কার জন্য প্রণোদনা, কে পায় 'সুফল'
কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ
প্রকাশ: ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৫:১৪ | আপডেট: ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৫:১৫
অফিসে প্রায় সব পত্রিকা থাকে; কিন্তু বাসায় আরও দু-একটি পত্রিকার সঙ্গে সমকাল পড়ি। নভেম্বরের গোড়ায় সপ্তাহখানেক সমকালে 'প্রণোদনা যায় কোথায়' শীর্ষক ধারাবাহিক প্রতিবেদন আমি মনোযোগের সঙ্গে পড়েছি। তখন থেকেই ভাবছিলাম, বিষয়টি নিয়ে লিখব। মনে রাখতে হবে, প্রণোদনার সার্বিক আকার দেশের অর্থনীতির জন্য মোটেও নগণ্য নয়। চলতি অর্থবছরের বাজেটে এই খাতে মোট ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা সরকারের মোট পরিচালন ব্যয়ের ১৪ শতাংশ। ফলে প্রণোদনার ইস্যু কোনোভাবেই প্রান্তিক হতে পারে না।
সমকাল কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ দিতে চাই এমন জনগুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় ধারাবাহিকের জন্য বেছে নেওয়ার জন্য। মনে রাখতে হবে, বিষয়টি প্রায় অনালোচিতও। প্রণোদনা নিয়ে নানা সময়েই কথাবার্তা হয়। বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষে প্রণোদনা দাবি করা হয়ে থাকে। সরকারও এ ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত ও ব্যবহারিক উদ্যোগ ঘোষণা করে- এতটুকু সবাই জানে। তারপর সেই প্রণোদনা কোথায় যায়? অর্থনীতির জন্যও একটি গভীরতর প্রশ্ন বটে।
প্রণোদনা কেবল আর্থিক হয় না। বাস্তবে সরকারের নীতি ও কর্মসূচিও কোনো কোনো খাতের জন্য সুবিধাজনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। সেটা পরোক্ষ প্রণোদনা। সমকালের প্রতিবেদনগুলোতে দেখা যাচ্ছে- তৈরি পোশাকশিল্প ছাড়া প্রায় সব খাতেই আর্থিক প্রণোদনা, নীতি-সহায়তা, কর-শুল্ক্ক রেয়াত কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে স্পষ্ট ব্যর্থ হয়েছে। কেন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রণোদনা এভাবে ব্যর্থ হচ্ছে? আমার মতে, নজরদারির অভাব। প্রণোদনার খাত, হার ও মাধ্যম নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে যতটা মনোযোগ দেওয়া হয়, বরাদ্দ হওয়ার পর এর প্রয়োগ ও কার্যকারিতা সম্পর্কে সেভাবে নজরদারি করা হয় না। আমি কয়েক দশক ধরে দেখে এসেছি, একবার প্রণোদনা দেওয়া শুরু করার পর স্বল্প, মধ্যম বা দীর্ঘ মেয়াদে পর্যালোচনাও করা হয় না। অথচ গোটা বিশ্বেই প্রণোদনা দেওয়ার পর এর কার্যকারিতা পর্যালোচনা করা হয় এবং প্রয়োজনে হ্রাস-বৃদ্ধি বা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। বিলম্বে হলেও আমাদের একই পদ্ধতি অনুসরণের সময় হয়েছে।
