ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬

আমার ছোটবোন করোনা পজিটিভ

আমার ছোটবোন করোনা পজিটিভ
×

টোকন ঠাকুর

প্রকাশ: ১২ মে ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৩ মে ২০২০ | ১২:০০

ইতিহাসের এই সময় আমাদের দেখার মধ্যে ছিল না। মানুষের সঙ্গে মানুষের এমন নিষ্ঠুর সম্পর্ক আমরা দেখিনি। স্বাভাবিক জীবনাচরণের অভ্যাস ভেঙে নতুন এক রীতিতে এসে আটকে পড়তে হবে- এমন তো আমরা কেউ ভাবিনি। আমরা কয়েকটি কম ব্যবহৃত শব্দের মুখোমুখি আজ। আমরা পাড়াগাঁর মানুষ, কীভাবে জানব কভিড-১৯ কী? নভেল করোনাভাইরাস কী? কোয়ারেন্টাইন বলতে কী বোঝায়? আইসোলেশন শব্দটি কখনও-সখনও শোনা যায় বটে কিন্তু তাই বলে ২০২০ সালে এসে হঠাৎ শুনতে হবে 'প্যানডেমিক' অর্থাৎ বিশ্বের একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চল ভাইরাসঘটিত রোগ দ্বারা আক্রান্ত এবং বাকি অঞ্চলও ঝুঁকির বাইরে নয়। পৃথিবী করোনা আজ। আক্রান্ত বাংলাদেশ। শহর-বন্দর ছাড়িয়ে আক্রান্ত বাংলার গ্রাম-জনপদ। করোনা মহামারিতে পৌঁছে গেছে। ফলত, মানুষের চিন্তারেখাও আর আগের মতো নেই। মানুষ বদলে যাচ্ছে। করোনা-বাস্তবতা নতুন এক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের। নতুন এক স্তরে পৌঁছে যাচ্ছে পরিপার্শ্ব।
বদলে যাচ্ছে রাজনীতি-অর্থনীতি-সংস্কৃতি, জীবনযাপন, মানবিক মূল্যবোধ। মানুষের সামাজিক সম্পর্কে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কোনো কোনো সমাজবিজ্ঞানী অনুমান করছেন, মানুষ আর আগের জায়গায় ফিরতে পারবে না। পরিস্থিতিই এমন, করোনা-আক্রান্ত যে মরার মরবে, যে বাঁচার বাঁচবে। সে আমিও হতে পারি, তুমিও হতে পার। যারা মারা যাচ্ছে, তারাও বেঁচে থাকতে 'আমি' ছিল, এতদিন তারাও 'তুমি' ছিল। ফলত, অনেক 'আমি' মরে গেছি এরই মধ্যে, অনেক 'তুমি'ও মরে গেছ। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসছে অনির্ধারিত, অচেনা, নিঃসঙ্গতার ঘেরাটোপ। তাই করোনা সন্দেহে মাকে জঙ্গলে ফেলে গেল তার সন্তানথপুত্রেরা। কী নির্মম! হাসপাতালের বারান্দা থেকে করোনা আক্রান্ত পুত্রকে অ্যাম্বুলেন্সে ওঠানোর জন্যে পিতা পাচ্ছেন না কোনো সাহায্যকারী। ছোঁয়াচে ভাইরাস করোনার কারণে পিতা নিজের কাঁধেই টেনে নিলেন তার পুত্রকে, জীবনের গভীরতম খেদে উচ্চারণ করলেন, 'দেশ মইরা গেছে, তোর বাপ তো মরেনি এখনও, আয়, আমার কাঁধে আয়।' এ কথাটি মনে হয় কখনও ভুলতে পারব না। করোন-আক্রান্ত লাশ নিয়ে নিজের গ্রামে ঢুকতে পারছে না কোনো স্ত্রী ও সন্তান। লাশ দাফন করতে দেবে না প্রতিবেশীরা। লাশ নিয়ে রাস্তায়, পথে পথে স্বজনরা। কোথাও মরদেহ কবর দেওয়ার আগে তার জানাজার জন্য খাটিয়া দিতে নারাজ গ্রামবাসী। করোনা মোকাবিলায় হাসপাতাল নির্মাণেও বাধা দিল ঢাকা শহরেই, মহল্লার লোকেরা। কোথাও লাশ ফেলে গেছে কারা, তার হদিস নেই। ডাক্তার-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীরা আক্রান্ত আজ, আক্রান্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, আক্রান্ত গণমাধ্যমকর্মী। সোশ্যাল মিডিয়া সরগরম। ফেসবুক তোলপাড়। করোনার কোপে মৃতদের লাশের ছবি ভেসে উঠছে একটার পর একটা। শোক-দুঃখগাথার প্লাবন তৈরি হচ্ছে। যিনি মারা যাচ্ছেন বা করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন, তিনি কারও স্বজন, কারও বাবা বা মা, ভাই বা বোন কিংবা স্ত্রী বা সন্তান। দরকার আক্রান্তের পাশে থাকা, কিন্তু চারদিকে ঘটছে এর বিপরীত কিছু। প্রচারণা দরকার ছিল শারীরিক দূরত্ব রক্ষা করার, প্রচারণা হয়ে গেল সামাজিক দূরত্বের। দরকার ছিল আরও বেশি মানবিক হয়ে ওঠার, কিন্তু অমানবিকতাই ফণা মেলে ধরছে।
ঠিক তিন মাস আগের কথা। চীনের উহানে যখন করোনার দাপট শুরু হয়, আমরা ঢাকায় প্রতিদিন বিকেলে বা সন্ধ্যায় তখন অমর একুশে বইমেলায় যাচ্ছি। রাতে ঘরে ফিরে দু-একটি ভিডিওচিত্রে দেখছিলাম, উহানের ঘরবন্দি মানুষের সম্মিলিত কান্না ও তাদের জাতীয় সংগীত একাকার হয়ে ভেসে যাচ্ছিল। অতটা বুঝতে পারিনি। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তখনই ডিক্লেয়ার দেয়, করোনা বিশ্বময় ছড়াবে। ঠিক দু'মাস আগের কথা। ইরান, ইতালি আক্রান্ত। তখনও কি অতটা বুঝতে পেরেছি? তারপর গোটা ইউরোপ-আমেরিকা-লাতিন আমেরিকা-আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া বা বাংলাদেশেও এখন করোনা আক্রান্তের হার বাড়ছে। মানুষের মৃত্যুর মিছিল চলছে। করোনাজনিত কারণেই লকডাউন চলছে। মানুষ মরে যাচ্ছে ক্ষুধায়, অনাদরে, প্রাপ্য চিকিৎসাটুকু না পেয়েই। মনে হচ্ছে, দীর্ঘ-বিস্তৃত এক গভীর সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকে পড়ছি আমরা। আমাদের জানা নেই, সুড়ঙ্গের শেষে আগ্নেয়গিরি, না মহাপ্লাবন স্বাগত জানাবে আমাদের? করোনাভাইরাসে বিপন্ন করে ফেলেছে মানুষের জীবন। সর্বক্ষণ এক আতঙ্কবোধক পৃথিবীতে ঢুকে পড়েছি আমরা। কিছুই আর আগের মতো নেই। মানুষের মনেই শান্তি নেই। আস্তে আস্তে লকডাউন হয়ে আসছে আমাদের পৃথিবী। ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ছে মানুষের বেঁচে থাকা। ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে অনেক স্বপ্ন, সম্ভাবনা।
প্রত্যেকেই হয়তো ভাবছে, আমার করোনা হবে না, হলে অন্য কারোর হবে। সেই 'অন্য' আর 'নিজের' পার্থক্য কী? কিন্তু করোনা আমাদের কিছুই শিখিয়ে যাচ্ছে না- এমন তো নয়! বরং এও মনে হচ্ছে, করোনা মানুষকে আরও এক অন্যমাত্রার বোধে উন্নীত করে দিয়ে যাচ্ছে, যে বোধ হয়তো আগে ছিল না। ফলত, মোটেই আতঙ্কিত হওয়ার নয়, ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনাও ডাক দিচ্ছে এই প্রাণঘাতী ভাইরাস কভিড-১৯। করোনাজনিত যেসব নির্মমতা আমাদের সামনে দৃশ্যমান হচ্ছে, মানব সম্পর্কের মধ্যে সেই নির্মমতা লুক্কায়িত আগেও ছিল। সন্ধিক্ষণে এখন তা বেরিয়ে পড়ছে। আমার ঢাকায় বসবাসের জীবনে আমি করোনাকে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছি।
এর মধ্যেই, এক সকালে ঝিনাইদহ থেকে আসা একটি ফোনে আমার ঘুম ভাঙল। সে-ফোন আমার মায়ের। মা হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে জানালেন, 'বীথির করোনা পজিটিভ এসেছে। আমরা এখন কী করব?' বীথি আমার ছোটবোন, সরকারি চাকরি করছে, ঝিনাইদহেই। ২৫ এপ্রিল সকালে মায়ের ফোন পাই। ওই দিনই করোনা পজিটিভ রেজাল্ট এসেছে। রেজাল্ট এসেছে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী করোনা ক্যাম্প পরীক্ষাগার থেকে। অবশ্য এটা আমার জানা ছিল যে, এর তিন দিন আগে, ২২ এপ্রিল যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী করোনা ক্যাম্প থেকে স্বাস্থ্যকর্মীরা এসে আমার ছোটবোন বীথি, ওর হাজব্যান্ড ও ওর শাশুড়ির নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। এই তিনজনের মধ্যে আমার ছোটবোনেরই শুধু করোনা পজিটিভ রেজাল্ট আসে। মায়ের সঙ্গে কথা বলার পর আমি ছোটবোনকে ফোন দিলাম কিন্তু ওকে তখনও কিছু জানানো হয়নি। ফোন দিই বীথির হাজব্যান্ড কাজলকে। কাজল জানাল, 'হ্যাঁ, পজিটিভ।' কাজল আরও জানাল, 'থানা থেকে ফোন করে জানিয়েছে পুলিশ আসবে কিছুক্ষণ পরই, আমাদের বাড়ি লকডাউন করা হবে। সিভিল সার্জন অফিস থেকেও লোক আসবে। আমাদের বাড়ি থেকে বের হওয়া নিষেধ। বীথি একটা রুমে আইসোলেশনে আছে।'
ছোট্ট শহর ঝিনাইদহ। শহরজুড়ে প্রতিক্রিয়া, করোনা পজিটিভ প্যাশেন্ট অবস্থান করছে ঝিনাইদহে। করোনা পজিটিভের নাম-ঠিকানা গোপন রাখার কথা কিন্তু আমার ছোটবোনের বেলায় এটা থাকেনি। এই না থাকার ভীষণ খারাপ ফল বহন করতে হলো আমাদের পুরো পরিবারকে। ছোটবোনের করোনা পজিটিভ হওয়া নিয়ে স্থানীয় একটি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে দিয়ে দেন, তিনি লেখেন যে, অমুকের ছোটবোন করোনা পজিটিভ। যেখানে গোপনীয়তা রক্ষা করার কথা, সেখানে আমার নামেই তিনি তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে বিস্তারিত লিখে দেন। তারপর ওখান থেকেই প্রকাশ হওয়া একটি অনলাইন পোর্টালে নিউজ আকারেই আকারে-ইঙ্গিতে নামধাম প্রায় প্রকাশ করে ফেলে। তারা হয়তো বুঝতেও পারেনি, ফলাফল কী ঘটবে! যা যা ঘটল, আমার বয়স্ক বাবা-মা, আরেক বোন ও তার দুই মেয়ে, ওরা কিছু নির্মম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি পড়ল। স্থানীয় কিছু মানুষের নিষ্ঠুর আচরণ নিতে হচ্ছিল, যা মোটেও কাম্য ছিল না। ঢাকায় থেকে আমি সেই অভিজ্ঞতার অংশ হচ্ছিলাম প্রতিমুহূর্তে। কিছু মানুষ সংঘবদ্ধ হয়ে আমার আরেক বোনের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে গালি দিয়ে যাচ্ছে। এক বোন যেহেতু করোনা পজিটিভ, এই বোনের ফ্যামিলি থেকেও হয়তো করোনা ছড়াতে পারে- এই তাদের অভিযোগ। দু-দু'বার তাদের