ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক

শিক্ষাক্ষেত্রে সাফল্য সূচক

শিক্ষাক্ষেত্রে সাফল্য সূচক
×

এম এম শহিদুল হাসান

প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২০ | ১৫:০৪ | আপডেট: ১৫ মার্চ ২০২০ | ১৫:০৫

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ৪৯ বছরে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাই বৃদ্ধি পায়নি, অসংখ্য বাংলা ও ইংরেজি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মাত্র ছয়টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে যাত্রা করা দেশটিতে স্থাপিত হয়েছে ৪৪৬টি সরকারি ও ১০৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে প্রায় ৩২ লাখ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে, যেখানে ১৯৭২ সালে ছিল মাত্র ৩১ হাজার। সামনে যে এটি বাড়বে, তা বলাই বাহুল্য। বাংলাদেশে বর্তমানে সাড়ে ১৬ কোটি জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ ১৪ বছরের কম বয়সী আর ১৫-২৪ বছর বয়সী তরুণদের সংখ্যা হবে আনুমানিক ১৯ শতাংশ। এই অল্প বয়সী তরুণরা মানবসম্পদে পরিণত হবে, যদি শিক্ষা জীবনে তারা মানসম্মত শিক্ষা এবং উচ্চ দক্ষতা অর্জন করে। বাংলাদেশে বিভিন্ন সামাজিক ক্ষেত্রে অগ্রগতি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখন সঠিকভাবে বিকশিত হয়নি এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মান অর্জনও করতে পারেনি। অবশ্য অনুসন্ধানগুলো থেকে দেখা যায়, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার প্রশস্তকরণ এবং জেন্ডার সমতা অর্জনে বাংলাদেশের অবস্থান উদাহরণীয়। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থাটি প্রকৃত অর্থে একাডেমিক, ব্যবহারিকের চেয়ে তাত্ত্বিক ও শিল্পের সংস্পর্শের অভাব। শিক্ষার প্রশস্তকরণ ও জেন্ডার সমতা নিয়ে সর্বত্র বেশ আলাপ-আলোচনা হয়। পক্ষান্তরে আশ্চর্যজনকভাবে দক্ষতার বিকাশ নিয়ে খুব কম আলোচনা হয়, যদিও গত কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন শিক্ষানীতিতে দক্ষতা এবং প্রশিক্ষণের ওপর যথেষ্ট জোর দেওয়া হচ্ছে।

শিক্ষাব্যবস্থা অনেকটা সনাতন হওয়ার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের জ্ঞান দানের মধ্যেই তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখে; শিক্ষা চাকরির বাজারের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। চাকরিমুখী শিক্ষা এবং দক্ষতা ও নতুনত্বের অভাবের কারণে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদেশি নির্বাহী এবং প্রযুক্তিবিদদের ওপর নির্ভর করতে হয়। বিদেশি নাগরিকরা বছরে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার দেশের বাইরে পাঠান। নিয়োগকর্তারা ক্রমবর্ধমান শিল্প ও পরিষেবা খাতগুলোর জন্য উচ্চ দক্ষ কর্মী প্রস্তুত করতে শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তনের দাবি করে আসছে। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী ও টেকসই করা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এটি গ্রহণযোগ্য করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন অপরিহার্য। সর্বাগ্রে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বল দিকগুলো জানতে হবে। আজকের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার জন্য সর্বস্তরে উন্নতমানের শিক্ষার নিশ্চয়তার জন্য বাংলাদেশে একটি জাতীয় কোয়ালিফিকেশন কাঠামো (ন্যাশনাল কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক) প্রণয়ন অবশ্যই দরকার। সম্প্রতি সরকার জাতীয় অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল গঠন করেছে এবং জাতীয় কোয়ালিফিকেশন কাঠামো প্রণয়নের চিন্তাভাবনা করছে।
শিক্ষাব্যবস্থায় নানা দুর্বলতা রয়েছে। বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষকদের অনেকেই প্রশিক্ষিত নয়; আমাদের পাঠ্যক্রম প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক নয়; শিক্ষাদান পদ্ধতি সেকেলে; প্রাইভেট কোচিং-নোট-গাইডের আধিপত্য; শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ইংরেজিতে দক্ষতার অভাব ইত্যাদি। বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ্যক্রম শিল্পের প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভালো বোঝাপড়া তৈরি, পাঠ্যক্রম প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক করা, আধুনিক পাঠদান পদ্ধতি প্রবর্তন ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ আর শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী দক্ষতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশের শিক্ষার সংস্কৃতি উন্নত হতে পারে। এটা সম্ভব হবে যদি একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক থাকে।

