ঢাকা বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

কাগুজে বইয়ের বিকল্প

কাগুজে বইয়ের বিকল্প
×

রাতের আধারে পটিয়া পিটিআইয়ে নারীদের একটি হোস্টেলে ভাংচুরের প্রতিবাদে বুধবার বিক্ষোভ করেন প্রশিক্ষণার্থীরা - সমকাল

করীম রেজা

প্রকাশ: ২২ মার্চ ২০২০ | ১৪:২৬

ডিজিটাল বই বাজারে আসার সঙ্গে সঙ্গেই মুদ্রিত বইয়ের যুগ শেষ বলে জল্পনার শুরু; এখনও চলছে। মুদ্রিত বইয়ের আসন্ন দুর্দিন প্রসঙ্গে সংগীত আলোচনায় এসেছে। ডিজিটাল উপায়ে সংগীত ব্যবস্থাপনায় সিডির ব্যবহার বন্ধ হয়েছে। কথা অংশত ঠিক। গানের ভিডিও চিত্রায়ণ শুরু হলে, মনে করা হয়েছিল, অডিও মাধ্যমের সমাপ্তি। বাস্তবে সিডির ব্যবহার কমলেও শুধু মাধ্যম বদলে অডিও টিকে থাকল। সিডি থেকে পেনড্রাইভ অথবা ইউ টিউব বা ওয়েবসাইট। আমরা জানি, বই দেখা যায়, ধরা যায়, ছোঁয়া যায়। কাজেই গানের সিডির সঙ্গে বইয়ের ব্যবহারিক তুলনা অসম, আংশিক, অনুপযোগী ও খণ্ডিত। বইয়ের মতো গান স্পর্শযোগ্য, দৃশ্য নয়।

বই হাতে নিয়ে শুয়ে, বসে, কাত হয়ে, নানা ভঙ্গিতে পড়া সম্ভব। ই-বুকের এই সুবিধা থাকলেও প্রচুর সীমাবদ্ধতা আছে। বাজার থেকে একটি বই কিনে এনেই পড়া শুরু করা সম্ভব। অন্যদিকে ই-বুক পড়তে একটি আলাদা ডিভাইস দরকার। সেই ডিভাইস আবার বইয়ের মতো একই রকম কাগজ-কালিতে ছাপা নয়। ভিন্ন ভিন্ন কোম্পানির তৈরি ডিভাইসের সুবিধা-অসুবিধাও আলাদা। ডিভাইসের নিজস্ব আলো সরবরাহের ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন শারীরিক ভঙ্গিতে তা পড়তে হয়। ওই ডিভাইসের দৃশ্যমানতা কমবেশি পরিবর্তিত হয় আলো ও ভঙ্গির কারণে। ফলে পড়তে ব্যাঘাত হয়। আছে ব্যাটারির সক্ষমতা ও চার্জ দেওয়ার ঝক্কি। ই-বুক পড়ার ক্ষেত্রে ইন্টারনেট ছাড়া ই-বুক ডিভাইস মূল্যহীন। কাগজের ছাপা বইতে এই জাতীয় সমস্যা অকল্পনীয়।

মুদ্রিত বই এবং ই-বুক বহন করার ঝুঁকি আছে; ঝুঁকির পার্থক্যও।  হাত থেকে কোনো কারণে মুদ্রিত বই পড়ে গেলে, তুলে নিয়ে ধুলোবালি, ময়লা ঝেড়ে পরিস্কার করেই তা ব্যবহার করা যায়। ছিঁড়ে গেলে, পাতা বিচ্ছিন্ন হলে আঠা দিয়ে ও সেলাই করে তা ঠিক করা যায়।  পক্ষান্তরে ই-বুক পড়ার ডিভাইস, যেমন নুক, আইপড, কিন্ডলে, কোবো, মোবাইল ফোন, ট্যাব, কম্পিউটার ইত্যাদি হাত থেকে পড়ে গেলে প্রায়ই ব্যবহারের অনুপযোগী হতে পারে। ই-বুকের বিচ্ছুরিত আলোতে চোখের নানা রকম প্রতিক্রিয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা রয়েছে। মুদ্রিত বইয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা প্রায় শূন্য।

