ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের নেতৃত্ব যেমন হতে পারে

ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের নেতৃত্ব যেমন হতে পারে
×

এমাজউদ্দীন আহমদ

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০১৯ | ১৩:৩০

বিশ্বব্যাংকের ধারণায়- ২০২০ সালে সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, ফ্রান্স ও তাইওয়ান। এ দশটি রাষ্ট্রের সাতটিই এশিয়ার। সাতটিই বর্তমানে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত গতিশীল। সাতটিই রয়েছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূরাজনৈতিক অবস্থানে। কোনো রাষ্ট্র একবার অর্থনৈতিক পেশি অর্জন করলে তার পক্ষে সামরিক শক্তি অর্জন অত্যন্ত সহজ ও স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং অনুমান করতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয় না, একুশ শতকে এ দশটি রাষ্ট্র বিশ্বের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, এমনকি সামরিক কর্মকাণ্ডের নাটকে নাম ভূমিকায় থাকবে। রঙ্গমঞ্চ হবে ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল, বিশ শতকে যেমনটি ছিল ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরীয় এলাকা।

বাংলাদেশের অবস্থা কেমন হবে? আমার মনে হয়েছে, এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকবে না। দীর্ঘদিন পরে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থানে বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন এসেছে। বহুদিন পরে এক ধরনের 'ব্যাকওয়াটার' বা সাধারণ অবস্থা থেকে একুশ শতকের মহাসমারোহে যোগ দেওয়ার পর্যায়ে বাংলাদেশ ক্রমে ক্রমে এগিয়ে আসছে। দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগ ক্ষেত্র হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ অবস্থানের সুযোগ গ্রহণ করতে পারলে বাংলাদেশ নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করবে বলে আমাদের বিশ্বাস। ভারত-চীন-থাইল্যান্ড-ইন্দোনেশিয়ার সন্ধিস্থলে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ সৃজনশীল কূটনীতির মাধ্যমে শুধু নিজের অবস্থা পরিবর্তন করবে না, অন্যান্য বৃহৎ শক্তির গতিবিধিও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হতে পারে।

একুশ শতকে প্রতিযোগিতা হবে মেধার, পেশির নয়। এ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হতে হলে প্রয়োজন হবে সৃজনশীল মস্তিস্কের, বিরাট বপুর নয়। প্রয়োজন হবে উদার হৃদয়ের, আকাশছোঁয়া অন্তঃকরণের। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের প্রস্তুতি কতটুকু? অগ্রবর্তী চিন্তাভাবনা? একুশ শতকে বাংলাদেশের অগ্রগতির ধারা ও মাত্রা নির্ভর করবে এই সমাজের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রকৃতির ওপর। রাজনৈতিক নেতৃত্বের স্বরূপ তো আমরা জানি। এ ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসা একান্ত প্রয়োজন।