আক্রমণাত্মক অবস্থান এমন পর্যায়ে পৌঁছল যে, ইমার্জেন্সি লাইনে ফোন করে পুলিশ ডাকতে হলো দু'বারই। ঢাকায় বসে আমার খুব অসহায় লাগছিল এ জন্য যে, আমি কিছুই করতে পারছি না সে-অবস্থায়। অথচ ছোটবোন করোনা আক্রান্ত বলে আড়াই কিলো দূরের অন্য বোনকে সেই চাপ নিতে হচ্ছে। এ কেমন বিবেচনা? অবাক লাগে, মানুষ এত মূর্খ হয়? মানুষ এমন অমানুষ হয়? যে মানুষ করোনা পজিটিভ, সে ভিনগ্রহের কোনো এলিয়েন নয়। তার ফ্যামিলির অন্য একটি অংশের সঙ্গে যখন কয়েকজন লকডাউন ভেঙে দলগত হয়ে যাচ্ছে- তাই গালিগালাজ করে, বাড়ির সামনে গিয়ে মারতে ঔদ্ধত্য দেখায়, যখন নিরাপত্তার জন্য পুলিশ ডাকতে হয়- তখন তাদের ভেতর থেকে যে হিংস্রতা বেরিয়ে আসে, তাতে কী প্রমাণিত হয়? সেই বেঁচে থাকাদের দিয়ে নিশ্চয়ই কারও মঙ্গল হতে পারে না। যেদিন বীথির করোনা ধরা পড়ার রেজাল্ট আসে এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, আমি ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস লিখি, বাঁচি মরি, ভাইবোন একসঙ্গে লড়ব। লড়াই-ই জীবন।' সারাক্ষণ অনলাইনে আছি এরপর থেকে। ফোন কনফারেন্সে কথা বলছি আমার ছোটবোন বীথি, অন্য বোন, বোনের দুই মেয়ের সঙ্গে বর্ষা ও তা থৈ, আমার বাবা-মা- দিনে কয়েকবার করে অনলাইনে যুক্ত হয়ে ফোন কনফারেন্স করে যাচ্ছি আমরা। বীথিকে সাহস দিতে হবে, ওর মনোবল যেন কোনো অবস্থাতেই সামান্যতম ভেঙে না পড়ে, সেই চেষ্টা আমার ছিল, আমাদের পরিবারের অন্য সবার ছিল এবং এখনও আছে। যদিও বীথি নিজ থেকেই অনেক বেশি মনোবল ও সাহস নিজের মধ্যে পোষণ করে যাচ্ছে, এটাই একটা বিরাট ব্যাপার। আমরা মনোযোগী থেকেছি, বীথি যেন ভেঙে না পড়ে। বীথিও চেয়েছে, আমরা যেন ভেঙে না পড়ি। এমন হয়েছে যে, আমার অন্য বোন ব্যাংকে গেছে টাকা তুলতে, করোনা পজিটিভের বোন হওয়ায় ওকে এক ঘণ্টা ব্যাংকের বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের আরএম এবং ম্যানেজারকে ফোন করে সমাধা করতে হয়েছে। ঠিক সেই সময়ে আমার ছোটভাগ্নি, যার বয়স মাত্র আট, তা থৈ আমাকে ভিডিও কলে ফোন দিলে দেখি, ওর মুখে আতঙ্ক। ফিসফিস করে আমকে বলল, 'মামা, কারা যেন বাসার বাইরে তালামারা গেট ঝাঁকাচ্ছে।' তা থৈয়ের এক হাতে মোবাইল ফোন, অন্য হাতে একটি বঁটি। কিন্তু সারামুখে ভয়। বললাম, 'তোর মা কই?' ভাগ্নি বলল, 'ব্যাংকে গেছে।' ওর বাবা আকাশ বাইরে থাকায় বাসায় আর কেউ নেই। লকডাউন থাকায় আমার অন্য ভাগ্নিটা তখন আমাদের বাড়িতে। একটা ঝড়ঝঞ্ঝা পরিস্থিতি। আবার বাড়িতে কিছু মূর্খ ও নাদান শ্রেণির মানুষ যখন আক্রমণে আসে, তখন আরেক ভাগ্নি, বর্ষা, যে-কিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, রাস্তায় রিকশা না থাকায় বর্ষা তখন দৌড়ে গেছে থানায়। একটা আতঙ্কজনক বাস্তবতা। সবই ঘটছে ছোটবোন বীথি করোনা পজিটিভ বলে। অথচ ছোটবোন তখন সিভিল সার্জন ও প্রশাসনের নিয়ম অনুযায়ী