নির্দিষ্ট কোনো খাতের পক্ষে কোনো গোষ্ঠী বা সংগঠন যখন প্রণোদনা দাবি বা প্রত্যাশা করে, তখন একই সঙ্গে কিছু প্রতিশ্রুতিও দেয় তারা। অথবা সরকারের পক্ষেও যদি স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে কোনো খাতকে উৎসাহিত করতে প্রণোদনা দেওয়া হয়, সে ক্ষেত্রেও কিছু শর্ত নির্ধারণ করা হয়। যাতে করে প্রণোদনার অর্থ বা সুযোগ-সুবিধা যথার্থই কাজে লাগে। সরকারকে এখন দেখতে হবে- প্রণোদনা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি বা দেওয়ার শর্তগুলো ঠিকমতো প্রতিপালিত হচ্ছে কি-না। অন্যথায় জনগণের এই অর্থ কেবল একটি গোষ্ঠীর সুবিধা দিতেই ব্যয় হবে। একটি কল্যাণ রাষ্ট্রে এ ধারা চলতে পারে না।

এ ক্ষেত্রে আমি বলব, প্রণোদনার বিনিময়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বা শর্ত ঠিকমতো প্রতিপালিত হচ্ছে কি-না, সে ব্যাপারেও একটি পদ্ধতি ঠিক করতে হবে। তাহলে খাতবিশেষে আলাদা মূল্যায়নের বদলে অভিন্ন পদ্ধতিতে সব প্রণোদনারই কার্যকারিতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বোঝা যাবে।
প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সব প্রণোদনার মূল উদ্দেশ্য একটিই- গ্রাহক বা ভোক্তাসাধারণকে সুবিধা বা সুরক্ষা দেওয়া। সে জন্য একটি গোষ্ঠী প্রণোদনা পেয়ে যদি কেবল মধ্যবর্তী কোনো গোষ্ঠীকে সুবিধা দেয়, তাহলে কিন্তু উদ্দেশ্য সাধিত হয় না। যেমন- খাদ্যপণ্য আমদানিকারকদের প্রণোদনা দেওয়া হলো; কিন্তু আমদানিকারকরা সুবিধা দিলেন কেবল পাইকারি বা খুচরা বিক্রেতাদের। প্রণোদনার সুবিধা ভোক্তা বা খুচরা ক্রেতা পর্যায়ে গেল না। তাহলে লাভ কী? বেশির ভাগ খাতে সুবিধা যদি প্রান্তিক পর্যায়েই না পৌঁছে, তাহলে এসব প্রণোদনার অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।
এ প্রসঙ্গে ব্যাংকিং খাত হতে পারে একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। গত কয়েক দশকে আমাদের দেশে এই খাত যথেষ্ট সম্প্রসারিত হয়েছে। হয়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী 'লবি'। ফলে বিভিন্ন সময়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলো সরকারের কাছ থেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রণোদনা পেয়েছে। যেমন- ব্যাংক খাতেও সরকারি আমানত বাড়ানো হয়েছে আগের তুলনায়। ব্যাংকগুলোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বাধ্যতামূলক নগদ জমার (সিআরআর) হারও কমানো হয়েছে। কথা ছিল, এর পরিবর্তনে ঋণের সুদহার কমানো হবে। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং এ ব্যাপারে কয়েকবার প্রকাশ্যে তাগিদ দিয়েছেন, আমরা দেখেছি। বলেছেন, ঋণ সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনতে হবে। কিন্তু এখনও প্রণোদনার বিপরীতে সেই প্রতিশ্রুতি বা শর্ত প্রতিপালিত হয়নি। আমি অস্বীকার করব না, বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পক্ষে এ ব্যাপারে যুক্তিও রয়েছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে কি প্রণোদনা দেওয়ার আগেই সেগুলো ঠিকমতো আলাপ-আলোচনা হয়নি। প্রতিশ্রুতি বা শর্ত দেওয়ার সময় কি যথেষ্ট গবেষণা, পর্যালোচনা করা হয়নি?
