ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬

মন্দা মোকাবিলায় আর্থিক শিক্ষা

মন্দা মোকাবিলায় আর্থিক শিক্ষা
×

প্রতীকী ছবি

জাহিরুল ইসলাম

প্রকাশ: ০৬ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

সম্প্রতি জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বে নজিরবিহীন একটি মন্দা আসন্ন। বস্তুত, মন্দা যখন আসে তার প্রভাব শুধু অর্থনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, সেটা বিস্তৃত হতে থাকে অন্যান্য ক্ষেত্রেও। এতে কঠিনতর হয় মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
অর্থনীতি সংক্রান্ত যে কোনো নেতিবাচক আভাসই বড় দুশ্চিন্তার। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দুশ্চিন্তা আরও বেশি এ কারণে যে, এখন বিশ্ববাসীকে লড়াই করতে হচ্ছে প্রাণঘাতী একটি অদৃশ্য ভাইরাসের বিরুদ্ধে এবং সেটা ঘরবন্দি থেকে। অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে কেউ বের হতে পারছে না। এতে বিপুল মানুষের শ্রমঘণ্টার যেমন অপচয় হচ্ছে, তেমনি অব্যবহূত থেকে যাচ্ছে উৎপাদন সম্ভাবনা। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে, কেউ সঠিক জানে না। এ পরিস্থিতি যত দীর্ঘ হবে, করোনা-সংকট অতিক্রম করে বেঁচে থাকা মানুষের জীবন সংগ্রাম তত কঠিনতর হবে। এ জন্য সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার পর সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে মানুষের আর্থিক স্বাস্থ্য উন্নত করার দিকে।
বাস্তবতা হলো, হাতে অর্থ থাকলেই মানুষের আর্থিক স্বাস্থ্যের উন্নতি হয় না। এ জন্য ব্যক্তির থাকা প্রয়োজন এর সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার মতো জ্ঞান। একাডেমিক ভাষায় যাকে বলা হয় আর্থিক শিক্ষা। এটি এমন এক ধরনের শিক্ষা, যা মানুষের আর্থিক বিষয়ে বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ঘটায় এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। এ শিক্ষার মাধ্যমে ব্যক্তি জানতে পারেন আয়-ব্যয়, দায়-সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে। আর্থিক শিক্ষা যাদের রয়েছে এবং এ বিষয়ে যারা বিচক্ষণ, আর্থিক ক্ষেত্রে অন্যদের তুলনায় এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অপেক্ষাকৃত বেশি।
সমাজে অনেক মানুষ আর্থিক ক্ষেত্রে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না শুধু এ-সংক্রান্ত শিক্ষার অভাবে। আমাদের সমাজে শিক্ষিত মানুষ আগের তুলনায় বাড়লেও আর্থিক শিক্ষায় নিরক্ষর থেকে যাচ্ছেন তাদের অনেকে। শিক্ষাজীবন শেষ করার পরও আয়-ব্যয় এবং দায়-সম্পদ ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব তাদের অনেকের কাছে অস্পষ্ট। তারা জানেন না, সম্পদ তৈরির মাধ্যমে আয় বৃদ্ধি করে কীভাবে একজন মানুষ ক্রমাগত আর্থিক সচ্ছলতার দিকে এগিয়ে যায় এবং দায় ক্রমাগত বৃদ্ধির কারণে একজন মানুষ কীভাবে ক্রমে নিঃশেষ হতে থাকে।
নিকট অতীতে অবশ্য মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা হয়েছে আর্থিক-পাঠ। ক্ষেত্র বিশেষে বাস্তব জীবনে এগুলোর প্রয়োগ থাকলেও মহামন্দা মোকাবিলা করে টিকে থাকার জন্য এ শিক্ষা যথেষ্ট বলে মনে হয় না। এ জন্য মাধ্যমিক পর্যায়ের বিভিন্ন শ্রেণিতে আর্থিক শিক্ষা-সংক্রান্ত যেসব পাঠ পড়ানো হচ্ছে, সে বিষয়েও নীতিনির্ধারকদের পুনর্বিবেচনা জরুরি।
মনে রাখা দরকার, সম্পদ অর্জন করার চেয়ে ধরে রাখা বেশি কঠিন। যে কোনো মন্দায় সম্পদের হাতবদল হয়। এ সময়ে একদল মানুষ তাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অপেক্ষাকৃত কম দামে সম্পদ বিক্রি করে। অন্যদিকে আরেক দল মানুষ সেটা কিনে নেয় বিত্ত বাড়ানোর জন্য। কীভাবে সম্পদ হাতবদল না করে তা থেকে অপেক্ষাকৃত বেশি আর্থিক সুবিধা নেওয়া যায়, বর্তমান সময়ে মানুষের সেই বিচক্ষণতাই জরুরি। বিশ্বায়নের এ যুগে নানা ক্ষেত্রে মানুষকে টিকে থাকতে হয় বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে। আর্থিক খাতও এর বাইরে নয়। আগামী দিনে খাতটিতে এই প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে। এ জন্য মানুষকে আর্থিক শিক্ষা অর্জনে উৎসাহ জোগাতে হবে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার স্বার্থে। এও ঠিক, মানুষের আর্থিক শিক্ষায় ঘাটতি থাকার কারণে এ মহামন্দার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে অনেক দেশেরই অপেক্ষাকৃত বেশি সময় লাগবে। আমাদের ক্ষেত্রে যেন এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়।
আর্থিক শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে পাঠ্যক্রমে প্রাত্যহিক জীবনের প্রায়োগিক বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি প্রচার মাধ্যমে এ বিষয়ক অনুষ্ঠান ও প্রকাশনা বাড়ানো যেতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক খাতে যারা কর্মরত রয়েছেন, তাদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আয়োজন করা যেতে পারে বিশেষ প্রশিক্ষণ। আর অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে যারা রয়েছেন, তাদের আর্থিক শিক্ষা দেওয়ার জন্য নিতে হবে সরকারি উদ্যোগ।
এ শিক্ষা জরুরি শুধু মানুষের আর্থিক স্বাস্থ্য উন্নতির জন্যই নয়, প্রাত্যহিক জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আর্থিক বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করে দ্রুততম সময়ে আসন্ন মহামন্দার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্যও। আর্থিক ক্ষেত্রে আমাদের সামনে যে নিদারুণ বাস্তবতা ও প্রতিযোগিতা আসন্ন, যথাযথ শিক্ষার মাধ্যমে মানুষকে প্রস্তুত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত জাতীয় স্বার্থেই।
ব্যাংক কর্মকর্তা
[email protected]

আরও পড়ুন

×