ওর শ্বশুরবাড়িতে, আইসোলেশনে। যার সঙ্গে সামনাসামনি সাক্ষাৎ নেই আমাদের পরিবারের অন্য কারোর। আমরা মনে করেছি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর স্বার্থে বীথির জন্যে প্রথম ১৪/১৫ দিনের দুপুর ও রাতের খাবার আমাদের বাড়ি থেকে গেলেই ভালো। কারণ, ওর হাজব্যান্ড ও শাশুড়ির করোনা নমুনা নিয়ে যাওয়াতে তারাও চাপে থেকেছে এবং সেখানেই একটি রুমে বীথি আইসোলেশনে থাকায় তাদেরও সতর্ক থাকার প্রয়োজন ছিল। ছোটবোনের জন্যে পুষ্টি প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার দরকার বটে, কিন্তু সেই খাবার নিয়ে যাবে কে? প্রশাসন নিয়ম অনুযায়ী ওদের বাড়ি লকডাউন করে গেছে। জীবনে চারবার অ্যানেসথেশিয়া অপারেশন হয়ে যাওয়াই আমার মায়ের শরীর আর আগের মতো নেই। তাই বীথির জন্যে রান্না করতে গিয়ে মার হাতের আঙুল পুড়ে গেছে। যে কোনো সন্তানের তার মায়ের রান্নাই সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে, বীথিরও তাই লাগবে, আমরা ভেবেছি। কষ্টটা মাকেই করতে হচ্ছে। আমাদের বাড়ি থেকে মাত্র ৩০ মিনিটের দূরত্বে বীথির বাড়িতে খাবার পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে দেয় আমার কলেজে পড়ার সময়ের বন্ধু কাজী কামাল আহমেদ বাবু। আশিক নামের একটি ছেলেকে ম্যানেজ করে দেয়, যে-কিনা 'নছিমন' চালায়, যার বয়স মাত্র ১৭/১৮। ১৪/১৫ দিন ধরে আশিক সেই দুইবেলার খাবার একসঙ্গে নিয়ে গিয়ে রাখে বীথিদের বাড়ির পেছনে, পাঁচিলের ওপর, সেখান থেকে কাজল সেটা নিয়ে গিয়ে বীথির ঘরের দরজার সামনে রাখে, বীথি সেখান থেকে নিয়ে নেয়। কাউকে না পেলে আমার ভাগ্নি বর্ষাই খাবার নিয়ে যেতে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু স্থানীয় ডাক্তার হামিদুননেসা পাখি আমাকে ফোনে জানালেন, 'বর্ষাকে না পাঠানোই ভালো। রাস্তায় তো রিকশাও পাবে না'। ডাক্তার পাখি একটি পিপিই দিয়েছেন সে সময়। কবি কাজী গিয়াস আহমেদও বিষয়টা তদারকি করেছেন নিয়মিত। তাই বন্ধু বাবু ম্যানেজ করে দিল যে ছেলেটিকে, সেই আশিক নছিমন পরিবহনের ড্রাইভার, আশিক এই দায়িত্বটা খুব ভালোভাবে পালন করেছে আমাদের জন্য। ডাক্তার কাজী বৃষ্টি আহমেদ আমাকে ফেসবুকে প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দিয়ে গেছেন। বৃষ্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর গণস্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ে ডাক্তার হয়েছে। এই পরিবারের আরেকজন মেম্বার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলার শিক্ষক কাজী শুসমিন আফসানা শিমু বীথির করোনা বিষয়ে শক্তি জোগাচ্ছিল দূরে থেকেও।