একই চিত্র যেন শেয়ারবাজারেও। বছরের পর বছর প্রচেষ্টা চালিয়েও শেয়ারবাজার স্থিতিশীল করা যাচ্ছে না কেন? শেয়ারবাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারের দিক থেকে প্রচেষ্টা কম নেই। নীতি ও কাঠামোগত বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আমার মতে, সংকটের মূল কারণ ভালো ভালো কোম্পানির শেয়ার বাজারে আসছে না। বলা যেতে পারে কম আসছে। এখন রুগ্ণ কোম্পানির শেয়ার বাজারে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে উঠলে একসময় সেই বেলুন তো ফেটে যাবেই। ফাটা বেলুন মেরামত করে ক'দিন চালানো যাবে? কর্তৃপক্ষের বরং উচিত শেয়ারবাজারে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে রুগ্ণ কোম্পানিগুলো এভাবে ফুলতে না পারে। যাতে করে ভালো ও সচ্ছল কোম্পানিগুলো সুস্থ প্রতিযোগিতা গড়ে তুলতে পারে। সরকারি কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে আনা হতে পারে আরেকটি পদক্ষেপ। শেয়ারবাজারের অনিশ্চয়তা যে কেবল আমাদের দেশে রয়েছে, এমন নয়। সব দেশেই শেয়ারবাজার নিয়ে 'ফাটকা' খেলা হয়। কিন্তু সেই খেলা চলে একটি নিয়মের মধ্যে। কেউ চাইলেই সেখানে রাতারাতি কোনো রুগ্ণ কোম্পানির বাজারদর বাড়িয়ে দিতে পারবে না।
বাজারে দেওয়া প্রণোদনা ভেতরে ভেতরে কতটা ফাঁপা হয়ে উঠছিল, সাম্প্রতিক সময়ে পেঁয়াজের দরে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি তার প্রমাণ। প্রণোদনার অর্থ প্রান্তিক পর্যায়ে যাওয়ার ব্যাপারে যদি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া থাকত এবং তা বাস্তবায়নে 'মার্কেট ওয়াচ' ব্যবস্থা থাকত, তাহলে হয়তো পরিস্থিতির এতটা অবনতি হতো না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অন্যতম প্রধান কাজ বাজার যাতে সুষ্ঠুভাবে চলে, সেদিকে নিয়মিত নজর রাখা। কিন্তু মনে হয় যেন এ কাজেই মন্ত্রণালয়টি সবচেয়ে উদাসীন। এ ক্ষেত্রে সরকারকে শাঁখের করাতের ভূমিকা নিতে হবে। শক্ত হাতে এমনভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যাতে করে ব্যবসার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়; আবার ভোক্তাও ভোগান্তিতে না পড়ে। দুর্ভাগ্যবশত, আমরা তেমন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। কখনও উৎপাদক, কখনও ভোক্তা মার খেয়ে যাচ্ছে। লাভবান হচ্ছে কেবল অসাধু ব্যবসায়ীরা। এই ব্যবস্থা আর চলতে দেওয়া যায় না।
আমি দেখতে চাইব, প্রণোদনা নিয়ে সরকার আরও সিরিয়াসলি ভাবছে। যেসব খাতে প্রণোদনা কাজে আসছে, সেখানে আরও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর যেসব খাতে প্রণোদনা চোরাবালিতে হারিয়ে যায়, ভোক্তা বা গ্রাহকের কাজে আসে না- সেখানে অজনপ্রিয় হলেও কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
প্রসঙ্গক্রমে আরেকটি কথা বলতে চাই- গত এক দশক প্রবৃদ্ধির সূচক ঊর্ধ্বমুখী থাকায় নীতিনির্ধারকদের মধ্যে যেন আত্মতুষ্টি চলে এসেছে। অর্থনীতির জন্য এমন প্রবণতা বিপজ্জনক। ভুলে যাওয়া চলবে না, যে কোনো একটি ধাক্কায় প্রবৃদ্ধির হার ফের নেমে যেতে পারে। একদিকে রাষ্ট্রীয় অর্থ যদি গোষ্ঠীবিশেষের পকেটে যেতে থাকে, আবার ভোক্তার খরচ যদি বেড়ে যেতে থাকে, তাহলে দু'দিক থেকেই ঝুঁকি তৈরি হবে। এরই মধ্যে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া এবং স্বল্পোন্নত তকমা ঝেড়ে ফেলতে যাওয়া বাংলাদেশের জন্য এ ধরনের ঝুঁকি নেওয়ার কোনো অবকাশ নেই।
অর্থনীতিবিদ
- বিষয় :
- অর্থনীতি
- কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ
