ঢাকা সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬

আলাপচারিতায় ড. মাহবুবুল মোর্শেদ

করোনামুক্ত পৃথিবীর জন্য আমাদের অপেক্ষা করতেই হবে

করোনামুক্ত পৃথিবীর জন্য আমাদের অপেক্ষা করতেই হবে
×

-

প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২০ | ১০:২৬ | আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০২০ | ১২:২০

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মাহবুবুল মোর্শেদ। সুইডেনে মাষ্টার্স করে ২০১৩ সালে সুইজারল্যান্ডের বার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইমিউনোলজি'র (রোগতত্ত্বের ) ওপর পিএইচ.ডি সম্পন্ন করেছেন। অতি সম্প্রতি তিনি এবং তাঁর বিভাগীয় কয়েকজন শিক্ষার্থী মিলে করোনা ভাইরাসের চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে "ÒA comprehensive analysis of possible treatment for COVID-" শিরোনামে একটি গবেষণা রিভিউ প্রবন্ধ তৈরি করেন। এ রিভিউ প্রবন্ধটি  ÒIOSR Journal Of Pharmacy And Biological Sciences (IOSR-JPBS)Ó নামক গবেষণা জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। সারাবিশ্বে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া কোভিড-১৯ যা, করোনা ভাইরাস নামে সমধিক পরিচিত এ ভাইরাসের সুনিদির্ষ্ট চিকিৎসা বা টিকা এখনও পর্যন্ত আবিস্কার হয়নি। ড. মাহবুবুল মোর্শেদ তাঁদের প্রকাশিত রিভিউ প্রবন্ধে এ রোগের চিকিৎসা সম্পর্কে বিভিন্ন গবেষক যেসব ঔষধের কথা বলছেন, তার কার্যকারিতা এবং পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার নানা প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। দৈনিক সমকালের সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে আসে সেসব প্রসঙ্গ। আলাপ করেছেন আহমেদ সুমন।

গবেষণা শুরুর প্রসঙ্গ কথা

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে এ রিভিউ গবেষণা শুরু করা হয়। তখন করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব সবেমাত্র চীনে শুরু হয়েছে। আশঙ্কা করা হয়েছিল যে, এ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুধুমাত্র চীনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, এটি ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বব্যাপী। কার্যত তাই দেখা গেল। এমন একটি মানবঘাতক ভাইরাসের চিকিৎসা সম্পর্কে বিভিন্ন দেশের গবেষকগণ নানা ধরনের ঔষধের কথা বলতে শুরু করেছেন। বলা প্রয়োজন যে, কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাসের চিকিৎসা সুনিদির্ষ্টভাবে আবিস্কার না হলেও বিশ্বের অনেক দেশের গবেষকগণ চিকিৎসা পদ্ধতির নানা ধরনের সম্ভাবনার কথা বলছেন। ঔষধ বলতে সম্ভাব্য ঔষধ, যা এ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী সুস্থ্য হয়ে উঠতে পারেন। ওইসব গবেষণা প্রবন্ধে যেসব ঔষধের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, ড. মাহবুবুল মোর্শেদ এবং তাঁর দল ওইসব চিকিৎসা পদ্ধতির কার্যকারিতা এবং পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার ওপর কাজ করেন। এ লক্ষ্যে তাঁরা শতাধিক গবেষণাপত্রের উপর রিভিউ করেন। করোনা ভাইরাসের সম্ভাব্য চিকিৎসার জন্য ঔষধ হিসেবে চিহ্নিত Hydroxychloroquine, chloroquine phosphate, niclosamide, olmesartan, arbidol, interferon, lopinavir/ritonavir, favipiravir, remdesivir, darunavirএই ধরনের ঔষধের কার্যকারণ এবং পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করেছেন। বিশ্বের খ্যাতনামা গবেষকগণ এখনও পর্যন্ত করোনা ভাইরাসের চিকিৎসায় এসব ঔষধ প্রয়োগের কথা বলছেন। ড. মাহবুবুল মোর্শেদ জানান, তাঁদের রিভিউ করা গবেষণা প্রবন্ধগুলো বর্তমান সময়ে খুবই আলোচিত। এ গবেষণাগুলো বিশ্বব্যাপী মহামারি আকারে আবির্ভূত হওয়া করোনা ভাইরাসের চিকিৎসা নিয়ে বিভিন্ন গবেষক তাদের প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধে চিকিৎসা প্রণালী (ট্রিটমেন্ট), রোগ নির্ণয় পদ্ধতি (ডায়াগনোসিস), রোগের বিস্তার (এপিডেমিওলজি), জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়া (বায়োমলিকুলার ইফেক্ট) যার মাধ্যমে কোভিড ১৯ মানব শরীরে কীভাবে কাজ করেছে আর আমাদের আক্রান্ত করছে সেসব তুলে ধরেছেন। ড. মাহবুবুল মোর্শেদ জানান, তিনি এবং তাঁর দল উল্লিখিত এ চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর তাদের পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণ চালিয়ে যাচ্ছেন।

