খোলা চিঠি
করোনা মহামারি মোকাবিলায় সমন্বিত ব্যবস্থা চাই
আহত শেখ রহমত আলী- সমকাল
--
প্রকাশ: ২২ মার্চ ২০২০ | ১৪:২৮ | আপডেট: ২২ মার্চ ২০২০ | ১৪:৫৩
লেখক: আনু মুহাম্মদ, তানজীমউদ্দিন খান, মোশাহিদা সুলতানা, বীথি ঘোষ, অমল আকাশ, সায়েমা খাতুন, সামিনা লুৎফা, মাহা মির্জা, মিজানুর রহমান, সিউতি সবুর, সাঈদ ফেরদৌস, লুবনা মরিয়ম, রুশাদ ফরিদী, গোলাম মোর্তজা, ফারজানা ওয়াহিদ শায়ান, রেহনুমা আহমেদ, নাজনীন শিফা, ড দীনা এম সিদ্দিকী, মুক্তশ্রী চাকমা, খুশী কবির, কাজলী শেহরীন ইসলাম, রোবায়েত ফেরদৌস, সুলতানা কামাল, অরূপ রাহী, সৌভিক রেজা, নাসরীন খন্দকার, আজফার হোসেন, আইনুল ইসলাম, নায়লা আজাদ, আলী রীয়াজ, শহিদুল আলম, রেজাউর রহমান লেনিন, ইফতেখারুজ্জামান, বদিউল আলম মজুমদার, জোবাইদা নাসরীন, মীর্জা তাসলিমা সুলতানা, শাহীন আনাম, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, গীতি আরা নাসরীন, অবন্তী হারুন, মানস চৌধুরী, বীণা ডি'কস্টা, রিদওয়ানুল হক, আনিসুল ইসলাম হিরু, নোভা আহমেদ, লুৎফুর রহমান, সাদাফ নূর, লুৎফুন হোসেন, নুসরাত চৌধুরী, শিল্পী বড়ূয়া, মাইদুল ইসলাম, রোজিনা বেগম, কল্লোল মোস্তফা, জ্যোতির্ময় বড়ূয়া, হাফিজউদ্দীন খান, আইনুন নাহার, সৌম্য সরকার, কাজী মারুফুল ইসলাম, ফাহমিদুল হক, অমিতা চক্রবর্তী, আরমান হোসেন, হামিদা হোসেন
কভিড-১৯ ভাইরাস অতি দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে তা বৈশ্বিক মহামারিতে রূপ নিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাপকাঠিতে করোনা সংক্রমণের যে চারটি স্তরের কথা বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এর তৃতীয় স্তরে প্রবেশ করেছে। অর্থাৎ দেশের ভেতরেই এই রোগ কমিউনিটি সংক্রমণের পর্যায়ে ঢুকে পড়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। চতুর্থ স্তরটি হলো, ব্যাপক সংক্রমণ ও ব্যাপক মৃত্যু। চীন, ইরান, ইতালি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি থেকে আমরা পরিস্কার ধারণা করতে পারি যে, কীভাবে অতি দ্রুত জ্যামিতিক গতিতে এই মহামারি দাবানলের মতো সারাদেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, দুই মাস সময় পেলেও সরকার সমস্যার দিকে যথাযথ মনোযোগই দিতে পারেনি। উপদ্রুত দেশগুলো থেকে দেশে প্রত্যাবর্তনকারী প্রবাসী ভাইবোনদের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণে কোয়ারেন্টাইন করার সরকারি ব্যর্থতা দেশকে কত বড় বিপদে ফেলতে পারে! ঘন জনবসতি, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এবং সরকারের উদ্যোগহীনতায় বাংলাদেশ এখন প্রচণ্ড ঝুঁকির মুখে। মহাবিপদ মোকাবিলায় প্রস্তুতি ও সমন্বয় অপর্যাপ্ত, আক্রান্ত রোগী শনাক্তকরণের পর্যাপ্ত উপকরণ ও ব্যবস্থাপনা দেশে নেই; নেই চিকিৎসকদের রক্ষা ব্যবস্থা; নেই যথেষ্ট মাস্ক, স্যানিটাইজার ও ভেন্টিলেটর!
