ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

ক্রেডিট ইউনিয়নেও প্রণোদনা

ক্রেডিট ইউনিয়নেও প্রণোদনা
×

ভারী বৃষ্টি হচ্ছে

মো. হুমায়ুন খালিদ

প্রকাশ: ০১ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

সমবায় সমিতি আইনের আওতায় নিবন্ধিত ২৯ শ্রেণির সমবায় সমিতির মধ্যে আয় উৎসারী কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত স্বল্প পরিসরের আয় উপার্জনকারী এবং ক্ষুদ্র সঞ্চয় ও ক্ষুদ্র আকারে বিনিয়োগকারীদের দ্বারা গঠিত সমবায় সমিতিগুলো সংক্ষেপে ক্রেডিট ইউনিয়ন নামে পরিচিত। বাংলাদেশে ক্রেডিট ইউনিয়ন আন্দোলন খুবই জোরদার। ফলে ইতোমধ্যেই এক হাজারের বেশি ক্রেডিট ইউনিয়নের ব্যক্তি সদস্য সংখ্যা যেমন সাড়ে ছয় লাখ জনে দাঁড়িয়েছে, তেমনি নিজস্ব সম্পদের পরিমাণও দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকা। ক্রেডিট ইউনিয়নের সদস্যরা মূলত প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শ্রেণির মানুষ। তারা ১২ মাসই কোনো না কোনো স্বল্পমাত্রার আয় উৎসারী কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত। এরা শহর-গ্রাম নির্বিশেষে ক্ষুদ্র পরিসরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত। আবার এসব প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব লোকজনই কর্মী হিসেবে নিয়োজিত। সমবায় সমিতি আইন ও বিধি অনুযায়ী ক্রেডিট ইউনিয়নের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে সদস্যদের নিজেদের যৌথ শেয়ার ও সঞ্চয়ের মাধ্যমে গড়ে ওঠা তহবিল পুনরায় সদস্যদের ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ও তত্ত্বাবধায়নের আওতায় পুঁজি আকারে সদস্যদের মাঝেই বিনিয়োগ করা।

করোনাকালে বাংলাদেশে নিম্ন আয়ের পেশাজীবী, কৃষক, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দৈনন্দিন আয় উৎসারী কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ ভাইরাসজনিত ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিতকল্পে এদের কর্মকাণ্ড চলমান রাখা জরুরি। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় স্বল্প আয়ের পেশাজীবী ও কৃষক বা প্রান্তিক ব্যবসায়ীর জন্য যেমন বিশেষ প্রণোদনা প্রদানের নীতিমালা জারি করেছে, তেমনি অন্যান্য খাতের জন্যও প্রণোদনা প্রদানের নীতিমালা জারি করেছে। কিন্তু মাইক্রো ক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি আইনের আওতায় পরিচালিত ক্ষুদ্র ঋণ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ সুবিধার অন্তর্ভুক্ত করা হলেও নিজস্ব শেয়ার ও সঞ্চয়ে কেবল সদস্যদের মাঝেই ক্ষুদ্র ঋণ পরিচালনাকারী ক্রেডিট ইউনিয়নসহ সমবায় সমিতিকে এর বাইরে রাখা হয়েছে। আমার বিবেচনায় ক্রেডিট ইউনিয়নের মাধ্যমে এর ব্যক্তি সদস্যরাও এই সংকট উত্তরণের প্রয়োজনে ওই প্যাকেজের সুবিধা পেতে পারে। এজন্য আলাদাভাবে নীতিমালা করার প্রয়োজন হবে না। শুধু ক্রেডিট ইউনিয়নের নাম অন্তর্ভুক্ত করলেই হবে।

ক্রেডিট ইউনিয়নগুলোর সদস্যরা নিজেদের শেয়ার ও সঞ্চয়ের ভিত্তিতে তিলে তিলে যেভাবে নিজেদের সঞ্চিত ঋণের তহবিল গঠন করে, সে বিবেচনায় ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবস্থায় এটি একটি পরীক্ষিত পদ্ধতি। এই ব্যবস্থায় কেবল অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডই পরিচলিত হয় না; বরং সামাজিকতা, গণতন্ত্র ও সম্মিলিত চিন্তাভাবনা করার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, যা টেকসই উন্নয়নের মূল ভিত্তি। এ ছাড়া আয়-সঞ্চয়-বিনিয়োগ চক্রাকার কাঠামো যা অর্থনীতির মৌলিক কাঠামো তার প্রকৃত প্রতিফলন ক্রেডিট ইউনিয়ন পদ্ধতিতেই দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে যেসব বিবেচনা করে বিভিন্ন তফসিল ব্যাংক থেকে ক্ষুদ্র ঋণ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্কিমের আওতায় ঋণ প্রদান করা হবে, সে একই বিবেচনায় ক্রেডিট ইউনিয়নকেও প্রদান করা যেতে পারে।

সমবায় সমিতি নিয়ন্ত্রক সংস্থা সমবায় অধিদপ্তর পরিচালিত বর্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী যেসব ক্রেডিট ইউনিয়নের ঋণ আদায়ের হার শতকরা ৮৫ ভাগের ওপরে, সেসব ক্রেডিট ইউনিয়ন নিঃসন্দেহে সফল ক্রেডিট ইউনিয়ন। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রণোদনা প্যাকেজ স্কিমে এসব সফল ক্রেডিট ইউনিয়নকেই বিবেচনা করা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, প্রান্তিক বা ক্ষুদ্র পরিসরে আয়-উৎসারী কাজের ব্যক্তিরাই ক্রেডিট ইউনিয়নের ব্যক্তি সদস্য। তারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আকারে সঞ্চয় করতেও যেমন আগ্রহী তেমনি স্বল্প পরিসরে বিনিয়োগ করতেও আগ্রহী। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী সব সময়ই পুঁজি বিনিয়োগের পরিমাণ কম থাকে। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক প্রণোদনা স্কিম অবশ্য সফল ক্রেডিট ইউনিয়নগুলো তারল্যের ঘাটতি পূরণ করতে সক্ষম হবে। এটাও মনে রাখতে হবে, সমবায় আইনের কয়েকটি ধারায় স্পষ্টভাবেই বলে দেওয়া আছে যে, ক্রেডিট ইউনিয়নের তহিবল, উদ্বৃত্ত অর্থ, বিভিন্ন বিনিয়োগ-তহবিল ইত্যাদি সরকারের তফসিলি ব্যাংকের মাধ্যমেই পরিচালনা করতে হবে। আইন অনুযায়ী, ক্রেডিট ইউনিয়নগুলো তা করেও আসছে। এদিকে থেকে শিডিউল ব্যাংকের সঙ্গে ক্রেডিট ইউনিয়নের ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্ক শুরু থেকেই বিদ্যমান। প্যাকেজভুক্ত হলে এ সম্পৃক্ততা আরও বৃদ্ধি পাবে। সরকার প্রদত্ত প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় সম্পৃক্ত হলে এই মুহূর্তে ঝিমিয়ে পড়া ক্রেডিট ইউনিয়নকে চাঙ্গা করা সম্ভব হবে।

এ পরিপ্রেক্ষিতে ক্রেডিট ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দের সহযোগিতায় সমবায় অধিদপ্তর বাংলাদেশ ব্যাংক এবং প্রয়োজনে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে থমকে যাওয়া ক্রেডিট ইউনিয়নের কার্যক্রমকে চালু রাখতে পারে এবং তাদের তারল্য ঘাটতি পূরণে এগিয়ে আসতে পারে।

সাবেক সচিব ও সমবায় নিবন্ধক
[email protected]

আরও পড়ুন

×