দীর্ঘদিন পরে ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে পুনঃপ্রবর্তিত হয়েছে সংসদীয় গণতন্ত্র। সংসদের কাছে দায়ী মন্ত্রিপরিষদের প্রধান হয়েছেন রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। বাংলাদেশ রাজনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে রাজনৈতিক দল ফিরে পেয়েছে তার হূতগৌরব। দেশের রাজনৈতিক দলগুলো কীভাবে সংগঠিত এবং সৃষ্টিশীল নেতৃত্বের গুণে জড়িত তার ওপরই নির্ভর করবে একুশ শতকে বাংলাদেশের অগ্রগতির ধারা ও মাত্রা। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক দল অচ্ছেদ্য এক স্বর্ণসূত্রে আবদ্ধ। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটিকে সঠিকভাবে অনুধাবন প্রায় অসম্ভব। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে দুই-ই হয় ধন্য। সমাজে উন্নত জীবনবোধ প্রতিষ্ঠা দুয়েরই লক্ষ্য। সংস্কৃতি ক্ষেত্রে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা দুয়েরই ভিত্তি। ভবিষ্যতের সুখ-স্বপ্নে উভয়ই উদ্বেল। রাজনৈতিক দল যদি উন্নত চিন্তাভাবনায় সচকিত না হয়, তাহলে গণতন্ত্রে কেন, সমাজ জীবনেও নেমে আসে ব্যর্থতার ঘন কুয়াশা। লোভ-প্রতিহিংসা-অসহিষুষ্ণতার মরুভূমিতে গণতন্ত্র যেমন পথ হারায়, রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিকাশের পথও তেমনি হয় রুদ্ধ। গণতন্ত্রের সবুজ উদ্যানেই প্রস্ম্ফুটিত হয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের লাল গোলাপ আর এ লাল গোলাপই একুশ শতকের মহান উদ্যোগে বাংলাদেশকে দান করতে পারে তার যথার্থ স্থান।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক নেতৃত্ব অতীতমুখী। ভবিষ্যতের দাবি কিন্তু ভিন্ন। অতীতকে শুধু স্মরণ রাখাই যথেষ্ট। এর বেশি কিছু নয়। বর্তমানই হলো আসল। ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্ন চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর এ চেতনা জাগ্রত হয়নি। শুধু অক্ষম ও অযোগ্য সন্তানরাই পৈতৃক সম্পত্তির দিকে নজর রাখে। বর্তমানে যারা ব্যর্থ, তারাই অতীতে বাস করতে ভালোবাসে। বর্তমানকে কাটাছেঁড়া করে, অতীতকে বুকে চেপে ধরে বেঁচে থাকে। ভবিষ্যতের উজ্জ্বল স্বপ্নে কস্ফচিৎ উদ্বেল হয়। বাংলাদেশে রাজনৈতিক নেতৃত্বের চেহারা এমনি। দলমতের ঊর্ধ্বে ওঠে জাতীয় স্বার্থকে আঁকড়ে ধরতে নেতা-নেত্রীরা শেখেননি। ভবিষ্যতের স্বর্ণালি সিঁড়ির জন্য বর্তমানের ইস্পাতকঠোর কার্যক্রমকে সাজাতে জানেন না। এমনকি কার্যকরণের বিন্যাসে পর্যন্ত অবহেলা আর ঔদাসীন্য প্রদর্শন করেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ, দেশে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য অর্থনৈতিক কূটনীতির নামে উচ্চকণ্ঠ হয়েও বিনিয়োগ বৃদ্ধির যেসব মৌলিক শর্ত রয়েছে, তার প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন। দেশি বিনিয়োগকারীদের যথাযথ উৎসাহ দানে তারা কুণ্ঠিত। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি রোধে তেমন আগ্রহী নন। উন্নয়নের লক্ষ্যে অর্থনৈতিক অবকাঠামো বিনির্মাণে অনীহা। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনে যথার্থ পদক্ষেপ গ্রহণে হয় উত্তাপের অভাব, না হয় উদ্যোগের কমতি। সমাজে বিদেশিদের আকৃষ্ট করার জন্য মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গিত্বে বিশ্বনাগরিকতায় যে চেতনা তার দিকে কোনো খেয়াল নেই।



অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি উল্লেখযোগ্য পূর্বশর্ত হলো, সমাজে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের পূর্বশর্ত হলো, গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সমস্যা সম্পর্কে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঐকমত্য এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সহিষুষ্ণতা ও আপসকামী এক পরিবেশ। যে দশটি দেশের কথা বিশ্বব্যাংক উচ্চস্বরে উচ্চারণ করছে, তাদের দিকে তাকালেই এর উত্তর মিলবে। তাইওয়ানের মতো একটি ক্ষুদ্র জনপদ এদিকে চোখ রেখে সৃষ্টি করেছে এক অবিশ্বাস্য ইতিহাস। দক্ষিণ কোরিয়ার মতো একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র বিশ্ব বিজয়ের প্রত্যয় লাভ করেছে। ওই সব রাষ্ট্রে রয়েছে নানা দল। রয়েছে হাজারো মতপার্থক্য। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে বিদ্যমান রয়েছে জাতীয় অগ্রগতি অর্জনের সাধারণ লক্ষ্য। ইন্দোনেশিয়ার মতো এককালের অনগ্রসর রাষ্ট্র প্রথমে জয় করেছে নিজের দুর্বলতা। তারপর অগ্রসর হচ্ছে দ্রুতগতিতে এক বৃহৎ শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার অভিযানে। অতীতকে নিয়ে টানাহেঁচড়ার প্রতিযোগিতা নেই এসব সমাজে। অতীতকে তারা গ্রহণ করেছে সবার অর্জন বা ব্যর্থতার সমষ্টিরূপে। এটি কারও পৈতৃক সম্পত্তি নয়। বর্তমানকে কেন্দ্র করে ঝগড়া-বিবাদ বা বিতর্কে অবতীর্ণ হলেও ভবিষ্যৎকে গ্রহণ করেছে জাতির অভীষ্ট লক্ষ্য হিসেবে। এ লক্ষ্যে গড়ে উঠেছে সহমত। সবাই দল-মত-নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। তাই সাহসী যোদ্ধার পদতলে বিজয় যেমন আছড়ে পড়ে ধন্য হয়, মাত্র পাঁচ দশকে ইন্দোনেশিয়া বা চীনের মতো অসংলগ্ন জনপদ অথবা তাইওয়ান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো ছোটখাটো সনাতন সমাজ আধুনিকতার আলোয়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। থাইল্যান্ডের মতো শতধা বিভক্ত সমাজেও গড়ে উঠেছে ইস্পাতকঠিন ঐক্য।

