শিশু ও সুরক্ষা
স্ক্যাবিসের ভয়াবহতা দীর্ঘ মেয়াদের
গওহার নঈম ওয়ারা
গওহার নঈম ওয়ারা
প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২১ | আপডেট: ০১ জুলাই ২০২৬ | ১০:৫১
| প্রিন্ট সংস্করণ
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন জায়গায় আবার স্ক্যাবিসের মতো ছোঁয়াচে রোগটি ছড়ানোর খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে বিভিন্ন আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রোগটি নতুন সংকটের সৃষ্টি করছে। খুবই ছোঁয়াচে প্রকৃতির এবং ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা আছে ‘সারকোপটিস স্ক্যাবিয়া’ নামে এই আণুবীক্ষণিক পরজীবী বা মাইটের। এর প্রধান লক্ষণ হলো শরীরে চুলকানি ও দানা বা বিচির মতো র্যাশ ওঠা। এটি স্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়। স্ক্যাবিসের জীবাণু সারাবছরই প্রজনন করতে পারে, তবে গরম ও আর্দ্র পরিবেশে প্রজনন দ্রুততর হয়। দ্রুত সংক্রমণ ক্ষমতাসম্পন্ন এই রোগ আরও গুরুতর হওয়ার আগেই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কেননা, এটি শুধু সাধারণ চুলকানি নয়। এখান থেকে হতে পারে কিডনি অকার্যকর হওয়ার মতো বিপদ।
এ জন্য প্রাথমিক লক্ষণে বুঝতে হবে স্ক্যাবিসের সংক্রমণ হয়েছে কিনা। যেমন এই রোগে প্রথমেই ত্বকের নানা জায়গায় পানি পানি দানা বা বিচি দেখা দেয়। যেখানে চুলকালেই দ্রুত শরীরের অন্য জায়গায় ছড়িয়ে যায়। পরিবারের কেউ আক্রান্ত হলে দ্রুত অন্যদের মধ্যেও সংক্রমণ হয়। সাধারণত আঙুলের ফাঁক, ত্বকের ভাঁজ, বুক-পিঠ, বগলসহ শরীরের যে কোনো ঢেকে থাকা স্থানে দেখা দেয়। শিশুদের ক্ষেত্রে ঘাড়, মাথার তালু, মুখ, হাতের তালু ও পায়ের পাতার নিচেও হয়ে থাকে।
এ প্রসঙ্গে প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক চিকিৎসক এম আর খানের সঙ্গে থাকা স্মৃতি মনে পড়ল। একদিন তাঁর কাছে বসে ছিলাম কাজের সূত্রে। এম আর খান বললেন, ‘এই রোগ (স্ক্যাবিস) সময়মতো ঠেকাতে না পারলে শিশুদের কিডনি খেয়ে ফেলতে পারে।’ সেদিন চিকিৎসা নিতে আসা শিশুদের মধ্যে দীর্ঘদিনের চুলকানি বা স্ক্যাবিসের উপসর্গে কাতর শিশুরাও ছিল। এম আর খান বললেন, ‘বাংলাদেশে হঠাৎ স্ক্যাবিস বা খোস-পাঁচড়া বেড়ে যাওয়ার কারণ ঘনবসতি আর খাসলত। এত গাদাগাদি করে থাকলে এসব কমবে না। একাত্তরের কথা মনে আছে। শরণার্থী শিবিরে চোখ ওঠা আর চুলকানি সকলকেই ছুঁয়েছিল। চোখ
ওঠার নামই হয়ে গিয়েছিল ‘জয় বাংলা’।
তিনি বলেন, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার জন্য আমরা যেসব সামগ্রী ব্যবহার করি, তা সব কমন। ব্যক্তিগত জিনিসপত্র যেমন– চাদর, বালিশ, গামছা, তোয়ালে, চিরুনি, লুঙ্গি ভাগাভাগি করার অভ্যাস হচ্ছে ‘খাসলত’। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একই গামছা, চিরুনি ব্যবহার, মসজিদের অজুখানার বারোয়ারি গামছা থেকে শুরু করে স্যালুনের চাদর, তোয়ালে সবই ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতায় বাধা। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার দিকে মন না দিলে চুলকানি দ্রুত ছড়িয়ে পড়া কখনও বন্ধ হবে না বলে মন্তব্য করেছিলেন এম আর খান।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, দরিদ্র ও ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ১০ শতাংশ কিডনি জটিলতার ঝুঁকিতে থাকে। সরাসরি স্ক্যাবিসের জীবাণু (মাইট) কিডনিতে না প্রবেশ করলেও স্ক্যাবিসের কারণে সৃষ্ট সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়ার ফলে কিডনি ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
স্ক্যাবিস থেকে কিডনির সংক্রমণ হয় কয়েকটি ধাপে। যেমন– তীব্র চুলকানি। এরপর নখ দিয়ে চুলকানোর ফলে চামড়া ফেটে যাওয়া, ক্ষতস্থানে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ, শরীরে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি ও ব্যাকটেরিয়ার যুদ্ধ, রক্তের মাধ্যমে এসব উপাদান কিডনির ছাঁকনিতে আটকে যাওয়া, কিডনিতে তীব্র প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন এবং কিডনি বিকল বা অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরি। পাশাপাশি কিডনিতে সংক্রমণ হলে যা ঘটে সে বিষয়গুলোও মনে রাখা প্রয়োজন। স্ক্যাবিস হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর যদি চোখ ও মুখ ফুলে যায়, বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর চোখ ও মুখ অতিরিক্ত ফোলা মনে হয়; প্রস্রাবের রং গাঢ় চা বা কোকা-কোলার মতো কালো/লালচে হয়; প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যায়; হঠাৎ রক্তচাপ অস্বাভাবিক বেড়ে যায় এবং পা বা গোড়ালি ফুলে গেলে আশঙ্কা করতে হবে কিডনির সংক্রমণ ঘটেছে। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না পেলে এই সাময়িক কিডনি বিকল হওয়া থেকে পরে দীর্ঘ মেয়াদের কিডনি রোগ হতে পারে।
অনেকেই রোগটি সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে বা চিকিৎসককে না দেখিয়ে নিজেই কিছু ক্রিম ব্যবহার করে এ রোগ আরও জটিল করেন। তাই চুলকানি, ফুসকুড়ি যা-ই হোক, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি এবং আগে থেকেই সচেতন হতে হবে। স্ক্যাবিস থেকে বাঁচতে আক্রান্ত ব্যক্তির কাপড়চোপড় ও বিছানার চাদর অন্তত ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস গরম পানিতে ধুয়ে কড়া রোদে শুকাতে হবে। লক্ষণ দেখা মাত্রই চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে পরিবারের সবাইকে একযোগে লোশন বা ওষুধ ব্যবহার করতে হবে। স্ক্যাবিস চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধের জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা মেনে চলা জরুরি। যে পরজীবীর মাধ্যমে এটি ছড়ায়, সেটি কাপড়চোপড়, বিছানার চাদর, বালিশ ও ব্যবহার্য জিনিসপত্রে থেকে যেতে পারে। পরবর্তী সময়ে সেটি আবার সংক্রমিত করতে পারে। স্ক্যাবিস বা চুলকানি নিয়ে শিশু খেলতে যাচ্ছে, স্কুলে যাচ্ছে বলে আমাদের মধ্যে এই ভয়াবহ অসুখটা নিয়ে কোনো হোলদোল নেই। ডেঙ্গু বা রুবেলা হামের মতো এখনই মারা যাওয়ার ঝুঁকি নেই বলে চিকিৎসার জন্য আমরা উতলা হই না। মনে করি, এমনিই সেরে যাবে। সারে না, ঘুরেফিরে আসে। পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হয়। দ্য ল্যানসেট এবং এ-সংক্রান্ত অন্যান্য বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এই জটিলতাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এটি দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই স্ক্যাবিসের ধারাবাহিক চিকিৎসার বিকল্প নেই।
গওহার নঈম ওয়ারা: শিশু সুরক্ষাকর্মী