করোনার খবর পড়া, টিভিতে দেখা, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে জ্ঞাত হওয়া আর পারিবারিকভাবে করোনা থেকে উদ্ভূত অভিজ্ঞতা এক নয়, এটা বুঝতে পারলাম প্রথম দিনেই, যেদিন বীথির করোনা শনাক্ত হয়। রাজনীতিক শফি আহমেদের সঙ্গে ফেসবুকে কথা হচ্ছিল, বলি, 'শফি ভাই, আমার ছোটবোন করোনা পজিটিভ।' তিনি আমাকে একটি ফোন নাম্বার দেন। ফোন করি। ধরেন ডাক্তার কাজী মুশতাক হোসেন, মহাখালী ক্যান্সার হাসপাতালের পরিচালক। তিনি কিছু পরামর্শ দেন আমাকে। কৃতজ্ঞ আমি শফি ভাই ও মুশতাক ভাইয়ের কাছে। ঢাকায় আমার অনেক দিনের পরিচিত সাংবাদিক হুমায়ুন কবির খোকন মারা গেলেন করোনায়, তার স্ত্রীও করোনায় আক্রান্ত। অধুনালুপ্ত দৈনিক মুক্তকণ্ঠের সহকর্মী সাংবাদিক মাহমুদুল হাকিম অপু মারা গেলেন। সিটি ব্যাংক লিমিটেডের মানবসম্পদ বিভাগের ফার্স্ট ভাইস-প্রেসিডেন্ট মুজতবা শাহরিয়ার মারা গেলেন করোনায়, সিটি ব্যাংকের এমডি আমার বন্ধু মাসরুর আরেফিন ফেসবুকে একটি দীর্ঘ শোকগাথা লিখলেও- আমি এসব মৃত্যুতে ফেসবুকে কিছুই লিখিনি, পাছে আমার ছোটবোন এসব পড়ে যদি ওর মনোবলে চিড় ধরে! আমার ছোটবোন করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর আমি মন খারাপ হয়- এমন কোনো কিছুই আর ফেসবুকে পোস্ট দিতে চাইনি। কেননা, করোনায় আমার ছোটবোন মারা যাচ্ছে- এটা আমি ভাবতেই পারছিলাম না। কতবার যে চোখ ফেটে ওর জন্য লবণজল বেরিয়েছে, নিজেই তা চেপে গেছি। আমরা তিন ভাইবোনের মধ্যে বীথি ছোট, ওকে তো আমিই কোলে করে রাখতাম ছোটবেলায়। বরং ৭৯ বছরের অভিনেতা সৈয়দ গোলাম সারওয়ার বা আমাদের হক ভাই কীভাবে করোনাযুদ্ধে জয়ী হলেন, সেই সত্যটা দৃঢ়টার সঙ্গে লিখেছি। সাহস তো থাকে মনের মধ্যে। বীথির মন যেন কোনোভাবেই টলে না যায়, ভেবেছি।
ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক সরোজকুমার নাথ, পুলিশ সুপার হাসানুজ্জামান, সিভিল সার্জন সেলিনা বেগম, সদর থানার ওসি, পুলিশসহ আমরা কৃতজ্ঞ সবার কাছে। সিভিল সার্জন নিয়মিত বীথিকে ফোন দিয়ে খোঁজ নিচ্ছেন। বিশেষভাবে আমরা কৃতজ্ঞ ঝিনাইদহের পৌর মেয়র জনাব সাইদুল করিম মিন্টুর প্রতি, তিনি খুব মনোবলের সঙ্গে বীথির জন্যে আমাদের সাপোর্ট দিচ্ছেন। বারবার তাকে আমি ঢাকা থেকে ফোন দিয়েছি, তিনি তার ব্যস্ততার মধ্যেও বলেছেন, যে কোনো প্রয়োজনে যেন তাকে ফোন করি। বীথির জন্য প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দিয়ে খোঁজ রেখেছেন ঝিনাইদহ সরকারি কেসি কলেজের অধ্যক্ষ ড. বিএম রেজাউল করিম। প্রাইমারি এডুকেশনের ডিপিইও জাহাঙ্গীর আলম, টিইও সুধাংশু শেখর বিশ্বাস, এটিইও হাসান মাসুদ, এটিইও শাহজাহান, টিইও মাসুদ কিিরথ সবাই সাহস দিয়ে বীথির মনোবল বাড়িয়ে দিয়েছেন নিঃসন্দেহে। যে কোনো অসুস্থ মানুষকেই পাশে থেকে তার মনোবল বাড়িয়ে দিতে হবে, করোনার বেলায় তো বটেই- এটা আমাদের দায়িত্ব, যারা আমরা সুস্থ আছি। ডাক্তার ও লেখক আনোয়ারা সৈয়দ হক নিয়মিত আমাকে ফোন দিয়ে খবর নিয়ে বীথিকেও ফোন দিয়েছেন। অচ্ছুৎ করোনায় কিছু মানুষ যেমন অমানবিকভাবে দূরে সরে যাচ্ছেন, কিছু মানুষ পরম