এসব রাষ্ট্রের আর একটি বৈশিষ্ট্য সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং তা হলো, অগ্রগতির অভিযাত্রায় নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে, কারও কাছে মাথা নিচু না করে, জাতীয় স্বার্থকে সমুন্নত রাখার উদগ্র আকাঙ্ক্ষায় প্রথমে অতি ধীরে, পরে দ্রুততালে পথ চলার দৃঢ় সংকল্প। তাইওয়ান চীনের মতো বৃহৎ শক্তির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে ধীরস্থিরভাবে। দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া মোকাবিলা করেছে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের প্রচণ্ড চাপ অত্যন্ত শান্তভাবে। ফ্রান্স, জাপান, জার্মানির ইতিহাস সবার জানা। কেউ কারও জঠরে বন্দি হয়ে নিরবচ্ছিন্ন প্রশান্তি লাভে আগ্রহী নয়। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বময় রাজত্ব করেছে। এখনও করতে চায়। চীন কারও চেয়ে কম নয়। ভারতের মাথায় রয়েছে গান্ধী-নেহরুর লালিত স্বপ্নের ডালি- সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াব্যাপী ভারতবর্ষের অশোকচক্র। আর বাংলাদেশ? ভবিষ্যতের উজ্জ্বল স্বপ্নবিহীন বাংলাদেশ অতীতকে নিয়ে বিতর্কের ধূলিঝড়ে বিভ্রান্ত।

অগ্রগামী এই যুগে বাংলাদেশের আর কিছু না থাকলেও তার রয়েছে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান, চীন-ভারতের মাঝামাঝি অবস্থান, থাইল্যান্ড-ইন্দোনেশিয়ার পাশাপাশি, পূর্ব ও পশ্চিমের সন্ধিস্থলে ভূরাজনৈতিক লোকেশন, যা কোনো বৃহৎ শক্তি, যদি বাংলাদেশ স্বেচ্ছায় নিজের ঘরের চাবি অন্য কারও হাতে তুলে না দেয়; না পারবে ফেলতে, না পারবে গিলতে। এ অবস্থানের সঠিক সুযোগ গ্রহণের জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজন শুধু উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রচনার দৃঢ়সংকল্প এবং বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বর্তমানকে ক্রমবর্ধমান জাতীয় কার্যক্রমের ক্ষেত্র হিসেবে সুসজ্জিত করা। ১৯৯২-৯৪ সালে সবার অলক্ষ্যে বাংলাদেশ 'উদীয়মান ব্যাঘ্রের' প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। পরিকল্পিত এবং সচেতন উদ্যোগ গৃহীত হলে ২০২০ সালে বাংলাদেশ আর কিছু করতে না পারলেও রোগ, ব্যাধি, দারিদ্র্য এবং নিরক্ষরতার ওপর বিজয় অর্জনে সক্ষম হবে। আবারও বলছি, যদি বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে টিকে থাকার সংকল্পে দৃঢ় থাকে।

একুশ শতকে গণতন্ত্র ও মুক্তবাজার অর্থনীতি গাঁটছড়া বেঁধেই থাকবে বলে মনে হয়। সমাজে এ দুয়ের সাম্যাবস্থা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্যও প্রয়োজন হবে অত্যন্ত উঁচুমানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বাচাল বা অর্বাচীনদের নেতৃত্ব নয়। বাজার অর্থনীতি খুঁজে ফেরে মুনাফা বৃদ্ধিতে সহায়ক পরিবেশ, বৃহৎ বাজার, সস্তা শ্রম, স্বল্প নিয়ন্ত্রণ প্রভৃতি। গণতন্ত্র চায় পারস্পরিক আদান-প্রদানের পরিবেশ, সহিষুষ্ণতা, উদার মনোভাব আর ভবিষ্যৎমুখী দৃষ্টিভঙ্গি। দুয়ের সমন্বয় ঘটানো কঠিন কাজ এবং এটি শুধু সম্ভব উন্নত ধরনের রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষে। সজ্ঞাত, সচেতন ও মেধাবী রাজনৈতিক নেতৃত্বের দ্বারা। বাংলাদেশ এমনি সৃষ্টিধর্মী নেতৃত্বের আশীর্বাদ কামনা করে একুশ শতকের শেষ পাদে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী; সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



আরও পড়ুন

×