ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬

চিকিৎসাসেবা

ঘুরে ঘুরে মরে যাওয়াই নিয়তি!

ঘুরে ঘুরে মরে যাওয়াই নিয়তি!
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১২ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

আমরা জানি, চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। কিন্তু সংবিধান স্বীকৃত এই অধিকারের বেহাল অবস্থা ফের ফুটে উঠেছে চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত রোগীর প্রাণহানির মর্মন্তুদতার মধ্য দিয়ে। রোববার 'হাসপাতাল ঘুরে ঘুরে মারা গেলেন অতিরিক্ত সচিবও' শিরোনামযুক্ত সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি চোখে আঙুল দিয়ে পুনর্বার তা-ই দেখিয়ে দিল। কিডনি জটিলতায় অসুস্থ খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব গৌতম আইচ সরকারের বলতে গেলে প্রায় বিনা চিকিৎসায় প্রাণহানি সঙ্গতই দেখিয়েছে দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের বাস্তব চিত্র। শুধু গৌতম আইচই নন, করোনা দুর্যোগকালে এর আগেও ঘুরে ঘুরে বিনা চিকিৎসায় অন্য রোগে আক্রান্ত রোগী রাস্তায়ই মারা গেছেন। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল কিংবা চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর কর্তৃপক্ষের এমন দায়হীন কর্মকাণ্ড আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না।
যে ৩৩৩ হটলাইন নম্বর থেকে স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে সরকার, সেখানে দায়িত্ব পালনরত গৌতম আইচ সরকারের চিকিৎসক কন্যা ডা. সুস্মিতা আইচ হাসপাতালের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও বাবার চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে পারেননি। গৌতম আইচ করোনা আক্রান্ত না হওয়া সত্ত্বেও করোনা বিশেষায়িত হাসপাতাল ছাড়া অন্য কোনো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই কেন তাকে চিকিৎসাসেবা দেয়নি- এ প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায় হাসপাতালগুলোর কর্তৃপক্ষ ও সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো, অধিদপ্তর এড়াতে পারে না। সরকারের একজন ঊর্ধ্বতন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও সরকারেরই স্বাস্থ্যসেবা দানের শাখায় কর্মরত চিকিৎসক সন্তানের বাবারই যদি চিকিৎসাসেবা পেতে এমন অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। অনেক চেষ্টার পর শেষ পর্যন্ত বৃহস্পতিবার রাতে কিডনি জটিলতায় আক্রান্ত গৌতম আইচকে কুর্মিটোলায় ভর্তি করা হলেও ততক্ষণে তার অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে এবং একদিন পর মৃত্যুবরণ করেন।
এই করোনা-দুর্যোগকালে চিকিৎসাসেবাদানে মানবিকতার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে শনিবারই আমরা সমকালের সম্পাদকীয় স্তম্ভে লিখেছিলাম। কিন্তু এমন ঘটনার ক্ষেত্রে বিষয়টিকে শুধু মানবিকতার গণ্ডিবদ্ধ রাখার অবকাশ নেই। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলদের দায়বদ্ধতার বিষয়টির পাশাপাশি ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির প্রসঙ্গও সামনে উঠে আসে। করোনা উপসর্গে যেমন, তেমনি অন্য ব্যাধি আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবা না পাওয়া সংক্রান্ত হৃদয়বিদারক খবর ইতেমধ্যে সংবাদমাধ্যমে কম উঠে আসেনি। করোনা দুর্যোগকালেই যে কেবল আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থার বিপর্যস্ত চিত্র দেখা গেছে, তাই নয়; এর আগেও আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রশ্নমুক্ত ছিল না। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে শুধু বাংলাদেশই নয়, প্রায় গোটা বিশ্বই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। যেহেতু ব্যাধিটি সংক্রামক, সেহেতু এই প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে তোলা হয়েছে এবং এখনও তা অব্যাহত আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অন্য সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে অন্যান্য রোগী কেন চিকিৎসাসেবা পাবেন না?
আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, দেশের অনেক সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অন্য ব্যাধিতে আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবা প্রদানে এই ক্রান্তিকালে নানা রকম কসরত করে চলেছে। নিঃসন্দেহে তা অত্যন্ত গর্হিত বলে আমরা মনে করি। একই সঙ্গে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির কারণেও হয়েছে বলে ধারণা করা যায়। বিপর্যস্ত চিকিৎসাসেবার এই চিত্র কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। আমাদের স্বাস্থ্য খাতে সমন্বয়হীনতা, নিয়ন্ত্রণহীনতা, পেশাদারিত্বের অভাব, স্তরে স্তরে অব্যবস্থাপনা সামগ্রিকভাবে চিকিৎসাসেবাকে হুমকির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। মুমূর্ষু রোগীদেরও কোনো অনুকম্পা দেখানো হয় না। গৌতম আইচরা এরই অনাকাঙ্ক্ষিত মর্মান্তিক দৃষ্টান্ত। এমন নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির অবসানে রাষ্ট্রের কঠোর হস্তক্ষেপ জরুরি।
চিকিৎসাসেবা গ্রহীতাদের ব্যবস্থাপনাগত নানাবিধ ত্রুটির ব্যাপক তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অনেক হাসপাতাল কিংবা রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসাকেন্দ্রের দায়িত্বশীল অনেকেরই স্বেচ্ছাচারিতা, অদক্ষতা, নীতিহীনতার যেসব খবর সংবাদমাধ্যমে কখনও কখনও উঠে আসে, তাও ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটিরই বিরূপ ফল। এর আশু নিরসন হোক। স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়। রোগীর স্বার্থ দেখতে হবে সর্বাগ্রে। ব্যক্তি কিংবা কর্তৃপক্ষের ইচ্ছা-অনিচ্ছা মুখ্য বিষয় হতে পারে না। আমরা মনে করি দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি এ ব্যাপারে আরও মনোযোগী হওয়া জরুরি। আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে সত্য কিন্তু তাই বলে এমন আচরণ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিনা চিকিৎসায় কারও প্রাণহানির দায় সরকার এড়াতে পারে না। এ বছর ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া পরিস্থিতি খারাপের শঙ্কাও রয়েছে। সবকিছু মাথায় রেখে স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধনে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ব্যবস্থা ভালো না করে অবস্থা ভালোর আশা দুরাশারই নামান্তর।

আরও পড়ুন

×