত্যের ভেতরে
×

আনু মুহাম্মদ

প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৪:০৮

এবারের বইমেলায় 'কর্তৃত্ববাদ, আধিপত্য ও মুক্তির দিশা :বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা' শিরোনামে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এখানে গ্রন্থিত হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের এমন সব বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ, যা বাংলাদেশের পাঠকের জন্য অত্যন্ত জরুরি হলেও সুলভ নয়। খুবই সীমিত পরিসর ছাড়া এসব বিষয় আলোচিতও নয়। প্রাবন্ধিক, গবেষক, প্রকৌশলী কল্লোল মোস্তফা সংগৃহীত-অনূদিত খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ সংকলন এ গ্রন্থ। কল্লোল বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে বিশেষজ্ঞদের লেখা এসব প্রবন্ধ-অধ্যায় সংগ্রহ করেছেন। কোনোটি অনুবাদ করেছেন, কোনোটি ভাবানুবাদ করেছেন; কোনোটির ভিত্তিতে লেখা তৈরি করেছেন।

পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার কেন্দ্রীয় অর্থনীতি হলেও মার্কিন অর্থনীতি তার অন্তর্নিহিত সংকটে পতিত হচ্ছে বারবার। সংকট উত্তরণের চেষ্টায় যুদ্ধ অর্থনীতির বিস্তার, দেশে দেশে সামরিক আগ্রাসন, দেশের ভেতর জনগণের বঞ্চনা বাড়িয়ে বৃহৎ পুঁজিকে স্টম্ফীত করার বহু রকম উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসবের কারণে দেশের ভেতর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে, সমাজে অস্থিরতা-অনিশ্চয়তা বেড়েছে। বর্ণবাদ-জাতিবিদ্বেষ-সহিংসতায় আরও বেশি আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। পুঁজিবাদ উত্তরোত্তর সিজোফ্রেনিক ব্যবস্থায় পরিণত হচ্ছে। এ রকম পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন শিল্পোন্নত দেশে, অকুপাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রধানত তরুণদের বিশাল গণজাগরণ এই সমাজ পরিবর্তনের জোর আওয়াজ তুলেছিল। এই আন্দোলন নিঃসন্দেহে মার্কিন মূলধারার রাজনীতির ওপরেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রেখেছে। কয়েকটি প্রবন্ধে এ বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছে।

প্রযুক্তির বিকাশ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, চতুর্থ বিশ্ববিপ্লব নিয়ে বিশ্বজুড়ে একদিকে উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে আতঙ্ক আছে। বর্তমান বিশ্বে কাজ, পুঁজির কৌশল এবং শ্রমিক শ্রেণির গঠন নিয়ে কল্লোল যে তিনটি বিশেষজ্ঞ প্রবন্ধ আমাদের সামনে উপস্থিত করেছেন, তা থেকে বিষয়গুলো অনেকখানি পরিস্কার। প্রবন্ধগুলো হলো :'কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নকল শ্রমিক ও আমাদের ভবিষ্যৎ', 'দ্য নিউ রিজার্ভ আর্মি :আউটসোর্সড ও অস্থায়ী কর্মী', 'অনানুষ্ঠানিক শ্রমের মিথ ও বাস্তবতা'। লুটেরা পুঁজি ও ব্যাংকিং খাত সম্পর্কে বাংলাদেশের মানুষের ভালোই ধারণা আছে। ফিলিপাইন অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে এর আরেকটি নমুনা দেখাবে।

'নির্বাচনী কর্তৃত্ববাদ' লেখাটি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের রাজনৈতিক শাসনের সাম্প্রতিক ধরন নিয়ে গবেষণার একটি অংশ। বাংলাদেশের একচেটিয়া কর্তৃত্ববাদ ধরনের তাত্ত্বিক বিশ্নেষণেও তা সহায়তা করবে। তবে এই প্রবন্ধ পাঠে এটা পরিস্কার হবে যে, বাংলাদেশের পরিস্থিতি তুলনায় আরও বেশি স্বৈরতন্ত্রী। এখানে নির্বাচন প্রতিষ্ঠান হিসেবেই বিলুপ্তির পথে।

এক সামরিক কর্মকর্তার স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে লিখিত আরেকটি প্রবন্ধ ভারতে বিচার-বহির্ভূত হত্যার ঘটনাবলির বর্ণনার মধ্য দিয়ে যে ভয়ংকর চিত্র হাজির করে, তা বাংলাদেশের প্রায় প্রতিদিনের চিত্র। সন্ত্রাস আর অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নামে নিজেদের তালিকামতো মানুষদের ধরে ধরে খুন করার বিভিন্ন নাম আছে :এনকাউন্টার, ক্রসফায়ার তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে এগুলো চললেও ২০০২ থেকে ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় নিয়মিত ব্যবস্থা হিসেবে তার যাত্রা শুরু হয়। একেক সময় একেক কারণ দেখানো হয়। মাদক ব্যবসায়ীদের দমনের নামে চলছে হত্যাকাণ্ড। ফিলিপাইন, কলাম্বিয়াসহ আরও দেশে এই একই ধরনের 'দমন' হত্যাকাণ্ড চলছে বহুদিন। কল্লোল আরেকটি প্রবন্ধে হাজির করেছেন একই অজুহাতে পরিচালিত এসব হত্যাকাণ্ডের অভিযানে ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও কলাম্বিয়ার অভিজ্ঞতা। তা ছাড়া মাদকাসক্তি যে নিছক ব্যক্তিগত বিষয় নয়; তা বোঝার জন্য অন্য একটি গবেষণা প্রবন্ধ গুরুত্বপূর্ণ।

জনগণকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে, কোম্পানি কর্মকর্তাদের দায়মুক্তি দিয়ে, রাশিয়ার বিপুল ঋণ নিয়ে তাদেরই প্রকল্পে বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। তা সরকার প্রচার করছে 'জাতীয় গৌরব' হিসেবে। এই প্রকল্পের ব্যবস্থাপনায় এখন 'দক্ষ ও অভিজ্ঞ' হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে ভারতকে। সেই ভারতের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বিষয়ে ভারতেরই বিশেষজ্ঞদের লেখা এই গ্রন্থভুক্ত হয়েছে, যা এ বিষয়ে আমাদের শিক্ষিত সমাজের পাহাড়প্রমাণ অজ্ঞতা আর নির্বোধের উচ্ছ্বাস দূর করতে সাহায্য করতে পারে। সুপার পাওয়ার হওয়ার আওয়াজ দিয়ে ভারতের শাসকরা যখন দুমদাম শানশওকত বাড়াচ্ছে, তখন বিশ্বের অন্যতম দূষিত নগরী দিল্লির শ্রমজীবী নাগরিকরা কীভাবে জীবনযাপন করে, তার চিত্রটিও সেদেশের গবেষকের কাছ থেকে নিয়েছেন কল্লোল। 'শাইনিং ইন্ডিয়া'য় গার্মেন্টস শিল্পের চিত্র উঠে এসেছে আরেক ভারতীয় বিশেষজ্ঞের লেখায়।

ভারতের চাপের মধ্যে থেকেও নেপাল যে স্বাধীন সার্বভৌম সত্তার প্রকাশ ঘটিয়ে যাচ্ছে, তা বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় তো বটেই, লজ্জারও। সংবিধান প্রণয়ন, সুষ্ঠু নির্বাচন, অর্থনৈতিক নীতি এমনকি সীমান্ত হত্যা নিয়েও নেপালের স্বাধীন ভূমিকা তার প্রমাণ। এই পরিপ্রেক্ষিতে নেপাল নিয়ে লেখাটি তাদের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বুঝতে সহায়তা করবে।

এসবের বাইরে গ্রন্থভুক্ত কয়েকটি প্রবন্ধ জাতীয় সক্ষমতার শক্তি ও সম্ভাবনাও দেখায়। এর মধ্যে 'তেল-গ্যাস উত্তোলনে জাতীয় সক্ষমতা :নরওয়ের অভিজ্ঞতা', 'যেভাবে ঘুরে দাঁড়াল ভারতীয় রেলওয়ে' প্রবন্ধ দুটি বাংলাদেশের কমিশনভোগী শাসকগোষ্ঠীকে না হলেও নির্লিপ্ত শিক্ষিত সমাজকে কিছুটা আলো দেখাতে পারে। কিউবার বিষয়টি গুণগতভাবে ভিন্ন। বিপ্লবোত্তর এই সমাজ কীভাবে মার্কিনি অবরোধের হিংস্র আগ্রাসন মোকাবিলা করে বিশ্বের সবচেয়ে সফল টেকসই উন্নয়নের মডেলে পরিণত হয়েছে, তা বিদ্যমান উন্নয়নের চোখ দিয়ে বোঝা যাবে না। এই গ্রন্থের দুটি লেখা এ ক্ষেত্রে পাঠকদের কিউবার লড়াই ও সফলতা বুঝতে সহায়তা করবে। এগুলো হলো :'কিউবার কৃষি অর্থনীতি' এবং 'বিপ্লবী কিউবার চিকিৎসা ব্যবস্থা'।

জলবায়ু পরিবর্তন যে বিশ্ব রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক চিন্তাকে শুধু প্রভাবিত করছে, তাই নয়; এটি তৈরি করছে নতুন রাজনীতিও। এ বিষয়ে নাওমি কেইনের লেখাটিও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, বাংলাদেশের জনপন্থি রাজনীতির বিকাশও বিশ্বের এই নতুন রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত।

এ গ্রন্থের বিভিন্ন প্রবন্ধ বিশ্বের নানা প্রান্ত ধরে লেখা এবং তা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার স্বরূপ বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আর বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থার গতি-প্রকৃতি বুঝতে গেলে এসব বিষয়ে অনুসন্ধানী দৃষ্টি দরকার। কল্লোল মোস্তফা তার বিশ্নেষণী শক্তি আর অনুবাদের দক্ষতা দিয়ে লেখাগুলো বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য উপস্থিত করেছেন। বাকিটা পাঠকের হাতে। গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে সংহতি প্রকাশন।

অর্থনীতিবিদ; অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×