ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

মার্চে উত্তাল ফরিদপুর

মার্চে উত্তাল ফরিদপুর
×

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট -ফাইল ছবি

শাহ্‌ মো. আবু জাফর

প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২০ | ১৫:০১

১৯৭১ সালের ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের প্রথম অধিবেশন বসার কথা থাকলেও সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে মহাসমাবেশের ডাক দেয়। সে ডাকে পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র যেন রণসাজে সজ্জিত হতে থাকে। আমরা ফরিদপুরে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করলাম। আমি রাজেন্দ্র কলেজ ছাত্রছাত্রী সংসদের ভিপি এবং বৃহত্তর ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহ্‌ মো. আবু জাফর, ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি সৈয়দ কবিরুল আলম, রাজেন্দ্র কলেজ ছাত্রছাত্রী সংসদের সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন- এই তিনজনকে নিয়েই ফরিদপুর জেলা স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলো। ৩ মার্চ ফরিদপুর স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে বিশাল গণমিছিল করে রাজেন্দ্র কলেজের আমতলায় এক গণজমায়েত হয়। আমি এ সভায় রাজেন্দ্র কলেজের ভিপি হিসেবে সভাপতিত্ব করি। সভায় বক্তব্য দেন জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি সৈয়দ কবিরুল আলম মাও, নাসির উদ্দিন খোকন, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, আবু সাঈদ খান, বাহলুল মজনুন চুন্নু, শাহরিয়ার রুমি প্রমুখ।

ঢাকায় ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার পর ফরিদপুরের সর্বত্র ভীষণ উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। ১০ মার্চ ফরিদপুর জেলা স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে এক বিশাল ছাত্র গণজমায়েত ডাকা হয়। ওই দিন অম্বিকা ময়দানের অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি সৈয়দ কবিরুল আলম মাও। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত ফরিদপুর শহর। সভায় বক্তব্য দেন এমএনএ শামসুদ্দিন মোল্যা, এমপি ইমাম উদ্দিন আহমেদ, হায়দার হোসেন, মোশারেফ হোসেন, আওয়ামী লীগ নেতা গৌরচন্দ্র বালা, এসএম নুরুন্নবী প্রমুখ নেতা। ছাত্রনেতাদের মধ্যে বক্তব্য দেন নাসির উদ্দিন খোকন, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, হামিদুল হক, বাহলুল মজনুন চুন্নু, শাহরিয়ার রুমী, শহীদুল হক নিরু, নাজমুল হাসান নসরু, কবিরুল ইসলাম কাঞ্চন, মেসবাহুর রহমান মিরোজ খান, মোজাফফর আলী আখন্দ প্রমুখ। ১০ মার্চ আমি লাখো জনতার মাঝে অম্বিকা ময়দানে পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করি। ওই দিনেই ফরিদপুর জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের অফিস থেকে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা তুলি। সার্কিট হাউসে পাকিস্তান আর্মিদের অবস্থান ছিল। সম্মিলিতভাবে আমরা পতাকা উত্তোলন করতে যাই; তখনই পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে সংঘাতে শতাধিক ছাত্র-জনতা আহত হয়।

১১ মার্চ আমি, সৈয়দ কবিরুল আলম ও সালাহ উদ্দিন ফরিদপুরের ডিসি আ.ন.ম. ইউসুফ ও এসপি নুরুল মোমিন খান মিহিরের সঙ্গে দেখা করে বলি, 'অবিলম্বে পুলিশকে স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিতে হবে অথবা অস্ত্রাগারের অস্ত্র, গোলাবারুদ সব আমাদের হাতে দিয়ে দিতে হবে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ অনুযায়ী ফরিদপুরে অবস্থানকারী সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে চলে যেতে হবে। ডিসি ও এসপি বললেন, পুলিশ বাহিনীর কাছ থেকে অস্ত্র নেওয়ার দরকার নেই। পুলিশ বাহিনী মুক্তিযুদ্ধে আপনাদের সঙ্গেই থাকবে। আর আপনাদের প্রস্তাব নিয়ে আমরা সেনাবাহিনীর সঙ্গে কথা বলব। ১২ মার্চ রাতে ফরিদপুর শহরের লক্ষ্মীপুর এলাকার হারুনুর রশিদ চানের নেতৃত্বে ফরিদপুর সার্কিট হাউসের পূর্বদিক দিয়ে পাকিস্তান সেনাদের ওপর দফায় দফায় বোমা হামলা চালানো হয়। আক্রমণে সেনারা ভীত হয়ে সারারাত সার্কিট হাউস থেকে ব্রাশফায়ার করতে থাকে। এই হামলার উদ্দেশ্যে বোমা তৈরি করতে গিয়ে মুসলিম প্রেসের মানিক দার দুটি হাতই উড়ে গিয়েছিল। তবে তিনি বেঁচে ছিলেন।

১৭ মার্চ সকালে ফরিদপুর সার্কিট হাউস থেকে পাকিস্তানি সব সেনাসদস্য তল্পিতল্পা গুটিয়ে যশোর ক্যান্টনমেন্টে চলে যায়। এদিন থেকেই ফরিদপুর জেলা পাকিস্তান আর্মিমুক্ত হয়ে যায়। পাকিস্তান আর্মি চলে যাওয়ার পরেই আমরা উল্লাস মিছিল বের করে শহর প্রদক্ষিণ করি। ২১ এপ্রিল পর্যন্ত সমগ্র ফরিদপুর ছিল পাকিস্তান সেনামুক্ত। ওই দিন পাকিস্তান আর্মি জল-স্থল-আকাশপথে দুর্ধর্ষ আক্রমণ করে মুক্তিযোদ্ধা-জনতার প্রতিরোধ ভেঙে ফরিদপুরকে আবার দখল করে নেয়।
 

বিএলএফ ফিল্ড কমান্ডার ও ডেপুটি লিডার, বৃহত্তর ফরিদপুর

আরও পড়ুন

×