করোনার সম্ভাব্য ঔষধ এবং কার্যকারিতা

ক্লোরোকুইন : কোনো কোনো গবেষক করোনা নিরসনে ক্লোরোকুইন ব্যবহারের কথা বলছেন। ক্লোরোকুইন মুলত ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের জন্যে ব্যবহূত হয়। কিন্তু এই ঔষুধের কিছু পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়াও রয়েছে, যা চরম মূল্য দিতে হতে পারে। এরমধ্যে কার্ডিয়াক এরেস্ট/ইরিথমিয়া উল্লেখযোগ্য। যারা এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় শিকার হবেন, তাদের মৃত্যুুর আশঙ্কা রয়েছে। ড.মাহবুবুল মোর্শেদ বলেন, এই ঔষুধগুলো থেকে অন্য ঔষুধের কার্যকারিতা অপেক্ষাকৃত ভালো এবং পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়াও কম।

ফ্যাভিপিরাভির : অনেকেই জানেন যে, ফ্যাভিপিরাভির ঔষুধটি এইচআইভি ভাইরাসজনিত রোগের জন্যে ব্যবহূত হয়। এটি মুলত কোভিডের মধ্যকার আরএনএ পলিমারেজের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। এছাড়াও lopinavir/ritonavir, interferon therapy ব্যবহূত হয়। এসব ঔষধের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া রয়েছে। সাধারণত সঙ্কাটাপন্ন রোগীদের ক্ষেত্রে এসব ঔষধ ব্যবহার করা হয়। কোনো ঔষধ প্রয়োগে যদি সঙ্কটাপন্ন কোনো রোগীর প্রাণ বাঁচে, সেক্ষেত্রে ঔষধের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করা হয় না।

করোনায় ভারতীয় চিকিৎসা

করোনায় আক্রান্ত সকল দেশ-ই প্রায় একই ধরনের ঔষধ ব্যবহার করছে। এক্ষেত্রে ভারতীয় চিকিৎসকগণ তাদের রোগীদের সেরে উঠার জন্য একই ধরনের ঔষধ ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছে। এই জিজ্ঞাসাটা বোধকরি ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দেশের রোগীদের জন্য ক্লোরোকুইন নরেন্দ্র মোদি যদি না দেন, সেক্ষেত্রে এক ধরনের হুমকি দেয়ার বিষয় থেকে উদ্রেক হয়েছে। আসলে ক্লোরোকুইন উৎপাদনের ফ্যাক্টরিটি ভারতে, যা আমাদের খুব কাছে পশ্চিমবঙ্গে। বেঙ্গল ক্যামিক্যাল এটি উৎপাদন করে এবং বিশ্বব্যাপী ক্লোরোকুইনের চাহিদার বড় যোগান এ প্রতিষ্ঠান থেকে দেয়া হয়। বর্তমানে করোনা ভাইরাসের নাকাল অবস্থাতে ভারত হয়তো ক্লোরোকুইন আর রপ্তানি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে সকলেই জানেন যে, ট্রাম্পের হুমকির পর নরেন্দ্র মোদী সেখানে ক্লোরোকুইন পাঠিয়েছেন। তখন ট্রাম্প নরেন্দ্র মোদির প্রশংসাও করেছেন।

উচ্চ তাপমাত্রায় করোনা ভাইরাস বাঁচে কী না

বলা প্রয়োজন যে, করোনা ভাইরাস একটি আরএনএ ভাইরাস। আরএনএ ভাইরাস খুব দ্রুত মিউটেশন করতে পারে। মানুষের দেহের তাপমাত্রা থাকে গড়ে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ভাইরাস মানুষের শরীরেতো বটেই জীবজগতের অন্যান্য প্রাণির দেহেও ক্রিয়াশীল থাকতে পারে। এই জীবজগতের মধ্যে যে প্রাণির দেহে যে তাপমাত্রাই থাকুক না কেন, ভাইরাস সহজেই ক্রিয়াশীল থাকতে পারে। বাংলাদেশে বর্তমান তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রির ওপর বিরাজ করছে। এই তাপমাত্রা আরএনএ ভাইরাসের জন্য সর্বোচ্চ ক্রিয়াশীল থাকার উপযুক্ত সময়। এখানে আরও বলা প্রয়োজন যে, বাজার থেকে কেনা শাক-সবজি এবং অন্যান্য পণ্যদ্রব্যের মাধ্যমেও করোনার ভাইরাসটি ছড়াতে পারে। সেক্ষেত্রে সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুতে হবে। কেনা পণ্যদ্রব্যের মধ্যে যেটা সম্ভব, সেটা ধুয়ে নিতে হবে।

