সোনালি ধানে মায়ের হাসি
×
এম আতিকুল ইসলাম বুলবুল
প্রকাশ: ১২ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
করোনা-পরবর্তী বিশ্বে সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে দেখা দিতে পারে খাদ্য সংকট। সংবাদপত্র পড়লে বোঝা যায়। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও নির্দেশ দিয়েছেন- দেশের একখণ্ড জমিও খালি রাখা যাবে না। ফসল উৎপাদানের মাধ্যমে আমাদের খাদ্যর চাহিদা পূরণের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ফসল উৎপাদন এবং দেশের মানুষের সারা বছরের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্বেগ বাঙালি মায়ের চিরন্তন স্বভাব। প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও তিনি একজন মা।
আমার জন্ম চলনবিলের নিভৃত পল্লিতে। বাবা তখন স্কুলশিক্ষক ছিলেন, বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। পরিবারের সদস্য সংখ্যাও ৯ জন। আর বাড়িতে কৃষি শ্রমিক দু'জন। সবমিলে এগারো জন। অথচ সে সময়ে বাবা যে টাকা শিক্ষকতা করে পেতেন, তা দিয়ে বড় সংসারের ব্যয় সংকুলান হতো না। শিক্ষক বাবা সাতসকালে হেঁটে বা সাইকেলে দূর গ্রামের স্কুলে যেতেন। বিকেলে বাসায় ফিরে যতটুকু জমি আছে, সেখানে কাজ করতেন বাড়িতে বার্ষিক চুক্তিতে থাকা কৃষি শ্রমিকদের সঙ্গে সমান্তরালে। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে।
নতুন ফসল ওঠার পর মা বাবাকে হিসাব করে করে বলতেন, বাৎসরিক পরিবারের ১১ সদস্যের খাদ্যর চাহিদা পূরণে ৭০-৮০ মণ ধান লাগবে। আর তখন বাবা সে ধান আলাদা করে দিতেন। মা সে ধানচাঁড়িতে ভেজাতেন, মধ্যরাতে ঘুম থেকে উঠে আমার বোনদের সঙ্গে নিয়ে সিদ্ধ করতেন। সকালবেলা রোদেলা উঠানে ধান শুকাতে দিতেন। পরে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করে চালকলে পাঠাতেন। বাড়িতে আসত নতুন চাল। সে চাল থেকে মা কাঁকর বের করে ডাবর ভরে রেখে দিতেন। নিশ্চিত হতেন একটি বছরের একটি পরিবারের খাদ্যের চাহিদার। শুধু আমার মা নয়, কৃষিপ্রধান দেশের লাখ লাখ মাই এভাবে অক্লান্ত পরিশ্রম করে পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চান।
মনে আছে, বাড়ির উঠানে ধান মাড়াই করা হতো গরু দিয়ে। স্থানীয়ভাবে একে মলন দেওয়া বলে। এই কাজ আমিও করেছি। সে সময়ে একটি বিষয় লক্ষ্য করতাম। কৃষি কাজে ব্যবহূত লাঙ্গল, জোয়াল, ধান বোয়ানোর ডালি বা ঢাকি, সাড়পাট, ঝাঁটা, চালুন অথর্?াৎ ধান নেওয়ার কাজে ব্যবহূত উপকরণগুলোতে কাজ করার সময় অসাবধানতাবশত পা লেগে গেলে মায়েরা খুব রাগ করতেন। কারণ কৃষি উপকরণ তাদের কাছে লক্ষ্মী সমতুল্য। বৈশাখ মাসে বোরো ধান ওঠার পরে পরিবারের সারা বছরের প্রয়োজনীয় চাল মজুদ করা শেষ হওয়ার পর মা হাসতেন। কী সেই পবিত্র হাসি! আমাদের দেশের মায়েরা তাদের সন্তানদের তিন বেলা পেট পুরে খাওয়াতে পারলেই সন্তুষ্ট। গ্রামের সব মাই চায়- সন্তান দুধে-ভাতে না থাকুক, শাক-ডাল দিয়েই যেন ভাতের কষ্ট না করে।
