ঢাকা রোববার, ২৮ জুন ২০২৬

জলাশয় সুরক্ষাতেই মাছ সুরক্ষা

জলাশয় সুরক্ষাতেই মাছ সুরক্ষা
×

সন্‌জিৎ নারায়ণ চৌধুরী

প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৩:৫৭

আমরা মাছে-ভাতে বাঙালি। মাছ প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও ফসফরাস-সমৃদ্ধ হওয়ায় এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমিষের চাহিদা পূরণে খাদ্য তালিকায় প্রথমেই মাছের নাম চলে আসে। সে মাছ ছোটই হোক আর বড়ই হোক। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে মৎস্যসম্পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রাণিজ প্রোটিন চাহিদার ৬০ ভাগ পাওয়া যায় মাছ থেকে। সত্যিকার অর্থে আমিষ খাদ্যের পছন্দের প্রধান উৎস মাছ। একটা স্লোগানও আছে এ রকম- 'ধরিব মৎস্য খাইব সুখে'। সুখে খাওয়া বা থাকার জন্য যে মাছ ধরার কথা বলা হচ্ছে, বর্তমানে সে মাছ ধরার সুযোগ কতটুকুই-বা আছে বাঙালির।

বাংলাদেশে মিঠাপানির প্রাকৃতিক উৎস নদী-হাওর-খাল-বিল-হ্রদ ইত্যাদি জলাশয়ে রুই, কাতলা, মৃগেল, বাউশ, ইলিশ, বোয়াল, আইড়, গ্রাসকার্প, ঘাগলা, শোল, মহাশোল, চিতল, ফলি, পাবদা, কই, মাগুর, শিং, রানি, পুঁটি, চেলা, মলা, কাজুলি, বাতাসি ইত্যাদিসহ মোট ২৫১টি প্রজাতির মাছ রয়েছে বলা হলেও বেশিরভাগই এখন আর নেই। যথাযথ তদারকির অভাবে অনেক বৈচিত্র্যময় সুস্বাদু মাছ বিলুপ্ত হয়েছে। বছর কয়েক আগেও ছোট আকারের সুস্বাদু রানি মাছটি প্রকৃতি থেকে প্রায় হারিয়ে গিয়েছিল। মৎস্যবিজ্ঞানীদের অক্লান্ত চেষ্টায় রানি মাছটি প্রকৃতিতে এখন টিকে আছে। বৃহত্তর সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে ১৫ থেকে ২০ বছর আগে 'পিপলা' নামের যে সুস্বাদু মাছটি পাওয়া যেত, এখন এটি প্রায় বিলুপ্ত। পিপলার একটি আশ্চর্যজনক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটি রাতের বেলা ডাঙায় সরিষা ক্ষেতে সরিষা ফুল খেতে চলে আসে। ধারণা করা হয়, এতদঞ্চলে সরিষা আবাদ কমে যাওয়ায় এবং মাছ অতি আহরণই এর বিলুপ্তির প্রধান কারণ। এছাড়া নানদিনা, কাচনি, বাঁশপাতা, কোকসা, চ্যাঙ (টাকি নয়, টাকি ভিন্ন প্রজাতি), গুলিয়া টেংরা, কাশ খয়রা ইত্যাদিও বিলুপ্তির পথে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, যে টাকি মাছ সারাদেশেই সব মৌসুমে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত, সেই টাকি মাছও এখন আগের মতো সবসময় পাওয়া যায় না। অর্থনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ বিপন্ন প্রজাতিগুলোর মধ্যে রয়েছে- পাবদা, গজার, শাল বাইম, মহাশোল, ঘোড়া মাছ, কাবাশি টেংরা, রিটা, এলং, বোল, ভেদা, বাটা, বাচা, ঘাউরা বাচা, শিলং ইত্যাদি। লোনা পানির মাছের একমাত্র আবাসস্থল বঙ্গোপসাগর। এখান থেকেও বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বিভিন্ন সময়ে হারিয়ে যাচ্ছে।

১০ থেকে ১৫ বছর আগেও হাওরাঞ্চলে পৌষসংক্রান্তির সময় মানুষ দলবেঁধে মহাউৎসাহে নদীতে পলো দিয়ে মাছ ধরত। এই দৃশ্য এখন একেবারেই বিরল। কারণ, মাছ কমে গেছে। শখের মাছশিকারিরা মাছ শিকার ছেড়ে দিয়েছেন। অনেকে খালের পানির নিচে মাটির কলসি বা বাঁশের চোঙা পেতে রেখে দিতেন মাছ ঢুকবে, এই আশায়। দেখা যেত ১০-১২ দিন পর কলসি বা চোঙায় বেশ মাছ ঢুকেছে। এখন আর এভাবে মাছ ধরা তেমন চোখে পড়ে না।

ফিশফার্ম তথা মৎস্য খামার আমিষ চাহিদা পূরণে যথেষ্ট ভূমিকা রাখলেও তা কখনই প্রাকৃতিক মাছের সমগুণসম্পন্ন হতে পারে না। কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে খামারের মাছের ওপর নিশ্চিন্তে নির্ভর করে থাকা যাচ্ছে না। কারণ, ট্যানারির বিষাক্ত বর্জ্য দিয়ে কিছু ব্যবসায়ী ফিশফিড তৈরি করে। প্রক্রিয়াজাত শেষে অবশিষ্ট যে বর্জ্য বা উচ্ছিষ্ট থেকে যায়, এগুলো খুবই বিষাক্ত; তবে যেসব খামারে ট্যানারির বর্জ্য থেকে তৈরি ফিশফিড ব্যবহূত হয় না, উন্নত ফিশফিড ব্যবহূত হয় সেসব খামারের মাছ মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়। অনেক সৎ মৎস্য খামার ব্যবসায়ী আছেন বলেই মৎস্যশিল্প এখনও টিকে আছে। মাছের খামার যতই থাকুক তা কখনই প্রাকৃতিক উৎসের বিকল্প নয়।

নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়, হ্রদ ইত্যাদি জলাশয় মিঠাপানির মাছের প্রাকৃতিক বসতির প্রধান আশ্রয়স্থল। এসব জলাশয় দখলদারদের দৌরাত্ম্যে একদিকে যেমন বিলীন হচ্ছে; অন্যদিকে যেটুকু আছে সেটুকুও দূষণের কবলে পড়ে ধুঁকছে। বাংলাদেশের কোনো নদনদীর পানিই এখন শতভাগ বিশুদ্ধ নয়। কিছুকাল আগেও বলা হতো- 'নদীর জল ঘোলাও ভালো'; তা কি এমনি এমনিই বলা হতো। জল মানে পানি ভালো ছিল বলেই বলা হচ্ছে, ঘোলা হলেও তাতে ক্ষতি নেই। তা-ও আবার নদীর। কেন পুকুরের কথা না বলে নদীর কথা বলা হলো? নিশ্চয়ই কারণ আছে আর তা অনুমান করি, নদী স্রোতস্বিনী। পুকুরের পানি অবশ্যই ভালো। তবে যে সময়ে এই কথা বলা হতো, সেই সময় সামর্থ্যবান লোক ছাড়া পুকুর খনন করা দুঃসাধ্য ছিল। আর সঙ্গতভাবেই নদীর জলের ওপর অনেকেই নির্ভরশীল ছিল আর স্রোত ছিল বলেই ঘোলা পানির কথা এসেছে। অনেক নদীর প্রবাহ বন্ধ করে দিয়ে নদী 'ছিনতাই' করা হয়েছে। আর সেখানে গড়ে উঠেছে নানা ধরনের স্থাপনা। দেখে বোঝার উপায় নেই যে, এখানে নদী ছিল। শুধু কি নদী? খাল-বিল-হাওর-বাঁওড়সহ নানা ধরনের প্রাকৃতিক জলাশয় দখল-ভরাট-দূষণ ঘটছেই। আর এতে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে।

মাছ বিলুপ্ত বা বিপন্ন কিংবা কমে যাওয়ার প্রধান কারণগুলো হচ্ছে- নদনদী, দখল-ভরাট, নদী-খালের পানির প্রবাহ হ্রাস, প্রবহমান জলাশয়ে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, পানি দূষণ, হাওর-খাল-বিল ধ্বংস, কারেন্ট জালের ব্যবহার, ফসলের ক্ষেতে অপরিকল্পিত কীটনাশক ব্যবহার, ডিমওয়ালা মাছ ও পোনা মাছ আহরণ, বিদেশি রাক্ষুসে মাছের অপরিকল্পিত চাষ ইত্যাদি।

প্রজাতিভেদে মাছ নির্দিষ্ট জলাশয়ে বসবাস করে এবং নির্দিষ্ট সময়ে প্রজনন ঘটিয়ে বংশবৃদ্ধি করে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের জন্য মৎস্যসম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ অতীব জরুরি। এ জন্য প্রথমেই দেশের সব নদনদী, খাল প্রবহমান রাখা এবং হাওর-বাঁওড়-বিল-হ্রদসহ প্রাকৃতিক জলাশয় বাঁচিয়ে রাখার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ একান্ত প্রয়োজন। প্রাকৃতিক আবাসস্থলের যথাযথ সংরক্ষণ ব্যতীত বিশুদ্ধ জিনধারী মাছ হারিয়ে যাওয়া রোধ করা সম্ভব নয়। নদী-হাওর-বিল ইত্যাদি জলাশয় মৎস্যবিদদের দ্বারা গভীর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মাছের মৌসুমি অভয়াশ্রম গড়ে তুলতে হবে। মাছের পরিযানের পথে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা যাবে না। ডিমওয়ালা মাছ ও পোনা মাছ ধরা-মারা নিষিদ্ধ করা, মৌসুমি মৎস্য অভয়াশ্রম কিংবা সাংবৎসরিক অভয়াশ্রম ঘোষণা করা, বিশেষ বিশেষ স্থানে মৎস্য আহরণ নিষিদ্ধকরণ। এগুলো তো করা লাগবেই; কিন্তু তারও আগে প্রয়োজন মৎস্য আবাসস্থল ও বিচরণ এলাকা অর্থাৎ নদী-হাওর-খাল-বিল সংরক্ষণ। বিলুপ্ত কিংবা দখল হওয়া নদী পুনরুদ্ধার, নদী পুনঃখনন, নদীর পাড় ও হাওর এলাকায় কলকারখানা স্থাপন নিষিদ্ধকরণ- যদি থেকে থাকে তবে অবিলম্বে বন্ধসহ উচ্ছেদ করা, অপরিকল্পিত বাঁধ বা স্লুইসগেট নির্মাণ বন্ধ করা।

প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ হলে পর্যাপ্ত পরিমাণে মাছ থাকবে। ফলে ইচ্ছামতো মাছ ধরা যাবে ও খাওয়া যাবে এবং জনস্বাস্থ্য ভালো থাকার পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবেও লাভবান হওয়া সম্ভব।

শিক্ষক ও গবেষক

আরও পড়ুন

×