অর্থনীতি
নতুন অর্থবছরে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কতটা বাড়বে?
হাসান মামুন
হাসান মামুন
প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৬ | আপডেট: ০১ জুলাই ২০২৬ | ১০:৫০
| প্রিন্ট সংস্করণ
অর্থ বিল ২০২৬ পাসের মধ্য দিয়ে সরকার নতুন অর্থবছরে প্রবেশ করেছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব অনুযায়ী বেশ কিছু কর প্রস্তাবে সংশোধনী এনেছেন অর্থমন্ত্রী, যেগুলো নিয়ে সমালোচনা ছিল। আগেও কর প্রস্তাবে কিছু না কিছু সংশোধনী এনেই অর্থ বিল পাস হতো।
করমুক্ত আয়সীমা আরও কিছুটা বাড়ানোর ঘটনা মনোযোগ কাড়বে। মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতিতে এটি আরও বাড়ানোর দাবি ছিল। পরবর্তী অর্থবছরগুলোয় করমুক্ত আয়সীমার বিষয়েও প্রক্ষেপণ রয়েছে, যাতে মানুষ প্রস্তুতি নিতে পারে। ন্যূনতম করহার বাড়িয়ে দ্বিগুণ করার ঘটনাও নজর এড়াবে না। এতে নিম্ন-মধ্যবিত্তের জীবনেও চাপ বাড়বে। মূল্যস্ফীতির ওপরেও নির্ভর করছে এটি। বাজেটে এর যে লক্ষ্যমাত্রা, সার্বিক পরিস্থিতিতে তা অর্জনের আশা কমই। মূল্যস্ফীতি ইতোমধ্যে ডাবল ডিজিটের দিকে ধাবমান।
কর্মসংস্থান বাড়ানোর বড় অঙ্গীকার রয়েছে সরকারের। নির্বাচনী ইশতেহারেও এটি ছিল। কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে দেশ-বিদেশে। তরুণদের বড় অংশ বেকার। যারা কাজে আছে, তাদের আবার আয় কম। বিদেশেও কর্মজীবীরা আগের মতো রোজগার করতে ব্যর্থ। দেশ-বিদেশে বাজারের উপযোগী কর্মজীবীর সরবরাহ এখন বাড়াতে হবে। মানসম্মত কর্মসংস্থান হলে মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা হয়তো কিছুটা সহজ করা যাবে।
বাজেটে সরকার চেষ্টা করেছে বিনিয়োগের বাধাগুলো দূর করতে। এক অর্থবছরে সেটি অবশ্য কঠিন। তবে সরকারের নীতিগত অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তা ঘোষণার প্রবণতাও লক্ষ্য করা গেছে। তাতে উদ্যোক্তারা কিছুটা আশ্বস্ত। অর্থ বিলে স্থানীয় শিল্প সুরক্ষায় আরও কিছু কর ছাড় লক্ষণীয়। এমনকি সিগারেটের উপকরণে আরোপিত শুল্ক কমানো হয়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। উদ্দেশ্য, খাতটি যেন অনেক বেশি নিরুৎসাহিত না হয়। তাতে রাজস্ব আহরণও কমবে। সরকারে গেলে রাজস্ব বাড়াতে এমন কিছু ‘আপস’-এ যেতে হয়।
৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়নে অনেক বেশি রাজস্ব আহরণ করতে হবে। এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রাই ৬ লাখ কোটির টাকার বেশি। বিদায়ী অর্থবছরে তারা ৪ লাখ কোটি টাকার কিছু বেশি রাজস্ব সংগ্রহ করতে পেরেছে। নতুন অর্থবছরে তাহলে আরও প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি রাজস্ব আহরণ করতে হবে। এটি অসম্ভব বলেই মনে হয়। বরং হিসাব কষে দেখা দরকার, কর প্রস্তাবে ছাড়ের কারণে রাজস্ব কতটা কমবে। সরকার ক্ষুদ্র ব্যবসাকে করের আওতায় এনে কিছু রাজস্ব বাড়াতে চেয়েছিল। সেখান থেকেও তাদের সরে আসতে হয়েছে।