এটা ঠিক বাংলাদেশ খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু তারপরও করোনার কারণে নতুন করে খাদ্য নিরাপত্তার কথা ভাবতে হচ্ছে। এতে কৃষক থেকে শুরু সরকার পর্যন্ত কাজ করতে হবে। আমাদের দেশের মানুষের খাদ্যের চাহিদা পূরণে একমুঠো ধানও নষ্ট করা যাবে না। একখণ্ড জমিও অনাবাদি রাখা যাবে না। এজন্য সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
কয়েক দিন আগে দেখলাম, একজন কৃষি শ্রমিক মাঠ থেকে ধান কেটে ধানের বোঝা মাথায় নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। বোঝাটি দেখে মনে হয়েছিল, ওনার শরীরের ওজনের চেয়ে ধানের বোঝার ওজন বেশি হবে। তাই শরীর থেকে ঘাম ঝরচ্ছিল। এসব কৃষকের ঘাম দিয়েই নিশ্চিত হচ্ছে দুঃসময়ের খাদ্য নিরাপত্তা, আমরা যেন ভুলে না যাই। কৃষকের সঙ্গে যোগ দিতে হবে কৃষি কর্মকর্তাদের।
মা তথা নারীর কথায় ফিরি। আমার এলাকার কৃষি কর্মকর্তা একজন নারী। মাঝে মাঝে তাকে দেখি স্যান্ডেল খুলে হাতে নিয়ে জমির সরু আইল ধরে হেঁটে হেঁটে কৃষকের জমি, ফসল, মাটিসহ অনেক কিছু দেখছেন। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে সমস্যা শুনে সমাধান করছেন। নারী বলেই কি তিনি আমাদের পরিবারের মায়ের মতো ধানের উৎপাদন নিশ্চিত করতে এতটা আন্তরিক? এভাবে সব কৃষি কর্মকর্তা যদি কৃষকের পাশে থাকেন, করোনার দুঃসময় পাড়ি দেওয়া কঠিন হবে না। দেশের প্রতিটি ইঞ্চি জমিতে ফলানো যাবে সোনার ফসল।
কলেজ শিক্ষক ও সমকালের
তাড়াশ প্রতিনিধি
আমার জন্ম চলনবিলের নিভৃত পল্লিতে। বাবা তখন স্কুলশিক্ষক ছিলেন, বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। পরিবারের সদস্য সংখ্যাও ৯ জন। আর বাড়িতে কৃষি শ্রমিক দু'জন। সবমিলে এগারো জন। অথচ সে সময়ে বাবা যে টাকা শিক্ষকতা করে পেতেন, তা দিয়ে বড় সংসারের ব্যয় সংকুলান হতো না। শিক্ষক বাবা সাতসকালে হেঁটে বা সাইকেলে দূর গ্রামের স্কুলে যেতেন। বিকেলে বাসায় ফিরে যতটুকু জমি আছে, সেখানে কাজ করতেন বাড়িতে বার্ষিক চুক্তিতে থাকা কৃষি শ্রমিকদের সঙ্গে সমান্তরালে। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে।
