ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চালের বাজারের অস্থিরতা রোধে প্রয়োজন নীতির স্থিরতা

চালের বাজারের অস্থিরতা রোধে প্রয়োজন নীতির স্থিরতা
×

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম

প্রকাশ: ২৫ নভেম্বর ২০১৯ | ১৫:৪৯

দেশের চালের বাজারে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চাহিদানুযায়ী যথেষ্ট চাল মজুদ থাকলেও গত দুই সপ্তাহ ধরে ক্রমান্বয়ে বাড়ছে চালের দাম। এই মূল্য বৃদ্ধি কিন্তু নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য আরেকটি ভীতিকর বার্তা। পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধির পর ধারাবাহিকভাবে লবণ, হলুদ, তেল, মরিচ ইত্যাদি পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির কারণে ভোক্তারা ইতোমধ্যে পর্যুদস্ত। তবে এসব পণ্য তাদের খাদ্যপণ্যের মোট ব্যয়ের সীমিত অংশ বলে তারা এগুলোর ব্যবহার কিছুটা কমিয়েছে এবং উচ্চমূল্য স্বীকার করেও টিকতে পারছে। কিন্তু চালের মতো অত্যাবশ্যকীয় একটি পণ্য, যা তাদের খাদ্যপণ্য ব্যয়ের ৩০ শতাংশেরও বেশি, তার বাড়তি মূল্য তাদের আরও বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে ভোক্তারা চায় জরুরি ভিত্তিতে চালের বর্ধিত মূল্য হ্রাস পাক। মনে রাখা দরকার, বিভিন্ন খাদ্যপণ্য, যেমন- চাল-ডাল, পেঁয়াজ-রসুন, লবণ-মরিচ, আলু-পটোল ইত্যাদির বাজার কাঠামো এক নয়। বিশেষত এসব পণ্যের চাহিদা, উৎপাদন, ঘাটতি, আমদানি, বিপণন সবকিছুই বিভিন্ন কারণে ভিন্ন হয়। একেকটি পণ্যের বাজার বিভিন্ন মৌসুমে ভিন্ন ভিন্ন কারণে প্রভাবিত হয়। তাই এসব পণ্যের বাজার কাঠামোকে একই ছকে ব্যাখ্যা করা দুরূহ। ২০১৭ সাল থেকে বিভিন্ন মৌসুমে ধান ও চালের বাজারে এক ধরনের অস্থিতিশীলতা দেখা যাচ্ছে। কখনও কমছে, কখনও বাড়ছে। তবে, একবারে যে পরিমাণ মূল্য বাড়ছে, তা শিগগির আর আগের মূল্যে ফেরত আসছে না।

২০১৭ সালে বন্যার কারণে যে ঘাটতি, তাতে বাজারে মূল্য বৃদ্ধি ও তা মোকাবিলায় সরকারের দীর্ঘসূত্রতা এবং ২০১৮-১৯ সালে চালের বাজারে উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকারের অপারগতার কারণে একবার ভোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অন্যবার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও একদিকে ভোক্তা ক্ষতির মুখে, অন্যদিকে কৃষকও যে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে, তা কিন্তু নয়। সুতরাং চালের বাজার স্থিতিশীল না থাকায় দেশের প্রান্তিক জনগণ কখনও কৃষক হিসেবে লোকসান গুনছে, আবার কখনও ভোক্তা হিসেবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। সরকারি তথ্যমতে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে মোট চাল উৎপাদন হয়েছে ৩ কোটি ৭৬ লাখ টন। এর মধ্যে বোরো উৎপাদন ১ কোটি ৭২ লাখ টন, আমন উৎপাদন প্রায় ১ কোটি ৪৩ লাখ টন এবং আউশের উৎপাদন ২৯ লাখ টনের বেশি। এর বিপরীতে ভোক্তা চাহিদা ছিল ৩ কোটি ৭২ লাখ টন। অর্থাৎ দেশে ৪০ লাখ টনেরও বেশি চাল মজুদ থাকার কথা। এই মজুদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ (প্রায় ১১ লাখ টন) সরকারের খাদ্যগুদামে মজুত থাকার কথা। সে হিসাবে চালের মূল্য বৃদ্ধির যৌক্তিক ব্যাখ্যা পাওয়া দুস্কর। যদিও ব্যবসায়ীরা চালের মূল্য বৃদ্ধির বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, বিশেষত সরকারের ২৬ টাকা দরে ৬ লাখ টন আমন ধান সংগ্রহকে ব্যবসায়ীরা উচ্চমূল্যের একটি কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। কিন্তু চালের বাজারের প্রভাবে এই মুহূর্তে ধানের বাজার যৎসামান্যই প্রতিফলিত হচ্ছে। অর্থাৎ যে হারে চালের দাম বাড়ছে, সে তুলনায় ধানের দাম বাড়ছে না। কৃষকদের দাবিমতে, সরকার ঘোষিত মূল্যে তারা ধান বিক্রি করতে পারছেন না। এর ওপর আড়তদাররা তাদের কাছ থেকে সরকারি মূল্যের চেয়ে অনেক অল্প মূল্যে ধান কিনে নিচ্ছে। বিষয়টি ব্যবসায়ীরাও জানেন, আবার সরকারেরও অজানা নয়। আমাদের দেশে চাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে যতটা সফলতা পাওয়া যায়, ধান সংগ্রহের ক্ষেত্রে তার সীমিত সফলতাই চোখে পড়ে। সিপিডির গবেষণায় দেখা গেছে, সরকারনির্ধারিত মূল্যে বিগত বছরগুলোতে গড়ে ৮ শতাংশ ধান সংগ্রহ করা গেছে। যদিও চালের ক্ষেত্রে এ অর্জন ৮০ শতাংশের বেশি, যা কিনা চালকল মালিকরা সরবরাহ করে থাকেন। চালকল মালিকরা কৃষকের কাছ থেকে স্বল্প মূল্যে ধান কিনে পরবর্তী সময়ে সেই ধান থেকে উৎপন্ন চাল সরকারি মূল্যে সরকারের কাছে বিক্রি করছেন। অর্থাৎ, তারা দুই বিকিকিনির মাঝে একটি বড় পার্থক্য তৈরি করছেন। এর ফলে কৃষক ও ভোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