মমতায় জানতে চান, প্যাশেন্টের সর্বশেষ অবস্থান কী? যে মুহূর্তে আমার ছোটবোনের করোনা পজিটিভ বিষয়টা কেন্দ্র করে সত্যি একটা খারাপ পরিস্থিতি অতিক্রম করছে আমাদের পরিবার, তখন ঢাকা ও ঝিনেদার কিছু গণমাধ্যমের মানুষ খুব জরুরি সাপোর্ট দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন- এটা আমি কোনোদিন ভুলব না। দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক জনাব সাইফুল আলম, সাংবাদিক নজরুল কবীর, এনটিভির সিনিয়র কর্মকর্তা আলফ্রেড খোকন, প্রথম আলো থেকে আলতাফ শাহনেওয়াজ ও ঝিনাইদহ প্রতিনিধি আজাদ রায়হান, ডিবিসি নিউজ চ্যানেল থেকে সৌরদীপ বাপ্পা, ঝিনাইদহ প্রতিনিধি মিল্টন, বিটিভি ঝিনাইদহ প্রতিনিধি অনিন্দ্য দত্ত পিন্টু- গণমাধ্যমের সবাই বীথির জন্য, আমাদের পরিবারের জন্যে যে সহযোগিতা করেছে, তা শুধু গণমাধ্যমের কাছেই পাওয়া সম্ভব। কৃতজ্ঞতার কোনো শেষ নেই।
চিরকুট ব্যান্ডের লিড ভোকাল সুমি বীথিকে ভালোবাসা জানিয়েছে। কবি দুখু বাঙাল, কবি সুনীল আচার্য, শিল্পী ধ্রুব এষ, কবি বিভাস রায়চৌধুরী, শিল্পী আহ চঞ্চল, নির্মাতা অনিমেষ আইচ, সাংবাদিক ফখরুল ইসলাম হারুণ, চিত্রশিল্পী এস এম সাইফুল ইসলাম, ঝণ্টু যোগী, বীথিকা জোদ্দার, বন্ধু ও কণ্ঠশিল্পী হাসিব আহমেদ ছোটন, কণ্ঠশিল্পী ম্যাডোনা জোয়ার্দার, নির্মাতা আবিদ মল্লিক, আমার কাজিন শিল্পী প্রবর রিপন, অভিনেত্রী শিখা কর্মকার, সৌরভ কর্মকার, শিল্পী মামুন হুসাইন, 'কাঁটা' টিমের তাহুয়া লাভিব তুরা, অভি জ্যানেট, নির্মাতা সন্দিপ বিশ্বাস, ইউটিবার লক্ষ্মী সরকার, বড় কাকার ছেলে গায়ক শিশির, কবি ও ডেন্টিস্ট নাদিয়া জান্নাত, সাংবাদিক ও লেখক গোলাম রাব্বানী- সবার কাছেই আমি বীথির ভাই হিসেবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
আমার দুইবোন, আমার সহদরা। ওদের জন্যে কিছুই করতে পারিনি আমি। আমার বাবা-মায়ের জন্যও কিছু করতে পারিনি। সারাজীবন পারিবারিক লোকেদের বাইরেই থাকলাম এক প্রকার। আজ পৃথিবী আক্রান্ত করোনাযুদ্ধে। এই যুদ্ধে আমার ছোটবোন জয়ী হওয়ার পথে, ঝিনাইদহ সিভিল সার্জন অফিস থেকে আজ তাই জানিয়েছে। আমরা দারুণ খুশি। একটা আশা করব আমি পাঠকের কাছে, আপনার আশপাশের কোনো করোনা পজিটিভ কাউকে আপনি অবহেলা করতে পারেন না, নিরাপদ দূরত্বে থেকেও করোনা পজিটিভের পাশে থাকা যায়। আজ বাদে কাল যদি আপনার করোনা পজিটিভ হয়, আপনার পাশেও মানুষ এসে দাঁড়াবে। যে কোনো আক্রান্ত মানুষের পাশে তো মানুষকেই দাঁড়াতে হবে- এ তো কর্তব্য। কর্তব্য এড়িয়ে গেলে আপনি বেঁচে থাকলেও মানুষ হন কীভাবে?
বি. দ্র. আজকেই আমার বোনের বাসা থেকে সরকারিভাবে জারি করা লকডাউন তুলে নেওয়া হবে, প্রশাসন জানিয়েছে। আমার বোনের করোনা সংক্রান্ত টেস্ট হয়েছে তিনটি। আইসোলেশন পর্ব শেষ। কিন্তু সতর্কতা থেকে এখুনি বেখেয়াল হতে পারবে না।
১২ মে, ২০২০
ধানমন্ডি, ঢাকা
কবি

আরও পড়ুন

×