করোনাভাইরাস
হোম বনাম প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন
সালাহ্উদ্দিন নাগরী
প্রকাশ: ২২ মার্চ ২০২০ | ১৪:২৬
করোনাভাইরাসের সুবাদে 'কোয়ারেন্টাইন' শব্দটির সঙ্গে প্রায় সবাই পরিচিত হয়ে গেছে। কোয়ারেন্টাইন শব্দের অর্থ সঙ্গরোধ বা সঙ্গরোধ করে রাখা। কেউ যদি কোনো রোগে আক্রান্ত হয় এবং সে রোগ যদি ছোঁয়াচে বা সংক্রামক হয়, তখন ওই রোগের বিস্তার রোধে সে রোগীকে অন্যদের কাছ থেকে দূরে রাখার জন্য এই ব্যবস্থা।
করোনাভাইরাসের মরণ ছোবলে ইতালির পুরো জনগোষ্ঠীকেই হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। পৃথিবীর কসমোপলিটন শহরগুলোতে ভুতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করছে। হোম কোয়ারেন্টাইন কার্যকর করার জন্য ফিলিপাইনসহ অনেক দেশে কারফিউ জারি করা হয়েছে। করোনাভাইরাস থেকে মুক্ত থাকতে বিশ্বজুড়েই স্বেচ্ছা নিঃসঙ্গতায় যাচ্ছেন লাখ লাখ মানুষ।
বাংলাদেশে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে। সংক্রমণ রোধে গত ২১ জানুয়ারি বিভিন্ন পথে বিদেশফেরত ব্যক্তিদের নজরদারিতে রাখা ও তাদের অনেককে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশনা রয়েছে। এ বিষয়ে তথ্য অধিদপ্তরের ১৫ মার্চের অনুশাসনে বলা হচ্ছে- বাড়ির অন্য সদস্যদের থেকে আলাদা থাকুন, সম্ভব না হলে অন্যদের থেকে অন্তত এক মিটার দূরে থাকুন, ঘুমানোর জন্য পৃথক বিছানা ব্যবহার করুন।
বিদেশফেরত যারা হোম কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন, তারা কি সঙ্গরোধ করছেন এবং অন্যরা কি তার থেকে তফাতে অবস্থান করছেন? আমাদের দেশে বাসাবাড়ির ধরন, পারিবারিক কাঠামো, আর্থ-সামাজিক অবস্থা হোম কোয়ারেন্টাইনকে কতটুকু সমর্থন করে? শহরে একটি ভবনের গা ঘেঁষে তৈরি হওয়া আরেকটি ভবনের মাঝখানে অনেক সময় ৬ ফুট জায়গাও থাকে না। বাসার একটি রুমে স্বামী-স্ত্রী, আরেকটিতে সন্তান-সন্ততি থাকে। রুমগুলো এতটাই ছোট যে- একটি খাট, একটি আলমারি রাখার পর ঘাড় ঘুরানোর জায়গাও থাকে না।
একইভাবে পল্লি অঞ্চলের বাসাবাড়িগুলোর একই আঙিনার চারদিকে হয়তো একটি করে ঘর তোলা আছে, প্রত্যেক ঘরই কাজে ব্যবহূত। যে মানুষটি বিদেশে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে পুরো পরিবারের ভরণপোষণ চালিয়ে যাচ্ছেন, তার ভাগের রুমটিতে তার স্ত্রী-সন্তান বসবাস করছেন। প্রবাসফেরত ব্যক্তিটিকে ওই রুমেই তাদের সঙ্গে থাকতে হচ্ছে। আলাদা রুমের ব্যবস্থা করার কোনো উপায় নেই। আমাদের আবহমান গ্রামবাংলার এটাই সাধারণ চিত্র। কোয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যক্তির থালা-বাসন, কাপড়-চোপড় আলাদাভাবে রাখা ও ধোয়ার জন্য বলা হয়েছে। যে বাসায় রান্নাঘর, বাথরুমে ঠিকভাবে একজন মানুষের দাঁড়ানোর জায়গাই থাকে না, সেখানে উপরোক্ত নির্দেশনা অনুসরণের সুযোগ ও সক্ষমতা কোথায়?
কোয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যক্তিরা এলাকা, পাড়া-মহল্লার চায়ের দোকানে বসছে, অন্যদের সংস্পর্শে আসছে, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হলেও এ ধরনের ঘটনা সবখানেই ঘটছে। শহরের রাস্তার মোড়গুলোতে যেখানে আরেকজনের গায়ে ধাক্কা লাগা ছাড়া হাঁটা যায় না, সেখানে জনসমাগম বাদ দিলেও সাধারণ চলাফেরাতেই ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে। আবেগপ্রবণ জাতিকে হ্যান্ডশেক, কোলাকুলি ও পা ছুঁয়ে সালাম করা থেকে বিরত রাখা যাচ্ছে না। হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার কারণেই তারা এ ধরনের নিয়ম ভঙ্গের সুযোগ পাচ্ছে।
বিদেশের উন্নত দেশগুলোর বাসাবাড়ি বড়, সদস্যসংখ্যাও কম, তাদের পক্ষে একটা রুম কারও জন্য ছেড়ে দেওয়া যতটা সহজ, আমাদের এখানে সেটা অতটা সহজ নয়। তাই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের পর্যায়ভুক্ত সিংহভাগ মানুষের বাসাবাড়িতে সঙ্গরোধ করে রাখাটা কতটুকু কার্যকর হচ্ছে বা হবে, তা অবশ্যই ভেবে দেখতে হবে।
দেশের ১৬ কোটি মানুষের সবার প্রতি একসঙ্গে সমমনোযোগ দেওয়া কোনো সরকারের পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়। তাই ব্যক্তি সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা সবাইকে এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নির্দেশনাবলি পালনে আন্তরিক ও অন্যদেরও এ ব্যাপারে সহযোগিতা প্রদান করতে হবে। একই সঙ্গে হোম কোয়ারেন্টাইন অপেক্ষা প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা জরুরি ভিত্তিতে আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
সরকারি চাকরিজীবী
[email protected]
- বিষয় :
- করোনাভাইরাস
- সালাহ্উদ্দিন নাগরী