ব্যবসা সহজীকরণসহ যেসব পদক্ষেপ বাজেটে নেওয়া হয়েছে, তাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কি এতটাই বাড়বে যে, সেখান থেকে রাজস্ব অনেক বেশি আসবে? অর্থমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, দুই বছর লাগবে অর্থনীতিকে স্বাভাবিক ধারায় আনতে। এ লক্ষ্যে বেসরকারি খাতকে যেসব সুবিধা দেওয়া হয়েছে, তার সুফল পেতে সময় লাগবে। কর কাঠামোকে সহনীয় করার চেষ্টা লক্ষণীয়। তবে বিনিয়োগ বাড়াতে সুদের হার সহনীয় আর জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়াও জরুরি। হালে জ্বালানির দাম নতুন করে বেড়েছে। তাতে আবার ছিল ইরান যুদ্ধের প্রভাব।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বাজেটের বিষয় নয়; ব্যবসার জন্য জরুরি। অন্তর্বর্তী শাসনামলে শুধু আইনশৃঙ্খলা নাজুক থাকায় বিদ্যমান সক্ষমতারও সদ্ব্যবহার করা যায়নি। বেশ কিছু কলকারখানা বন্ধও হয়ে গিয়েছিল। নির্বাচিত সরকার আসতে দেরি হওয়ায় শিল্পে চলমান স্থবিরতায় খেলাপি ঋণও বেড়ে উঠেছে। সিংহভাগ ব্যাংক এই নিয়ে আছে সংকটে। অর্থ বিল পাসের দিন ব্যাংকে নগদ অর্থ ফেরাতে সুদ বাদে আসল পরিশোধ করে ঋণগ্রহীতাদের ‘এক্সিট’ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার খবর রয়েছে। এতে ব্যাংকের ঋণদান ক্ষমতা বাড়লে বিনিয়োগ বাড়ার আশা। সেটি না হয় কিছুটা হলো। কিন্তু নতুন ঋণ নিয়ে স্বস্তিতে বিনিয়োগে যাওয়ার পরিবেশ থাকবে তো উদ্যোক্তাদের?

কাজ হারানো অনেকে সন্ত্রাসে জড়াচ্ছে বলে খোদ পুলিশ জানিয়েছিল। সন্ত্রাস দমনে পুলিশকেও ঘুরে দাঁড়াতে হবে। বাড়াতে হবে তার লজিস্টিকস। এটি পোশাক পরিবর্তনের চেয়েও জরুরি। সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন শুরু হচ্ছে নতুন অর্থবছরে। পুলিশও এর সুফল পাবে। তবে এ কারণেই তাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সেবা মিলবে না। সে জন্য যেতে হবে পুলিশ সংস্কারে। এ ক্ষেত্রে অর্থ যত না, তার চেয়ে বেশি লাগবে সরকারের নবতর দৃষ্টিভঙ্গি। দেশে উগ্রবাদও বেড়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে। হালকাভাবে নিলে এর প্রভাব পড়তে পারে বিদেশি বিনিয়োগ ও বহিঃস্থ শ্রমবাজারে। প্রথমটি অতটা না হলেও দ্বিতীয়টির গুরুত্ব কিন্তু বিরাট।
দেশে অর্থবহ কাজের সুযোগ বাড়াতে পারলে অবশ্য সব দিক থেকেই ভালো। সেটি হতে পারে বেসরকারি খাতের টেকসই বিকাশ ঘটানো গেলে। বন্ধ কলকারখানা চালুতে ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের ঘোষণা রয়েছে। স্বল্প সুদে ঋণ জোগানোর এমন কর্মসূচি সফল করা অবশ্য কঠিন। এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা খারাপ বলে সতর্কতায় জোর দেওয়া হচ্ছে। চালু কারখানা সচল