মাধ্যমিকের ফল
মান বৃদ্ধিতে জোর দিন
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০১ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
করোনা সংক্রমণের মধ্যেই সফলতার সঙ্গে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের জন্য আমরা শিক্ষা বোর্ড, শিক্ষক ও সংশ্নিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। ফলপ্রাপ্ত মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ সব ছাত্রছাত্রীকেও আমাদের অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। রোববার প্রকাশিত এ ফলে কেবল সাফল্যের ধারাবাহিকতাই বজায় থাকেনি, একই সঙ্গে সর্বোচ্চ ফল জিপিএ ৫ প্রাপ্তিতে গত পাঁচ বছরের রেকর্ডও ভেঙেছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে অনুষ্ঠিত হওয়া এ পরীক্ষাটি যখন হচ্ছিল, তখন চীনসহ বিশ্বের অনেক দেশেই করোনার প্রাদুর্ভাব ছিল লক্ষণীয়, বাংলাদেশে তখনও ভাইরাসটির সংক্রমণ শুরু না হওয়ায় বিশ লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর পরীক্ষাটি সুন্দরভাবেই সম্পন্ন হয়। ফল প্রকাশের পর আমরা দেখছি, এর মধ্যে প্রায় সতেরো লাখ শিক্ষার্থী পাস করেছে। পাসের হার ৮২.৮৭ নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। কিন্তু এর বিপরীতে তিন লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার সংখ্যাটি হতাশাজনক। আমরা মনে করি, শতভাগ পাস করা অসম্ভব নয়। একজন শিক্ষার্থী টানা দশ বছর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়েছে, পিএসসি, জেএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষাসহ একের পর এক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য মনোনীত হওয়ার আগে দিয়েছে প্রিটেস্ট ও টেস্ট। তারপরও কেন অকৃতকার্য হবে! তারপরও যারা অকৃতকার্য হয়েছে, তারা যেন হতাশায় নিমজ্জিত না হয়ে নতুন উদ্যমে পড়ার টেবিলে বসে যায়, সে জন্য পরিবার ও বিদ্যালয়- সব স্থান থেকেই আন্তরিক চেষ্টা থাকুক। যদিও পাস কিংবা ফেল পরীক্ষারই অংশ। একে কেন্দ্র করে অত্যধিক উল্লাস কিংবা হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেওয়া উভয়টিই পরিত্যাজ্য। করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে শিক্ষার্থীদের আগের মতো আনন্দ উদযাপন এবার হয়নি। কিন্তু ইতোমধ্যে কয়েকজনের আত্মহত্যার যে খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে, তা আমাদের বেদনাহত করেছে। এ ভয়ংকর প্রবণতা চলতে দেওয়া যায় না। শিক্ষক ও অভিভাবক উভয়ের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এটি বন্ধ করতেই হবে।
প্রকাশিত ফলে আমরা দেখছি, গণিত ও ইংরেজির মতো কঠিন বিষয় ছাড়াও বাংলা, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও আইসিটি বিষয়ে এবারের শিক্ষার্থীরা ৯০ শতাংশ পাস করেছে। এই ছয়টি বিষয়ে পাসের হার সার্বিক পাসের হার বাড়িয়ে দিয়েছে। উদারভাবে খাতা দেখা ও প্রশ্নপত্র অন্যান্য বছরের তুলনায় সহজ হওয়াও এবারের সাফল্যের অন্যতম কারণ। আমাদের পাসের হার বাড়ছে, জিপিএ ৫-ও বাড়ছে; কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, গুণগত মান শিক্ষার্থীরা কতটা অর্জন করছে। একজন শিক্ষার্থী যে ফল করছে, বাস্তবে তার শিখন সে পর্যায়ে না হওয়ার দৃষ্টান্ত আমরা দেখছি। তারা যা শিখছে তা যদি বাস্তব জীবনে কাজে লাগাতে না পারে, কেবল ভালো ফলের জন্যই শেখে- সেটা নিশ্চয়ই প্রত্যাশিত নয়। মাধ্যমিক পর্যায়ের ফল নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তার মান যদি রক্ষা না হয়, কেবল ফল দিয়ে তেমন লাভ হবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অভিভাবক, শিক্ষার্থী সবাই মিলে ফলের ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে, পাশাপাশি শিক্ষার্থীর গুণগত মানেও সমান গুরুত্ব পড়ুক।
এ বছর ১০৪টি প্রতিষ্ঠানের কেউই পাস করতে পারেনি। বিষয়টি দুঃখজনক। যখন আশি শতাংশেরও বেশি শিক্ষার্থী পাস করছে, এমন সময় এসেও এটি কল্পনা করা যায় না। এক্ষেত্রে সংশ্নিষ্ট শিক্ষা বোর্ড বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেবে। যারা ধারাবাহিকভাবে এমন খারাপ করবে, তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়াও জরুরি। একই সঙ্গে যেসব বিদ্যালয়ে পাসের হার তুলনামূলক কম, সেগুলোর প্রতি সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও ব্যবস্থাপনা কমিটির বিশেষ নজর পড়ূক, এটাও প্রত্যাশা।
এসএসসির ফল-পরবর্তী চিন্তা থাকে ভর্তি নিয়ে। এবার করোনার কারণে এখনও ভর্তির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত না হলেও আমরা চাই এমনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক, যাতে শিক্ষার্থী ঝুঁকির মধ্যে না পড়ে। অনলাইনে ভর্তির কিছু কাজ এগিয়ে রাখা যেতে পারে। তবে প্রতিষ্ঠানে গিয়ে যেসব ভর্তি প্রক্রিয়া রয়েছে, তা সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার পরই সম্পন্ন হোক। আমরা দেখছি, এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে বলেই করোনাদুর্যোগের মধ্যেও ফল দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এইচএসসি পরীক্ষা এ দুর্যোগের কারণে আটকে গেছে। আমরা মনে করি, এইচএসসিসহ সামনের জেএসএসসি ও প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা নিয়েও চিন্তা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশ কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেটি প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। কারণ এ পরীক্ষাগুলো পিছিয়ে গেলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পরবর্তী ধাপও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।