নতুন ফসল ওঠার পর মা বাবাকে হিসাব করে করে বলতেন, বাৎসরিক পরিবারের ১১ সদস্যের খাদ্যর চাহিদা পূরণে ৭০-৮০ মণ ধান লাগবে। আর তখন বাবা সে ধান আলাদা করে দিতেন। মা সে ধানচাঁড়িতে ভেজাতেন, মধ্যরাতে ঘুম থেকে উঠে আমার বোনদের সঙ্গে নিয়ে সিদ্ধ করতেন। সকালবেলা রোদেলা উঠানে ধান শুকাতে দিতেন। পরে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করে চালকলে পাঠাতেন। বাড়িতে আসত নতুন চাল। সে চাল থেকে মা কাঁকর বের করে ডাবর ভরে রেখে দিতেন। নিশ্চিত হতেন একটি বছরের একটি পরিবারের খাদ্যের চাহিদার। শুধু আমার মা নয়, কৃষিপ্রধান দেশের লাখ লাখ মাই এভাবে অক্লান্ত পরিশ্রম করে পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চান।
মনে আছে, বাড়ির উঠানে ধান মাড়াই করা হতো গরু দিয়ে। স্থানীয়ভাবে একে মলন দেওয়া বলে। এই কাজ আমিও করেছি। সে সময়ে একটি বিষয় লক্ষ্য করতাম। কৃষি কাজে ব্যবহূত লাঙ্গল, জোয়াল, ধান বোয়ানোর ডালি বা ঢাকি, সাড়পাট, ঝাঁটা, চালুন অথর্?াৎ ধান নেওয়ার কাজে ব্যবহূত উপকরণগুলোতে কাজ করার সময় অসাবধানতাবশত পা লেগে গেলে মায়েরা খুব রাগ করতেন। কারণ কৃষি উপকরণ তাদের কাছে লক্ষ্মী সমতুল্য। বৈশাখ মাসে বোরো ধান ওঠার পরে পরিবারের সারা বছরের প্রয়োজনীয় চাল মজুদ করা শেষ হওয়ার পর মা হাসতেন। কী সেই পবিত্র হাসি! আমাদের দেশের মায়েরা তাদের সন্তানদের তিন বেলা পেট পুরে খাওয়াতে পারলেই সন্তুষ্ট। গ্রামের সব মাই চায়- সন্তান দুধে-ভাতে না থাকুক, শাক-ডাল দিয়েই যেন ভাতের কষ্ট না করে।
এটা ঠিক বাংলাদেশ খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু তারপরও করোনার কারণে নতুন করে খাদ্য নিরাপত্তার কথা ভাবতে হচ্ছে। এতে কৃষক থেকে শুরু সরকার পর্যন্ত কাজ করতে হবে। আমাদের দেশের মানুষের খাদ্যের চাহিদা পূরণে একমুঠো ধানও নষ্ট করা যাবে না। একখণ্ড জমিও অনাবাদি রাখা যাবে না। এজন্য সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
কয়েক দিন আগে দেখলাম, একজন কৃষি শ্রমিক মাঠ থেকে ধান কেটে ধানের বোঝা মাথায় নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। বোঝাটি দেখে মনে হয়েছিল, ওনার শরীরের ওজনের চেয়ে ধানের বোঝার ওজন বেশি হবে। তাই শরীর থেকে ঘাম ঝরচ্ছিল। এসব কৃষকের ঘাম দিয়েই নিশ্চিত হচ্ছে দুঃসময়ের খাদ্য নিরাপত্তা, আমরা যেন ভুলে না যাই। কৃষকের সঙ্গে যোগ দিতে হবে কৃষি কর্মকর্তাদের।
মা তথা নারীর কথায় ফিরি। আমার এলাকার কৃষি কর্মকর্তা একজন নারী। মাঝে মাঝে তাকে দেখি স্যান্ডেল খুলে হাতে নিয়ে জমির সরু আইল ধরে হেঁটে হেঁটে কৃষকের জমি, ফসল, মাটিসহ অনেক কিছু দেখছেন। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে সমস্যা শুনে সমাধান করছেন। নারী বলেই কি তিনি আমাদের পরিবারের মায়ের মতো ধানের উৎপাদন নিশ্চিত করতে এতটা আন্তরিক? এভাবে সব কৃষি কর্মকর্তা যদি কৃষকের পাশে থাকেন, করোনার দুঃসময় পাড়ি দেওয়া কঠিন হবে না। দেশের প্রতিটি ইঞ্চি জমিতে ফলানো যাবে সোনার ফসল।
কলেজ শিক্ষক ও সমকালের
তাড়াশ প্রতিনিধি