ঢাকা বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬

পরিবেশ-প্রতিবেশ

সোনাদিয়ার বিপন্ন প্যারাবন ও তিন যুগের দীর্ঘশ্বাস 

সোনাদিয়ার বিপন্ন প্যারাবন ও তিন যুগের দীর্ঘশ্বাস 
×

হারুনুর রশীদ

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ | ১৫:৫৭

কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার সোনাদিয়া দ্বীপ, একসময় যা পরিচিত ছিল জীববৈচিত্র্যের এক স্বর্গরাজ্য হিসেবে। সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যম ও স্যাটেলাইট চিত্র আমাদের এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সোনাদিয়া ও তার সংলগ্ন অঞ্চলের প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা প্যারাবন (ম্যানগ্রোভ) আজ এক নীরব ধ্বংসযজ্ঞের শিকার। ১৯৯০ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ তিন যুগের ‘গুগল আর্থ’-এর হিস্টোরিক্যাল ইমেজের টাইম-সিরিজ বিশ্লেষণ করলে এই উপকূলীয় ও প্রাকৃতিক রক্ষাকবচের ক্রমক্ষয়িষ্ণু ও বিপন্ন রূপটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।

এ বিশ্লেষণের শুরুতেই একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। সোনাদিয়া দ্বীপের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পথচলা আজ প্রায় চার দশকের। কারণ আমার নিজের বাড়ি কক্সবাজার জেলার এ মহেশখালী উপজেলাতেই। শৈশবে, প্রাইমারিতে পড়ার সময়ই, মহেশখালী থেকে হেঁটে প্রথমবার সোনাদিয়া দ্বীপে পা রেখেছিলাম। সর্বশেষ গেছি ২০২৩ সালের শুরুতে; সেবারও মহেশখালী থেকে হেঁটেই সোনাদিয়া গিয়েছিলাম আর এর মাঝে নৌকা বা স্পিডবোটে করে গিয়েছি অনেকবার। ফলে দীর্ঘ চার দশক ধরে এই দ্বীপের ভাঙা-গড়া, সবুজের বিস্তার এবং তার অবক্ষয় আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। এই লেখার মূল উদ্দেশ্য যেহেতু একটি বস্তুনিষ্ঠ পরিবেশগত বিশ্লেষণ দাঁড় করানো, তাই এখানে আমার আবেগ বা নিজস্ব কোনো ব্যক্তিগত মতামত যোগ করা হয়নি। এর বিশ্লেষণ মূলত গুগল আর্থ ইমেজের বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে করা। তবে লক্ষণীয় এই যে, গুগল আর্থের হিস্টোরিক্যাল স্যাটেলাইট ইমেজে বছরের পর বছর ধরে যে বিবর্তন ও পরিবর্তনের চিত্র ধরা পড়েছে, মোটাদাগে তার সঙ্গে আমার চার দশকের প্রত্যক্ষ ও স্থানীয় অভিজ্ঞতার বেশ মিল রয়েছে। তিন যুগের তথ্য বিশ্লেষণে একটি বিষয় স্পষ্ট– যে বনটি যুগের পর যুগ ধরে আমাদের প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে রক্ষা করে এসেছে, আজ সে নিজেই মানুষের আগ্রাসনের সামনে অসহায়।

সবুজে ঘেরা আদিম রূপ এবং প্রাকৃতিক বৃদ্ধি (১৯৯০-২০০০): গুগল আর্থের ইমেজে ১৯৯০ ও তার পরবর্তী এক দশক সোনাদিয়ার রূপ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। অপেক্ষাকৃত আদিম-অক্ষত এক সবুজ ক্যানভাসে মোড়ানো ছিল দ্বীপের উত্তর ও পূর্ব প্রান্ত। এই দ্বীপের ঘটিভাঙ্গা ও কুতুবজোম সংলগ্ন এলাকাগুলো ছিল ঘন, নিরেট প্যারাবনে আবৃত। মহেশখালী চ্যানেলের গতিপথ এবং প্রাকৃতিকভাবে পলি জমার কারণে দ্বীপের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব দিকে নতুন নতুন কাদা-চর জেগে উঠছিল, যেখানে প্রাকৃতিকভাবেই ম্যানগ্রোভের বিস্তার ঘটতে দেখা যায়। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল যখন বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়টি এ উপকূলে আঘাত হেনেছিল, তখন এ প্যারাবনই মহেশখালী ও সংলগ্ন লোকালয়কে এক বিশাল প্রাকৃতিক দেয়ালের মতো আগলে রেখেছিল। সমুদ্রের তীব্র জলোচ্ছ্বাস এবং বাতাসের প্রলয়ংকারী গতিবেগকে নিজের বুকে শুষে নিয়েছিল এই বন। ঝড়ের আঘাতে বনের গাছপালা উপড়ে গিয়েছিল, লোনা পানির প্লাবনে বনের সবুজ পাতা ঝরে গিয়ে সাময়িকভাবে ধূসর রূপ নিয়েছিল। কিন্তু প্রকৃতির এক অদ্ভুত নিরাময় ক্ষমতা আছে। মানুষের হস্তক্ষেপ কম থাকায় এবং নিয়মিত জোয়ার-ভাটার পানি পাওয়ায় মাত্র দুই-তিন বছরের মধ্যে সেই ক্ষত কাটিয়ে বনটি আবার আগের মতোই ঘন সবুজ ও সতেজ হয়ে ওঠে।