এই বৈশ্বিক ভয়ংকর মহামারির সময় দেশের হাসপাতাল, চিকিৎসালয় ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার বিরাজমান দুর্বলতা অনুধাবন করে দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। জাতির মহাবিপদের মুহূর্তে দুর্যোগ মোকাবিলার কোনো সমন্বিত উদ্যোগ না নিয়ে উল্টো বাস্তবতা অস্বীকারের প্রবণতা এবং বিভিন্ন মন্ত্রীর বিভ্রান্তিকর মন্তব্য, যা আমাদের গভীরভাবে চিন্তিত, ক্ষুব্ধ ও হতাশ করে। বিভিন্ন ছাত্র-যুব সংগঠনসহ স্বেচ্ছাসেবী ব্যক্তি ও সংগঠনের দায়িত্বশীল কাজই এখন পর্যন্ত আমাদের ভরসা। কিন্তু এসব উদ্যোগ সমন্বয়েরও কোনো আগ্রহ সরকারের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না।
এত বড় মাপের একটি মহামারি সামাল দেওয়ার জন্য সঠিক ও সমন্বিত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। আমরা চাই, সরকার আর কালক্ষেপণ না করে অবিলম্বে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় করে, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, পরিবেশবিদ ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞমণ্ডলীর সমন্বয়ে একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করবে। এই মহাপরিকল্পনা কার্যকর করার জন্য দেশের নাগরিকদের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধি নিয়ে একটি স্বাধীন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মাল্টি-ফাংশনাল ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করতে হবে, যারা নিয়মিতভাবে সরকারের কাজের তদারকি করবে, দিকনির্দেশনা প্রদান করবে এবং সব নাগরিককে প্রকৃত তথ্য জানাবে। এর জন্য তথ্য ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
উদ্বিগ্ন নাগরিক হিসেবে সরকারের প্রতি আমাদের আরও আশু দাবি হচ্ছে : ১. অবিলম্বে শ্বেতপত্রের মাধ্যমে করোনা মহামারি রোধের পরিকল্পনা ও তা কার্যকর প্রণালি জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। ঢাকাসহ প্রতিটি জেলা-উপজেলায় কতজন স্বাস্থ্যকর্মী আছেন এবং তাদের সুরক্ষার পর্যাপ্ত সরঞ্জাম কবে পর্যন্ত নিশ্চিত করা যাবে, প্রতিটি হাসপাতালে সর্বোচ্চ কতটি বেড প্রস্তুত করা যাবে, প্রতিটি হাসপাতালে কতটি ভেন্টিলেটর প্রস্তুত আছে, করোনা পরীক্ষার কতগুলো কিট আছে, প্রতিদিনের ব্যবহারের মানসম্মত গ্লাভস, মাস্ক ইত্যাদির মজুদ কতদিনের মধ্যে নিশ্চিত করা যাবে- এসব তথ্য প্রকাশ করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এই কাজে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যথাযথ বরাদ্দ দিতে হবে এবং নিয়মিত তা স্বচ্ছতার সঙ্গে জনগণকে জানাতে হবে।
২. অবিলম্বে দেশের সর্বত্র বিনামূল্যে টেস্ট করার জন্য প্রয়োজনীয় কিটসহ বিভিন্ন সামগ্রী সরবরাহ এবং তার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। মাস্ক, সাবান, স্যানিটাইজার জোগান নিশ্চিত রাখতে হবে। কিট তৈরির কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে দ্রুত খালাস ও ট্যাক্স মওকুফের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৩. দেশের সব প্রবেশপথ- বিমান, নৌ, স্থলবন্দর, রেলস্টেশন, নৌঘাট সতর্ক নজরদারির আওতায় নিতে হবে। অবিলম্বে করোনা সংক্রমণের সময় আক্রান্ত দেশগুলো থেকে ফিরে আসা আগত প্রবাসীদের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে সম্ভাব্য বা ইতোমধ্যে আক্রান্ত অঞ্চলের মানচিত্র তৈরি বা ম্যাপিং করতে হবে। গুরুত্ব অনুযায়ী অঞ্চলভিত্তিক জরুরি ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশের ভেতর কক্সবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ পর্যটন গন্তব্যগুলো বন্ধ করে দিতে হবে।
