আজন্ম প্রতিবাদী শহীদ জোহা
সৈয়দ শামসুল আলম
প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৩:৫৭
প্রত্যেক দেশে কিছু ব্যক্তি থাকেন, যারা সমাজের দশজনের চেয়ে অনেক অগ্রসর। তাদের ত্যাগে দেশ ও জাতি হয় ঋণী। শহীদ ড. শামসুজ্জোহা এমনি একজন। ১৯৪৬ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে বাংলা, বিহার, বোম্বাই. মাদ্রাজ, পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশসহ অবিভক্ত ভারতের বিভিন্ন স্থানে। মানুষ জীবনের মায়ায় জন্মভূমি ত্যাগ করে নিরাপদ জায়গার সন্ধানে। শামসুজ্জোহাও ১৯৫০ সালে জন্মভূমি ত্যাগ করে সপরিবারে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাবনা জেলার উল্লাপাড়া থানার বড় পাঙ্গাসীতে চলে আসেন। সে বছরই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে স্নাতক প্রথম বর্ষে ভর্তি হন। সে সময়টি ছিল সংঘাতময়, বিক্ষুব্ধ ও উত্তেজনাপূর্ণ। উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ষড়যন্ত্র শুরু হয়। ১৯৪৮ সালে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ ঘোষণা দেন- উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। তার এ ঘোষণার পর প্রতিবাদে ফেটে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, বাঙালি বুদ্ধিজীবীসহ সর্বস্তরের মানুষ।
জোহা এ আন্দোলনে সলিমুল্লাহ্ মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র হিসেবে ছিলেন অগ্রগামী। ১৯৫২ সালের ৩০ জানুয়ারি ভাষার দাবিতে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়। সে বিক্ষোভ মিছিলেও জোহা ছিলেন সামনে। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় যে ছাত্র সমাবেশ হয়, সেখানে সক্রিয় উপস্থিতির জন্য পুলিশের লাঠিচার্জে অনেকের মতো জোহাও আহত হন। পুলিশের গুলিতে বরকত, সালাম, জব্বার, রফিক শহীদ হন। সে সময় যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত ছিল না। এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংবাদ দেওয়া, সংগঠিত করা ছিল খুবই কষ্টসাধ্য। এ অবস্থায় জোহার উদ্যোগে সংবাদ আদান-প্রদান কাজে তিন সদস্যবিশিষ্ট সাইকেল বাহিনী গড়ে ওঠে। তাদের কাজ ছিল দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের সংবাদ পৌঁছে দেওয়া ও আন্দোলন অব্যাহত রাখার জন্য সবার মনোবল অটুট রাখা।
১৯৫৪ সালে প্রথম শ্রেণিতে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন ড. শামসুজ্জোহা। ওই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে তিনি প্রভাষক পদে যোগদান করেন। ১৯৫৫ থেকে '৫৯ সাল পর্যন্ত লন্ডনের ইউনিভার্সিটি রয়েল কলেজ অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে বিএসসি অনার্স ও এআরসিএম খেতাব লাভ করেন। তিনি ১৯৬১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে প্রভাষক পদে যোগদান করেন। একই বছরের ১১ জুন নিলুফার বেগমের সঙ্গে জোহার বিয়ে হয়। ১৯৬৪ সালে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভের পর সহকারী অধ্যাপক পদে যোগদান করেন। ১৯৬৫ সালের প্রথমদিকে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পান। ১৯৬৮ সালের ১৫ এপ্রিল তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে একমাত্র ড. জোহাই পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। আর্থিক অনটন থাকলেও তিনি নীতির সঙ্গে কখনও আপস করেননি। আমৃত্যু তিনি ছিলেন নির্লোভ, দায়িত্বপরায়ণ শিক্ষক; আদর্শ পিতা, ভাই, স্বামী ও সন্তান।
১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের কথা আমরা সবাই জানি। আরও জানি, ১৯৬৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে ড. জোহার প্রতিজ্ঞার কথা- 'পুলিশ বা সেনাবাহিনীর গুলি আমার কোনো ছাত্রের গায়ে লাগার পূর্বে যেন আমার গায়ে লাগে।' পরদিন ১৮ ফেব্রুয়ারি একমাত্র কন্যা সাবিনা জোহার কচি হাত দুটি বাবা জোহার পথ আগলাতে পারেনি। দায়িত্বের কাছে হার মেনেছে স্ত্রী নিলুফার জোহার বাহুবন্ধন। বৃদ্ধ বাবা ও দুটি অন্ধ বোনও বাধা হয়নি প্রক্টরের দায়িত্ব পালনে। ড. শামসুজ্জোহা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের জীবনের নিরাপত্তা দিয়েছেন নিজের জীবন দিয়ে। আসুন, শহীদ ড. শামসুজ্জোহার জীবনদর্শন ও ত্যাগের কথা স্মরণ করি শ্রদ্ধার সঙ্গে।
লেখক
- বিষয় :
- সৈয়দ শামসুল আলম
