মানবতা এক বিশেষ অধিকার
বিচার ছাড়াই ভারতের কারাগারে উমর খালিদের ছয় বছর
ছবি- সংগৃহীত
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ | ০০:২২
দিল্লির কুখ্যাত তিহার কারাগারে যখন সূর্য অস্ত যায়, তখন বন্দিদের মনে এক নির্মম আতঙ্ক ভর করে। বন্দি নম্বর ৬২৬৭১৪ তথা উমর খালিদের কাছেও এই সময়টা সবচেয়ে কষ্টের। তিনি বলেন, ‘সম্ভবত সূর্যাস্তের সময় মনে হতে থাকে, জীবনের আরও একটি দিন বন্দিদশায় কেটে গেল।’
দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে গ্রেপ্তারের পর প্রথমবারের মতো এক সাক্ষাৎকারে নিজের বন্দিজীবনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানান এই বামপন্থি মানবাধিকারকর্মী। ৩৮ বছর বয়সী সাবেক এই ছাত্রনেতা পরিবার ও বন্ধুদের মাধ্যমে এই সাক্ষাৎকার দিয়েছেন।
তিহার কারাগারের বাইরে উমর খালিদ ভারতের এক অতি পরিচিত নাম। ২০১৯ সালে নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী গড়ে ওঠা গণআন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন তিনি। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে দিল্লির সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ‘মূল ষড়যন্ত্রকারী’ এবং ‘সহিংস সরকার পরিবর্তনের’ চক্রান্তের অভিযোগে তাঁকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার করা হয়।
ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমও তাঁকে ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে উপস্থাপন করে। অন্যদিকে, অধিকারকর্মী ও বামপন্থিদের কাছে তিনি মোদি সরকারের ভিন্নমত দমনের এক জীবন্ত প্রতীক। সমালোচকদের মতে, উমর খালিদকে মোদি সরকারের ভিন্নমত দমনের এক রাজনৈতিক শিকার বানানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বিচার ছাড়া দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর তাঁকে আটকে রাখাকে অন্যায় বলে নিন্দা জানিয়েছে।
মানবতা আমাদের মতো মানুষের জন্য নয়
বছরের পর বছর মিথ্যা প্রোপাগান্ডার শিকার হওয়া খালিদ বলেন, ‘যখন আপনাকে স্রেফ একটা নেতিবাচক বা ইতিবাচক ইমেজে নামিয়ে আনা হয়, তখন মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখাই কঠিন হয়ে পড়ে। সহবন্দিরাও পেছনে পেছনে সন্ত্রাসী বলে ডাকে। মানবতা আসলে এক বিশেষ অধিকার, যা আমাদের মতো মানুষদের দেওয়া হয় না।’
দিল্লির জামিয়া নগরে বেড়ে ওঠা খালিদ ছাত্রজীবনেই বুঝতে পেরেছিলেন কীভাবে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি সমাজকে বিভক্ত করছে। জেএনইউতে পিএইচডি করার সময় তিনি ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হন। তাঁর পিএইচডি থিসিসটি চলতি মাসেই বই আকারে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে।
২০২০ সালের দিল্লির দাঙ্গায় যখন ৫৩ জন মানুষ মারা যান (যাদের বেশির ভাগই মুসলিম), তখন খালিদ ঘটনাস্থল থেকে এক হাজার মাইল দূরে ছিলেন। তা সত্ত্বেও তাঁকে মূল পরিকল্পনাকারী সাজানো হয়। দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে এই মামলায় ভুয়া সাক্ষী ও প্রমাণ তৈরির অভিযোগ রয়েছে।
বছরের পর বছর ধরে খালিদের জামিনের আবেদন বারবার পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই অন্তহীন অপেক্ষার ধকল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘ধীরে ধীরে আশা মরে যেতে থাকে। আর আশা ছাড়া কারাগারে টিকে থাকা অসম্ভব।’ একই সঙ্গে ভারতের বিরোধী দল ও সুশীল সমাজের নীরবতা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘তাদের এই নীরবতা স্বৈরাচারী শাসনকে আরও বেশি সাহসী করে তুলছে।’
তবে এত অন্ধকারের মধ্যেও খালিদ ভেঙে পড়েননি। কারাগারের সেলে বিপ্লবী ভগত সিংয়ের ছবির পাশে তিনি লিখে রেখেছেন তাঁর বিখ্যাত উক্তি– ‘আমি এমন এক পাগল, যে বন্দিদশায়ও মুক্ত’।