রাখা নিশ্চয় এর চেয়ে জরুরি। কিছু সুপরিচিত শিল্পগোষ্ঠী সংকটে পড়ার খবরে বন্ধ কারখানা চালুর বিষয়ে আশাবাদী হওয়া কিন্তু কঠিন। শেষে না ভর্তুকিটাও আটকা পড়ে! উন্নয়ন প্রকল্প নির্বাচনের মতো এ ক্ষেত্রেও যাচাই-বাছাই জরুরি। সচল প্রতিষ্ঠানগুলোও কিন্তু চাইছে সহনীয় সুদে ঋণ। এর মধ্যে রয়েছে অনেক মানুষকে কাজ দেওয়া এসএমই খাত। ভালো পারফর্ম করা কৃষিও কিন্তু অধিকতর সহায়তার দাবিদার।
নিবন্ধটি লেখার সময় নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণার খবর মিলল। মূল্যস্ফীতি সহনীয় রাখতে বাজেটীয় পদক্ষেপের সঙ্গে মুদ্রানীতির সমন্বয় ঘটানোর ওপর জোর দেওয়া হয়ে থাকে। অন্তর্বর্তী শাসনামলে ‘কঠোর মুদ্রানীতি’র প্রয়োগ মূল্যস্ফীতি কমাতে পেরেছিল, এটা অনস্বীকার্য। মোটের ওপর সেই মুদ্রানীতিই অনুসৃত হবে বলে মনে হচ্ছে। নীতি সুদহার না কমার অর্থ, ব্যাংকে সুদের হার হ্রাসের সম্ভাবনা কম। এটি করা হচ্ছে মূলত মূল্যস্ফীতি কমাতে। এতে আবার প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা মার খাবে। এটিকে ৪ থেকে এক টানে ৬.৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা তো আকাশকুসুম। রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাও যেমন!
এ অবস্থায় সরকারকে আরও বেশি ঋণনির্ভর হতে হবে। ব্যাংকব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতা বাড়বে আরও; যদিও উন্নয়ন সহযোগীরা সরকারের প্রতি বিরূপ নয়। আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচিতে যাচ্ছে সরকার। তবে শর্তগুলো অপরিবর্তিত। সেগুলোর পরিপালনে নতুন করে সময় মিলবে অবশ্য। বিশ্বব্যাংক, এডিবি থেকে ঋণ ভালোই পাচ্ছে সরকার। তাতে রিজার্ভ আরও বেড়ে ওঠার খবর রয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ জোরালো থাকায় সরকার রিজার্ভ নিয়ে স্বস্তিতে। তবে বিনিয়োগ বাড়লে এতে চাপ বাড়বে। ডলারে দায়দেনা পরিশোধও বাড়বে সামনে। এ অবস্থায় শুধু রিজার্ভ চাঙ্গা রাখতে নয়; কর্মসংস্থানের দিক থেকেও রপ্তানি খাতকে দুর্বল হতে দেওয়া যাবে না।
প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে এডিপি নেওয়া হয়েছে নতুন অর্থবছরে। এর মানসম্মত বাস্তবায়নে জোর থাকতে হবে বাজে অভিজ্ঞতা থেকে বেরোনোর জন্যও। বিনিয়োগ সহায়ক প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে বিশেষ দৃষ্টি থাকতে হবে। ‘শেষ সময়ের বাস্তবায়নে’ যেন নির্জলা অপচয় না বাড়ে, সেদিকেও দৃষ্টি থাকুক। এডিপি বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে বেসরকারি খাত চাঙ্গা হওয়ার। তাতে দুই দিকেই কর্মসংস্থান বাড়ার কথা। পাশাপাশি জোর থাকতে হবে সামাজিক সুরক্ষায়। এর ব্যয় টার্গেট গ্রুপের কাছে পৌঁছানোও বরাবরের চ্যালেঞ্জ।
হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক
- বিষয় :
- হাসান মামুন
