ঢাকা সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গে করোনা ও অবিবেচক সিদ্ধান্ত

পশ্চিমবঙ্গে করোনা ও অবিবেচক সিদ্ধান্ত
×

স্বপন দাশগুপ্ত

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০২০ | ১২:১৯

করোনার দুর্যোগ কেটে যাওয়ার পর সামনের বছরগুলোতে পেছনে ফিরে যদি এ মহামারি ছড়ানোর কারণ কোনো ঐতিহাসিক বা গবেষক খোঁজেন তাহলে দেখতে পাবেন, করোনা ছড়াতে আমাদের নির্বুদ্ধিতা কতটা সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। এটা কেবল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জন্যই সত্য নয়। সংস্থাটি হয়তো চীনের জন্য বিশ্বকে যথাযথ সতর্ক করতে দেরি করেছিল। যখন বিশ্ব এর হুমকি টের পেল তখন কিছু নির্বুদ্ধিতা পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে।
ভারতে করোনাভাইরাস ছড়াতে তাবলিগ জামাতের দিল্লির নিজামুদ্দিন মার্কাজের ভূমিকা, তার প্রেক্ষিতে সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক দুরাচারও আমরা লক্ষ্য করেছি। আমাদের এ রকম আরও কিছু কাজের কারণে আমরা দেখব আগামী দিনে কীভাবে করোনা আরও ছড়াচ্ছে।
ভারতে প্রশাসনের অদ্ভুত পদক্ষেপ ও মানুষের লকডাউনে থাকা রাজ্য সরকারগুলোর একগুঁয়েমি সিদ্ধান্তের কারণে সুফল নাও আসতে পারে। পশ্চিমবঙ্গকে নিয়ে ভয়, দায়িত্বহীন নীতির কারণে স্বল্পমেয়াদি রাজনীতি একটি ভয়ানক অবস্থা সৃষ্টি করতে পারে, যা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে। গত ১৫ দিনের কথাই ধরি। আমরা দেখছি বাস্তবের সঙ্গে পরিসংখ্যানের ব্যাপক অমিল। যেমন ১৬ এপ্রিল বিকেলে রাজ্য থেকে ১৪৪ জন করোনা পজিটিভ রোগী শনাক্তের কথা বলা হয়। অথচ ১৭ এপ্রিল সকালে কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্যমতে রোগীর সংখ্যা ২০৪। যদিও উভয় হিসাবেই বাস্তব অবস্থা আসেনি। কারণ টেস্টের সংখ্যা খুবই অল্প। একইভাবে সীমান্তের জেলাগুলো থেকেও সঠিক হিসাব আসেনি। বিশেষ করে উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, মুর্শিদাবাদ ও মালদা জেলার হিসাব। তাছাড়া ১০ জনের মৃত্যুর খবরটিও বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ আমরা অনেক খবর পেয়েছি, নানা জায়গায় প্রশাসন কর্তৃক শবদাহ করা হয়েছে, যাদের সম্পর্কে তাদের পরিবারও জানে না। গত সপ্তাহে এমনি এক ঘটনা ঘটেছে বাকুড়ায়, যেখানে ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা এমন দুটি লাশ গোপনে দাহ করছিল। রাজ্য সরকার করোনাভাইরাসে মৃত্যুর জন্য পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে, যারা লাশ পরীক্ষা করে দেখে প্রত্যয়ন করবে। যদিও চিকিৎসকরা এ সিদ্ধান্তের ঘোর বিরোধিতা করেছেন।
যেহেতু কেউ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে এখনও গুরুতর অভিযোগ করেননি, সেহেতু এ মহামারির পরিসংখ্যানও সেভাবে ব্যাখ্যা করা হয় না। অথচ
সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আমাদের ব্যর্থতা ও নির্বুদ্ধিতা সীমাহীন।
প্রথমত, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নীতি খুবই ঢিলেঢালাভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। মুসলিম অধ্যুষিত জনপদে এ ঢিলেঢালা ভাব বেশি স্পষ্ট। আবার পশ্চিমবঙ্গ থেকে যে ৩০০ জন তাবলিগ জামাতে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের চিহ্নিত করে টেস্ট করা এবং তাদের আইসোলেশনে রাখার প্রয়োজনীয়তা সরকার অনুভব করেনি। দ্বিতীয়ত, মেডিকেল কর্মীদের পিপিই দিদি হলুদ কালার বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাতে নাকি রাজনৈতিক ঘ্রাণ রয়েছে। এভাবে আসলে জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি খামখেয়ালি করে নেওয়ার সুযোগ নেই। এই প্রত্যাখ্যানের কারণে আমরা দেখলাম অনেক সরকারি হাসপাতাল করোনায় আক্রান্ত হয়ে এখন বন্ধ রয়েছে। কলকাতার বাঙ্গুর হাসপাতালে অভিযোগ রয়েছে, জেনারেল ওয়ার্ডে মৃতদেহ আনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যেখানে লাশের পচন ধরেছে। এভাবে অবিবেচক সিদ্ধান্ত এবং এর প্রেক্ষিতে চিকিৎসকদের চাপা ক্রোধ সেখানকার গণস্বাস্থ্যকে ধ্বংসের কিনারে নিয়ে গেছে। সেখানে এটা ওপেন সিক্রেট যে, লোকাল মিডিয়াতে এসব কেবল দায়সারা খবর হয়।
যদি করোনা কমিউনিটি পর্যায়ে মহামারির মতো ছড়ায়, সেটা অসম্ভব নয়। এবং এই আতঙ্ক আগেই যদি মানুষের মাঝে তৈরি হয়, তাহলে রাজ্যব্যাপী সামাজিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। সামাজিক অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে, যদি রেশন বণ্টনে কোনে রাজনীতিকীকরণ বা স্থানীয় পর্যায়ে বৈষম্য করা হয়।
আর কেন্দ্রেরও এটা উচিত, করোনাভাইরাস ব্যবস্থাপনায় রাজ্য যেন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। তবে রাজ্য সরকার যদি জাতীয় এ জরুরি অবস্থায় অব্যবস্থাপনা তৈরি করে, সেখানে কেন্দ্রের চুপ করে থাকার সুযোগ নেই। প্রশ্ন হলো, আগামী দিনগুলোতে যে ভীতির আভাস রয়েছে, তাতে আমরা সে অবস্থা
দেখব তো?
ভারতীয় সাংবাদিক ও
রাজনৈতিক বিশ্নেষক
টাইমস অব ইন্ডিয়া থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর :মাহফুজুর রহমান মানিক

আরও পড়ুন

×