টাকার মাধ্যমে করোনা ছড়াতে পারে

টাকা নানান জনের হাতে ঘুরে। টাকার মাধ্যমেও করোনার ছড়াতে পারে। চীন এবং কোরিয়াতে আমরা টাকার ওপর জীবানুনাশক স্প্রে ছিটাতে লক্ষ্য করেছি। বাংলাদেশ ব্যাংক অনুরূপ সিদ্ধান্ত নিতে পারে। মানুষ তখন টাকা লেন-দেনে আরও সর্তক হবে।

করোনা রোগী সনাক্তকরণে বাংলাদেশের পরীক্ষা পদ্ধতি

কোভিড ১৯ এর ডায়াগনসিসে মুলত রিয়েলটাইম পিসিআর (সংক্ষেপে আরপিসিআর বলে) ব্যবহূত হয়। এটি শুধু মডারেট থেকে গুরুতর কোভিড ১৯ এর রোগীদের জন্যে পরীক্ষায় পজিটিভ দেখায়। কিন্তু যে সকল রোগী কোভিডে আক্রান্ত হয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে কোনো কার্যকারিতা দেখায় না। এক্ষেত্রে করোনা ফলাফল নেগেটিভ দেখায়। এক্ষেত্রে বরং এপরে বা সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে এই রোগাক্রান্ত ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিকভাবে চিহ্নিত করা যাবে। ফুসফুসের মধ্যে ground-glass opacity লক্ষ করা যায়। এরমাধ্যমে করোনা রোগী শনাক্ত করা সম্ভব। এখানে আরও বলা প্রয়োজন যে, আরটিপিসিআর মেশিনে ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত কী না, তা নিশ্চিত হতে কমপক্ষে ৫/৬ সময় লেগে যায়। বিশেষত বিমানবন্দর এবং অন্যান্য বন্দরগুলাতে বিদেশ ফেরত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটা বড় ধরনের জটলা এবং ঝামেলা তৈরি করবে। এপরে পরীক্ষায় কার পজিটিভ বা নেগেটিভ বা সেমি পজিটিভ তাৎক্ষণিক জানা যাবে। যার পজিটিভ বা সেমি পজিটিভ দেখাবে তার পরবর্তী পরীক্ষা আরটিপিসিআর মেশিন দ্বারা হবে। এক্ষেত্রে সংশিস্নষ্ট ব্যক্তি বা যাত্রীকে মোবাইল মনিটরিংয়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

লক ডাউন কতো দিন

ড. মাহবুবুল মোর্শেদ বলেন, দীর্ঘকাল ধরে লক ডাউন বা সব কিছু বন্ধ রাখা সম্ভব হবে না। দিনমজুর এবং অল্প আয়ের মানুষকে বেশিদিন আটকে রাখা যায় না। এক সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করে হয়তো সব কিছু স্বাভাবিক পর্যায়ে আনার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ ধারণা বোধকরি অমুলক হবে না যে, তখনও করোনায় আক্রান্ত রোগী পাওয়া যাবে। ওই সময়ে করোনা রোগী সনাক্তকরণে এপরে এবং স্কিনিং দ্রুত কার্যকর হতে পারে। এই মেশিনটি বড় বড় সরকারি হাসপাতাল, বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার ছাড়াও কয়েকটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও রয়েছে। আশা করছি সব প্রতিষ্ঠানই দেশের জনগোষ্ঠির এ কান্তিকালে যার যার সাধ্যমত ভূমিকা রাখবে।

কারোনা ভাইরাস মুক্ত বিশ্ব কবে দেখা যাবে

করোনা ভাইরাস মুক্ত বিশ্ব দেখা যাবে যদি এর ভ্যাকসিন আবিস্কার করা যায়। বিশ্বের প্রতিথযশা বিজ্ঞানীরা সে কথাই বলেছেন। এইচআইভির মতো যদি এ ভাইরাসের টিকা আবিস্কার করা সম্ভব না হয়, সেক্ষেত্রে এইচআইভির মতো করোনাকেও পাশে নিয়ে চলতে হবে। করোনায় আক্রান্ত রোগীর জন্য ব্যবহারযোগী কার্যকর ঔষধ হয়তো আরও বের হবে। সব কিছুর জন্যই অপেক্ষা ছাড়া উপায় নেই।

আরও পড়ুন

×