একটি দেশের জাতীয় কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্কের (এনকিউএফ) মাধ্যমে সে দেশের সব শ্রেণির শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে একটি কাঠামোতে আনা হয়। প্রতিটি দেশ তার এনকিউএফ প্রণয়নের সময় নিজস্ব মানদণ্ডগুলো নির্ধারণ করে। তবে বিবেচনায় আনা হয় : ১. প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার প্রবেশ যোগ্যতার স্তরগুলো বুঝতে সহজ করা এবং কোয়ালিফিকেশন সিস্টেমগুলোর সমন্বয় করে শক্তিশালী করা; ২. বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচলিত ক্রেডিট ব্যবস্থাগুলোর সঙ্গে সমতুল্যে আনা; ৩. ক্রেডিট ট্রান্সফার; ৪. আজীবন শেখার ক্ষেত্র প্রস্তুত; ৫. প্রশিক্ষণ ও শ্রমবাজারের মধ্যে যোগসূত্রকে শক্তিশালী করা এবং ৬. এনকিউএফের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সহজতর করা। বিশ্বের দেশগুলো দক্ষতা, প্রযুক্তি, বৃত্তিমূলক, উদ্ভাবনী ও সৃজনশীলতা এবং একাডেমিক ক্ষেত্রগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে তাদের এনকিউএফ প্রস্তুত করে। আমাদের দেশে শিক্ষাব্যবস্থা মূলত ক্রেডিট পয়েন্ট সিস্টেম। কাজেই এনকিউএফ ক্রেডিট পয়েন্ট সিস্টেম এবং কোয়ালিফিকেশনের স্তরের ভিত্তিতে ডিজাইন করাই উচিত হবে।
একাডেমিক ক্রেডিট একজন শিক্ষার্থীর একাডেমিক অগ্রগতি মূল্যায়ন করার আর সার্টিফিকেট, ডিগ্রি ও অন্যান্য কোয়ালিফিকেশন নির্ধারণের জন্য একটি সংখ্যাগত উপায়। প্রতিটি কোয়ালিফিকেশনের স্তরটি সংজ্ঞায়িত হয় সেই স্তরে পৌঁছানোর জন্য নির্ধারিত সর্বনিম্ন জ্ঞান, দক্ষতা ও পারদর্শিতা অর্জনের দ্বারা। কোনো একাডেমিক ডিগ্রি অর্জন করার জন্য সর্বমোট কত ক্রেডিট আওয়ার অর্জন করতে হবে, তা সর্বনিম্ন একাডেমিক লোডের পরিমাপ ঠিক করে নির্দিষ্ট করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করতে গেলে সর্বনিম্ন ১২০ ক্রেডিট অর্জন করতে হবে। আমরা এখন ক্রেডিট আওয়ারের সুস্পষ্ট কোনো সংজ্ঞা দিতে পারিনি এবং কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে ডিগ্রি অর্জনের জন্য সর্বনিম্ন একাডেমিক লোডের পরিমাপ কীভাবে নির্ধারিত করতে হবে, সে সম্পর্কে স্পষ্টভাবে কোথাও উল্লেখ করা নেই। একটি এনকিউএফ সাধারণত ৮ থেকে ১০ কোয়ালিফিকেশনের স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত। এসব স্তর নির্ধারণের আগে দেশে বিদ্যমান একাডেমিক পদ্ধতি-পদ্ধতিগুলো সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করতে হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় তিনটি ধারা রয়েছে; যথা- একটি সাধারণ ধারা, একটি ধর্মীয় ধারা (মাদ্রাসা) ও একটি প্রযুক্তিগত ধারা। বাংলাদেশি স্কুলগুলোর পাশাপাশি বিদেশি পাঠ্যক্রম পড়ানোর জন্য ইংরেজি স্কুল আছে। বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি কাঠামো স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও ডক্টরাল ডিগ্রি পর্যন্ত বিস্তৃত। আমাদের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় দ্বিসেমিস্টার পদ্ধতি ব্যবহার করে এবং বছরে দুটি নিয়মিত সেমিস্টার চলে।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাটি জ্ঞান অর্জন, পেশাগত দক্ষতা অর্জন, কর্মজীবনে বিকাশের জন্য যোগ্যতা অর্জন এবং শ্রমবাজারের চাহিদাভিত্তিক হতে হবে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সঠিক এনকিউএফ প্রণয়ন করতে পারলে তরুণরা মানবসম্পদে রূপান্তরিত হবে এবং দেশের সর্ার্বিক উন্নয়নে তারা অবদান রাখতে পারবে। এনকিউএফ প্রণয়ন অবশ্যই একটি জটিল কাজ। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা নিতে হবে। জাতীয় ফ্রেমওয়ার্কটি ভালোভাবে কাজ করার পর, এনকিউএফকে উন্নতিশীল দেশগুলোর ফ্রেমওয়ার্কের সঙ্গে মিল খাওয়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

উপাচার্য, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি

[email protected]

আরও পড়ুন

×