সরকারের ধান সংগ্রহ ও লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে তার সংগ্রহ কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দরকার। মাঠ পর্যায় থেকে ধান সংগ্রহের ক্ষেত্রে কৃষকদের খাদ্যগুদামে না ডেকে বরং খাদ্যগুদামের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সংশ্নিষ্ট ব্যক্তিদের কৃষকের কাছে যাওয়া উচিত। এক্ষেত্রে সংশ্নিষ্ট এলাকার হাটগুলোকে কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। এ জন্য ওই এলাকায় মাইকিং করে কৃষকদের থেকে ধান কেনার বিষয়টি আগাম জানিয়ে দেওয়া দরকার। খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও কৃষকদের উপস্থিতিতে উন্মুক্তভাবে ধান ক্রয়-বিক্রয় বা লেনদেন করতে হবে। এ ধরনের পরিবর্তন আনা গেলে ধান সংগ্রহে যে অভিযোগ রয়েছে যেমন শুধু বড় কৃষকদের থেকে ধান ক্রয়, পরিচিতদের থেকে ধান ক্রয়, একজনের পরিচয় ব্যবহার করে অন্যজনের থেকে ধান ক্রয়, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের থেকে বা তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে ধান ক্রয় ইত্যাদি অভিযোগের বিপরীতে সবার উপস্থিতিতে উন্মুক্ত লেনদেন সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। এতে প্রকৃত কৃষকরা লাভবান হবেন।

চালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল থাকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অন্যান্য পণ্যের মূল্যও স্থিতিশীল থাকা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সরকারের নীতিগত স্থিরতা এবং তা বাস্তবায়নে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা জরুরি। শুধু চাল নয়; অন্যান্য পণ্যের বাজারেও অস্থিরতা বিবেচনায় রেখে কৃষি, বাণিজ্য ও খাদ্য মন্ত্রণালয় যৌথভাবে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে খাদ্যপণ্য বিপণনের ক্ষেত্রে একটি বিধিবদ্ধ লেনদেন কাঠামো তৈরি করতে পারে। এ কাঠামোতে উৎপাদক থেকে শুরু করে বেপারী, আড়তদার, পাইকার, খুচরা বিক্রেতাসহ প্রত্যেক পর্যায়ে লেনদেনের ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত ও লেনদেন রসিদ সংগ্রহ বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। নিত্যপ্রয়োজনীয় এসব পণ্যের সব লেনদেন প্রয়োজনবোধে অনলাইনভিত্তিক সংগ্রহ, জমাদান এবং জনস্বার্থে তা উন্মুক্ত করা যেতে পারে। পাশাপাশি সরকারের সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগ যেমন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রাণাধীন বাজার মনিটরিং টিম, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের বাজার তদারকি টিম, প্রতিযোগিতা কমিশনের বাজারসংশ্নিষ্ট মনিটরিং টিম এসব তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং সত্যতা যাচাই করে দেখতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় কোন পর্যায়ের কার কাছে কোন পণ্য কী পরিমাণ মজুদ রয়েছে, সেই তথ্য-উপাত্ত সন্নিবেশিত ও তা পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। চালের বাজার যদি পেঁয়াজের মতো ঊর্ধ্বগতি পায় কিংবা লবণের মতো গুজবের শিকার হয়, তাহলে এর বিরূপ প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া হবে বহু গুণ। এখন থেকেই সতর্ক ও দূরদর্শী ব্যবস্থা নিলে চালের বাজারে ঘনীভূত ভীতি ও উৎকণ্ঠা সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে না।

গবেষণা পরিচালক, সেন্টার ফর
পলিসি ডায়ালগ-সিপিডি


আরও পড়ুন

×