৪. কোয়ারেন্টাইনের জন্য ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে দূরে বড় হোটেল-মোটেল-রিসোর্টসহ উপযোগী ভবনগুলো অস্থায়ীভাবে ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট করতে হবে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্টেডিয়াম, জিমনেশিয়াম, খালি ভবনে অস্থায়ী হাসপাতাল নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনায় সেনাবাহিনীকে যুক্ত করা সম্ভব। সিএমএইচ, বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে সমন্বিত পরিকল্পনায় যুক্ত করতে হবে।
৫. অতি দ্রুত ডাক্তার-নার্স-চিকিৎসা কর্মীসহ সব স্বাস্থ্যকর্মীর নিরাপদ পোশাক ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করতে হবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য দ্রুত প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে হবে। দেশের গার্মেন্ট কারখানা ব্যবহার করে স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে পিপিই (পারসোনাল প্রটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট) সরবরাহ করতে হবে।
৬. গণপরিবহন ও গণপরিসরগুলো এবং সংক্রমণের হটস্পট নিয়মিত জীবাণুমুক্ত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। জেলখানার ঝুঁকিপূর্ণ জনচাপ দূর করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে, জনচাপ কমাতে বিনা বিচারে আটক, মেয়াদোত্তীর্ণদের মুক্তি দিতে হবে। ছিন্নমূল ভাসমান মানুষের জন্য নিরাপদ স্থানে আশ্রয় শিবির খুলে তাদের সরিয়ে নিতে হবে। গাদাগাদি বাস করা বস্তিবাসীদের নিরাপত্তায় প্রতিটি বস্তিতে পরিচ্ছন্নতার উপকরণ সরবরাহ এবং করোনা মনিটর সেল-ক্যাম্প স্থাপন করতে হবে। রোহিঙ্গা আশ্রয়কেন্দ্রেও অনুরূপ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে।
৭. করোনা সংক্রান্ত জরুরি কাজ ছাড়া পোশাক কারখানাসহ বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকদের আপদকালীন সময়ে সবেতন ছুটি দিতে হবে। ছুটিকালীন শ্রমিকদের মজুরি যাতে ঠিকমতো পরিশোধ হয়, সরকারকে তা নিশ্চিত করতে হবে।
৮. নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মজুদদারি বন্ধ করে ন্যায্যমূল্যে বিক্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। নিম্ন আয়ের ও রোজগার হারানো মানুষের জন্য রেশনিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। অতি বিপন্ন মানুষ, যেমন- উদ্বাস্তু, দিনমজুর, রিকশাওয়ালা, বস্তিবাসী, কারখানার শ্রমিক, অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি, ছোট ব্যবসায়ী, যাদের জীবিকা হুমকির মুখে, তাদের জন্য বিশেষভাবে অর্থনৈতিক সুরক্ষা প্রদান করতে হবে। এ সুযোগে ঋণখেলাপিদের কোনো বাড়তি সুবিধা দেওয়া যাবে না।
৯. বিশেষজ্ঞ, স্বাস্থ্যকর্মী, ধর্মীয় নেতাদের সাহায্যে পাড়ায় পাড়ায় স্থানীয় ক্লাব, সংগঠন ও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ ও পর্যাপ্ত সরঞ্জাম প্রদান করে তাদের প্রচার ও রোগ প্রতিরোধে কাজের সুযোগ দিতে হবে।
১০. এর পাশাপাশি ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া মোকাবিলায় সরকারের কী পরিকল্পনা, তা প্রকাশ করতে হবে। বর্ষা আসার আগেই আমাদের ডেঙ্গুতে মৃত্যু রোধ করার প্রস্তুতিও শেষ করতে হবে, যেটি একই কমিটি থেকে পরিচালিত হতে পারে।
শুধু এই সময়ের করোনাভাইরাস নয়, বাংলাদেশে উন্নয়ন ও সম্পদ কেন্দ্রীভবনের ধারা, নদী-বন-বায়ু বিনাশ আমাদের এমনিতেই বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এ দেশকে নিরাপদ বাসভূমি হিসেবে গড়ে তুলতে গেলে প্রাণপ্রকৃতিবিনাশী উন্নয়ন ধারা বদলাতে হবে, সর্বজনের (পাবলিক) চিকিৎসা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। এসবের গুরুত্ব এই বৈশ্বিক মহামারিকালে আমরা আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করছি।
লেখকবৃন্দ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, সাংবাদিক, লেখক, অ্যাক্টিভিস্ট, মানবাধিকার ও সংস্কৃতিকর্মী
- বিষয় :
- খোলা চিঠি
