যিনি জন্ম থেকেই নেতা
ড. হারুন-অর-রশিদ
প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২০ | ১৪:৪১
একজন মহান নেতা বা নেতৃত্বের গুণাবলি; যেমন দেশপ্রেম, মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সাংগঠনিক দক্ষতা, সম্মোহনী শক্তি, মানুষের চাহিদা ও মনমানসিকতা যথার্থভাবে নিরূপণ করার ক্ষমতা, যথাসময়ে কর্মসূচি গ্রহণ, লক্ষ্য স্থিরকরণ, লক্ষ্য অর্জনে অবিচল থাকা, উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষমতা, সাহস, আত্মপ্রত্যয়, ত্যাগের আদর্শ, ভবিষ্যৎমুখিনতা ইত্যাদি অনেক গুণ শৈশব থেকেই বঙ্গবন্ধুর মধ্যে লক্ষণীয় ছিল। শৈশব থেকেই বঙ্গবন্ধু ছিলেন অত্যন্ত স্বাধীনচেতা ও আত্মসম্মানবোধের অধিকারী। ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র থাকা অবস্থায় ১৯৪৩ সাল থেকে তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগের কাউন্সিলর হন। ১৯৪৬ সালে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র সংসদের জেনারেল সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধু '৪৭-এ দেশ বিভাগের পূর্বে ছাত্রলীগের আনুষ্ঠানিক কোনো পদধারী না হলেও একজন প্রতিশ্রুতিশীল ছাত্র-যুব নেতা হিসেবে তাঁর পরিচিতি কলকাতার বাইরেও সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।
বাঙালিদের ক্ষেত্রে পাকিস্তান ছিল একটি ঔপনিবেশিক ধাঁচের রাষ্ট্র। এ রাষ্ট্রের অধীনে বাঙালির সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কোনো অধিকারই যে অর্জন সম্ভব নয়, সে সম্বন্ধে এ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্ব থেকেই বঙ্গবন্ধুর স্পষ্ট ধারণা ছিল। বাঙালির জাতীয় মুক্তি বা স্বাধীনতা অর্জনই ছিল সর্বপ্রকার অধিকার অর্জন ও জাতি হিসেবে উন্নতি-অগ্রগতির একমাত্র সোপান। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি তাঁর নেতৃত্বেই প্রতিষ্ঠা লাভ করে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। পাকিস্তান রাষ্ট্রের শুরুতে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নকে কেন্দ্র করে বাঙালিদের জাতীয় মুক্তির সংগ্রামের সূচনা হলে বঙ্গবন্ধু সে আন্দোলনে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালনে এগিয়ে আসেন। এর পূর্বে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পাকিস্তানের প্রথম কার্যকর বিরোধী দল আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হলে বন্দি অবস্থায় বঙ্গবন্ধু দলের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তীকালে সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি হন। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা শুধু বিরোধী দল হিসেবেই ছিল না, এর প্রতিষ্ঠার মূলে ছিল বাঙালির জাতীয় মুক্তির লক্ষ্য অর্জন। সে কারণে আওয়ামী লীগকে কখনোই সর্ব পাকিস্তানভিত্তিক রাজনৈতিক দল হিসেবে সংগঠিত করা হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনে নেতৃত্বদানের কারণে ১৯৪৯ সালে একদিকে তাঁকে গ্রেপ্তার, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ১৫ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কারের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করার পথই বেছে নেন। ১৯৫৬-৫৭ সালে আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক আওয়ামী লীগ সরকারে ৯ মাস মন্ত্রী থাকার পর বঙ্গবন্ধু স্বেচ্ছায় মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে নিজেকে নিয়োজিত করেন। এ উভয় ঘটনা থেকে বোঝা যায় যে, বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য ছিল সুদূরপ্রসারী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রত্ব রক্ষা কিংবা মন্ত্রিত্ব কোনোটিই নয়। সে লক্ষ্য অর্জনে আওয়ামী লীগকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলেন। বাঙালির জাতীয় মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে ক্রমাগত আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জনগণকে সংগঠিত ও সঙ্গে নিয়ে দৃঢ় পদে তিনি সম্মুখে এগিয়ে যান।
পাকিস্তানি শাসন পর্বে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন কোনো অবস্থাতেই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। বারবার তাঁকে গ্রেপ্তার, হুলিয়া, কারা নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে। পাকিস্তানি শাসকদের কাছে তিনিই এক নম্বর শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিলেন, যে কারণে পাকিস্তানের ২৪ বছরের ১২ বছর তাঁকে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটাতে এবং দু-দুবার ফাঁসির মঞ্চের কাছাকাছি গিয়ে ফিরে আসতে হয়।
পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাঙালিদের দ্বন্দ্বের মূলে ছিল জাতীয় মুক্তির প্রশ্ন। পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকাঠামো ভেঙে বেরিয়ে না আসা পর্যন্ত বাঙালির মুক্তি লাভ যে সম্ভব নয়, সেটি বঙ্গবন্ধুর মতো করে আর কোনো নেতৃত্ব ওই সময় চিহ্নিত করতে সক্ষম হননি। তাই ১৯৬৬ সালে বাঙালির জাতীয় মুক্তির লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু 'আমাদের বাঁচার দাবী' খ্যাত ঐতিহাসিক ৬ দফা কর্মসূচি পেশ করেন। জেনারেল আইয়ুব খান ৬ দফা আন্দোলন অঙ্কুরেই বিনষ্ট ও এর প্রবক্তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিঃশেষ করে দেওয়ার লক্ষ্যে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনে 'আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা' দায়ের করেছিলেন। '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের ফলে আইয়ুব সরকার নিঃশর্তভাবে বঙ্গবন্ধু ও অন্য অভিযুক্তদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে এক বিশাল গণসংবর্ধনায় শেখ মুজিবুর রহমানকে সবার পক্ষে তোফায়েল আহমেদ 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করেন।
বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য ছিল বাঙালির জাতীয় মুক্তি বা স্বাধীনতা অর্জন, কোনো অবস্থায়ই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রিত্ব নয়। তাই ৭ মার্চের ভাষণে তিনি ইয়াহিয়া খানের উদ্দেশে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, 'আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না, আমি এ দেশের মানুষের অধিকার চাই।' ৯ মাসের সফল মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় বাঙালির স্বাধীনতা, আর বিশ্বের মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হন স্বাধীন বাঙালি জাতির পিতা ও রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা। মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত দেশি-বিদেশি চক্রের ষড়যন্ত্রে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তিনি ও তাঁর পরিবারের উপস্থিত সব সদস্য এক নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।
বঙ্গবন্ধু মাত্র ৫৫ বছর বেঁচে ছিলেন। শৈশবকাল বাদ দিলে বাকি পুরোটা সময় তিনি নিয়োজিত ছিলেন বাঙালি জাতির মুক্তির লক্ষ্যে। এ জন্য তিনি সর্বোচ্চ ত্যাগ পর্যন্ত করে গেছেন। বাঙালিদের মধ্যে আর কোনো নেতার কণ্ঠে তাঁর মতো করে কখনও উচ্চারিত হয়নি, 'ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময়ও বলবো আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা।' বাংলাদেশ সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি ও বাঙালির ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অমর সৃষ্টি। বঙ্গবন্ধু, স্বাধীনতা ও বাংলাদেশ এক ও অভিন্ন সত্তা। জাতির পিতা মুজিবের মৃত্যু নেই।
উপাচার্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- ড. হারুন-অর-রশিদ
- বঙ্গবন্ধু