চিংড়ি ঘেরের বিস্তার ও প্রাথমিক খণ্ডবিখণ্ডতা (২০০১ - ২০১৩): প্যারাবনের এই প্রাকৃতিক নিরাময় পর্বটি স্থায়ী হয়নি মানুষের কারণে। ২০০১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যবর্তী সময়ে সোনাদিয়ার বুকে মানুষের আঘাতের চিহ্ন স্যাটেলাইট ইমেজে দৃশ্যমান হয় জ্যামিতিক আকারে। এসব ইমেজে বনের ভেতরে চারকোনা চিংড়ি ঘের এবং লবণ মাঠের দাগ স্পষ্ট হতে শুরু করে। কুতুবজোম ও ঘটিভাঙ্গা অংশের গভীর বনে ছোট ছোট নালা ও কৃত্রিম বাঁধ তৈরি করে জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক পানি প্রবাহকে আটকে দেওয়া হয়। ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের বেঁচে থাকার মূল চাবিকাঠি হলো তাদের শ্বাসমূল, যা জোয়ারের সময় পানির নিচে থাকলেও ভাটার সময় মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেয়। এই পানি প্রবাহ কৃত্রিমভাবে আটকে দেওয়ায় বনের অভ্যন্তরে বড় বড় ‘সবুজ প্যাচ’ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে ধাপে ধাপে ধূসর ও সাদাটে লবণ মাঠ ও চিংড়ি ঘেরে পরিণত হতে থাকে, যা মোট বনের এক-দশমাংশেরও বেশি।

মেগা প্রজেক্ট ও দ্রুত ক্ষয়িষ্ণু বন (২০১৪-২০২১): ২০১৪ থেকে ২০২১ সালের সময়কালটি সোনাদিয়ার পরিবেশগত ইতিহাসের জন্য সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়। এই সময়ে মহেশখালী ও সোনাদিয়া অঞ্চলকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মেগা প্রজেক্ট, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং গভীর সমুদ্র বন্দরের প্রাথমিক অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ শুরু হয়। এসব মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় বাঁধ-সড়ক নির্মাণের ফলে বনের এক বিশাল অংশের প্রাকৃতিক পানি চলাচল স্থায়ীভাবে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। এর সুযোগ নিয়ে প্রভাবশালী চক্র শুরু করে প্যারাবন নিধনের মহোৎসব। গাছ কেটে বা পুড়িয়ে জমি দখল করে রাতারাতি গড়ে তোলা হয় নতুন নতুন ঘের ও বসতি। ২০২০-২১ সালের মধ্যে প্যারাবনের সংকুচিত রূপ স্যাটেলাইটে এতটাই স্পষ্ট হয় যে, ২০১৪ সালের তুলনায় বনের কভার আরও প্রায় এক-পঞ্চমাংশ মত হ্রাস পায়।

বর্তমানের বিপন্ন রূপ (২০২২-২০২৬): আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যখন আমরা বর্তমান স্যাটেলাইট ম্যাপের দিকে তাকাই, তখন ১৯৯০ সালের সেই আদিম সবুজের কোনো অস্তিত্বই আর খুঁজে পাওয়া যায় না। দীর্ঘ ৩৬ বছরে সোনাদিয়ার মূল চিরহরিৎ ম্যানগ্রোভ কভারের প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। একসময়ের অবিচ্ছিন্ন ও নিরেট বনটি আজ মানুষের তৈরি বাঁধ, সীমানা প্রাচীর, লবণের মাঠ আর চিংড়ি ঘেরের কারণে ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বা ‘প্যাচে’ পরিণত হয়েছে। যদিও দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে কিছু নতুন চর জেগে উঠেছে, কিন্তু সেখানে প্রাকৃতিকভাবে প্যারাবন তৈরি হতে হয়তোবা কয়েক দশক লেগে যাবে। বর্তমানে সেখানে কেবল কিছু ঝাউবন বা ঘাস জাতীয় উদ্ভিদের দেখাই মেলে, যা ধ্বংস হওয়া আদি ম্যানগ্রোভের ক্ষতিপূরণে একেবারেই অক্ষম।

সোনাদিয়ার এই সংকটাপন্ন প্যারাবন কেবল কিছু গাছের সমষ্টি নয়, এটি এই অঞ্চলের সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র, মাছের প্রজনন ক্ষেত্র এবং উপকূলীয় লাখো মানুষের জীবন-জীবিকার উৎস ও একটি প্রাকৃতিক নিরাপত্তা প্রাচীর। জলবায়ু পরিবর্তনের এই চরম যুগে যখন সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা দিন দিন বাড়ছে, তখন সোনাদিয়ার প্রাকৃতিক ঢালকে কেটে ছিন্ন-ভিন্ন করা প্রকারান্তরে নিজেদের ডেকে আনা আত্মহত্যার শামিল। আইনগতভাবে সোনাদিয়াকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন কতটা দুর্বল, তা সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং এ স্যাটেলাইট চিত্রগুলোই তার বড় প্রমাণ। অবিলম্বে কৃত্রিম বাঁধ ও পানি প্রবাহের প্রতিবন্ধকগুলো অপসারণ করে সোনাদিয়ার প্যারাবন অভ্যন্তরের জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক পথ উন্মুক্ত করা উচিত এবং স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর নজরদারির মাধ্যমে বন উজাড় করে গড়ে ওঠা অবৈধ ঘের ও লবণ মাঠ উচ্ছেদ করে পুনঃবনায়ন শুরু করা উচিত। প্রকৃতি আমাদের ১৯৯১ সালে বাঁচিয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে প্রকৃতিকে বাঁচানোর দায়িত্ব এখন আমাদের।

ড. হারুনুর রশীদ: অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
[email protected]

আরও পড়ুন

×