কাগজে মুদ্রিত বইয়ের মালিক ক্রেতা, পাঠক।  কিন্তু ই-বুকের মালিকানা ক্রেতা অথবা পাঠকের থাকে না। আবার ই-বুক রিডার যন্ত্র পরিবর্তন করলে আগের ই-বই নতুন যন্ত্রে স্থানান্তর অনেক সময় কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে নতুন ডিভাইস পুরোনো ফরমেটের উপযোগী হয় না। তখন বিড়ম্বনা ও অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় অনিবার্য। কাগজে মুদ্রিত বইয়ের অন্যতম সুবিধা হলো, কখনোই তা আপডেট করতে হয় না।

বই পড়ার সময় পাঠক বইয়ের গন্ধ, স্পর্শ, দর্শন অর্থাৎ পঞ্চইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অস্তিত্ব অনুভব দ্বারা সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করে।  ই-বুক পাঠের সময় সম্পূর্ণ মনোযোগ বইয়ের ওপর রাখা যায় না। ডিজিটাল ব্যবস্থায় অতিরিক্ত কারিগরি সুবিধা যেমন রেফারেন্স, বুকমার্ক, হাইলাইট, অভিধান ব্যবহার ইত্যাদি সর্বদা কার্যকর থাকায় বিষয়ান্তরে যাওয়া সহজ। উদ্দিষ্ট পাঠের প্রতি পাঠকের মনোযোগ সম্পূর্ণ কেন্দ্রীভূত থাকে না। মুদ্রিত বই পাঠের সময় কোনো পাঠ্যাংশ চিহ্নিত করা, হাইলাইট করা, রেফারেন্স হিসেবে তথ্য টুকে রাখা, চারদিকের মার্জিনে কিছু লেখা ইত্যাদি কাজ ডিজিটাল ডিভাইসের মতো না। পাঠকের মনোযোগও তাই নির্দিষ্ট পৃষ্ঠা থেকে অন্যত্র যাওয়ার আশঙ্কা কম। স্বীকৃত যে, ই-বুক অনেক ক্ষেত্রেই মুদ্রিত বইয়ের চেয়ে অধিকতর সুবিধাজনক। বইয়ের চিরাচরিত ব্যবহার পদ্ধতি এখনও আকর্ষণীয়, জনপ্রিয়; ই-বুকের বহুমুখী সুবিধা সত্ত্বেও।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মুদ্রিত বই এবং ই-বুকের ক্রয়-বিক্রয়, ব্যবহার ইত্যাদি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য না থাকলেও প্রতি বছর একুশের গ্রন্থমেলায় যে সংখ্যক বই প্রকাশিত হয়, তা থেকে কিঞ্চিৎ ধারণা করা যায়, ই-বুকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এখনও মুদ্রিত কাগজের বই যথেষ্ট দাপটের সঙ্গেই চলছে।

ডিজিটাল বই প্রকাশের সুনির্দিষ্ট তথ্য সহজলভ্য নয়।

প্রচলিত ধারণা, যুবসমাজ ছাপা বইয়ের চেয়ে ই-বুকের প্রতি অধিকতর আগ্রহী। কিন্তু ইউরোপ-আমেরিকার জরিপের ফলাফলে তেমন জানা যায় না। সাধারণ সূত্রমানে ইউরোপ-আমেরিকার তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের দেশেও যুবসমাজ মুদ্রিত বইয়ের চেয়ে ই-বুকের প্রতি বেশি আগ্রহী নয়। তা ছাড়া এশিয়ার কোনো কোনো দেশ এবং ইউরোপ-আমেরিকায় চলার পথে রেল, বাস অথবা বিশ্রামাগারে যেমন পাঠক দেখা যায়, আমাদের দেশে তেমন নয়। ওইসব পাঠকের কাছে এখনও ই-বুক এবং মুদ্রিত বই সমান্তরালভাবে প্রায় সমান জনপ্রিয়। বিভিন্ন সূত্রে মুদ্রিত বইয়ের প্রাধান্যের ইঙ্গিত মেলে।

স্বাস্থ্যঝুঁকি, পরিবেশ বিপর্যয়, ব্যবহারিক সুবিধা, কারিগরি দিক- সবকিছু মিলিয়ে বিবেচনা করতে হবে, সময়ের স্রোতে কোন ব্যবস্থা টিকে থাকবে।  ই-বুক নাকি মুদ্রিত বই- এখনও এ প্রশ্নের মীমাংসা হয়নি। সময়ই এর প্রকৃত জবাব দেবে।

কবি

আরও পড়ুন

×