ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

দূষণ

প্লাস্টিক মোড়কে পরিবেশ

প্লাস্টিক মোড়কে পরিবেশ
×

মুকিত মজুমদার বাবু

প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০২ জুলাই ২০২০ | ১৪:৫৮

মুবারক সাহেব কাপড়ের ব্যাগে বাজার করেন। কাঁচাবাজারের জন্য একটা। শুকনো বাজারের জন্য একটা। অভ্যাস হয়ে গেছে। বাবার কাছ থেকে শিখেছেন। বাদ হয়ে যাওয়া প্যান্ট কানাই দর্জিকে দিয়ে কেটে ব্যাগ বানিয়ে নিয়ে আসতেন বাবা। অবশ্য তখন চট আর কাপড়ের ব্যাগ ছাড়া অন্য কোনো ব্যাগের প্রচলন ছিল না। কানাই দর্জি বেঁচে নেই। এখন তার ছেলেকে দিয়ে ব্যাগ তৈরি করান মুবারক সাহেব। নিজের ছেলেকেও কাপড়ের ব্যাগে বাজার করার শিক্ষা দিয়েছেন।

পরিবারের বড়রাই ছেলেবেলার প্রথম ও প্রধান শিক্ষক। ছোটবেলা শিশুদের মন থাকে কাদার মতো। সেই কাদার ওপর যে ছাপ দেওয়া যায় তার প্রভাব হয় সুদূরপ্রসারী। দিনে দিনে মুবারক সাহেবের নাতি-নাতনিরাও কাপড় কিংবা চটের ব্যাগে বাজার করার শিক্ষা পাবে। যেখানে পলিথিনের ব্যাগে বাজার সয়লাব সেখানে মুবারক সাহেব উদাহরণই বটে। আজ এক কেজি সবজি কিনলে পলিথিনের ব্যাগে ভরে দেন বিক্রেতা। ক্রেতারও কোনো আপত্তি থাকে না, কেননা ক্রেতা বাজার করতে যাওয়ার সময় বাড়ি থেকে কোনো ব্যাগ নিয়ে যান না। আজকাল মাছ, মাংস, ফল, মিষ্টি, মুড়ি, চিড়া, চিপস, ওষুধ, চকলেট যা-ই কেনা যাক না কেন, তাতেই মেলে বিনা পয়সায় পলিথিনের ব্যাগ। কম দাম হওয়ায় বিক্রেতার লাভ আর ব্যাগ সঙ্গে না রাখায় ক্রেতারও লাভ। উভয় যখন লাভ খোঁজায় ব্যস্ত তখন পরিবেশের বারোটা বাজাচ্ছে এই পলিথিন ব্যাগ। বাড়ির রাস্তা থেকে শুরু করে নদী-নালা, ড্রেন সবখানে মিশে দেশের শ্বাসরোধ করে ফেলেছে পলিথিনের ব্যাগ।

বাংলাদেশের ঘরে ঘরে এখন পলিথিনের ব্যাগ ও প্লাস্টিক বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘরের চেয়ার, আলমারি, পড়ার টেবিল, সোফা, বালতি, ঢাকনা, খাবার থালা, গ্লাস, মগ, জগ, গামলা, বদনা- সবই প্লাস্টিকের। কোথায় নেই প্লাস্টিক ও পলিথিন ব্যাগ? অথচ এই প্লাস্টিক আর পলিথিনের ব্যাগ আমাদের পরিবেশের চরম ক্ষতি করছে। রাজধানীসহ দেশের বড় বড় শহরের জলাবদ্ধতার জন্য পলিথিনের ব্যাগই অনেকাংশে দায়ী। বাংলাদেশে প্রতিদিন কী সংখ্যক পলিথিনের ব্যাগ উৎপাদন, ব্যবহার বা বর্জ্য হিসেবে জমা হয়- এ নিয়ে সরকারি কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা হিসাব নেই। তবে বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (বাপা) এক পরিসংখ্যান বলছে, শুধু ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি পলিথিন ব্যাগ জমা হয়। এবার গোটা দেশের কথা একবার ভেবে দেখুন তো?

বিশেষজ্ঞদের গবেষণা মতে, পলিথিনের ব্যাগ একশ' বছরেও মাটির সঙ্গে মেশে না। মাটিতে পানি ও প্রাকৃতিক যে পুষ্টি উপাদান রয়েছে তা চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে মাটির গুণগত মান কমে যায়। গাছ প্রয়োজনীয় খাবার পায় না। মাটি ও পানিতে প্লাস্টিক কণা ছড়িয়ে পড়ে, যা পানি থেকে মাছের শরীরে প্রবেশ করে। মাটিতে প্লাস্টিকের তৈরি টক্সিন রাসায়নিক পদার্থ গাছে মিশে যায়। এক পর্যায়ে শুধু পশুপাখি নয়; মানুষের শরীরেও গিয়ে পৌঁছায়। প্লাস্টিক মানুষের শরীরে অনেক ধরনের প্রাণঘাতী ব্যাধির পাশাপাশি ক্যান্সার সৃষ্টিতে সহায়ক।

পলিথিনের ব্যাগ ও প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। ২০০২ সালের জানুয়ারি থেকে পলিথিন উৎপাদন, পরিবহন, মজুদ ও ব্যবহার আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়। বাংলাদেশে পলিথিন ব্যাগের বিকল্প হিসেবে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে ১৭টি পণ্যের সংরক্ষণ ও পরিবহন পাটের ব্যাগের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রাণঘাতী এই দূষণ রোধ করতে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন রয়েছে। কিন্তু আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ অপ্রতুল। আজ ঘর থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট, বন-জঙ্গল, দ্বীপ-মোহনা, হাট-বাজার, অফিস-আদালত, নদনদী, সাগর ও সৈকতসহ কোথায় নেই পলিথিনের ব্যাগ ও প্লাস্টিকের জঞ্জাল?

১৯০৭ সালে প্লাস্টিকের বৈপ্লবিক উদ্ভাবন বেশ সাড়া জাগিয়েছিল বিশ্বজুড়ে। ৫০ থেকে ৭০-এর দশকে সীমিত পরিমাণ প্লাস্টিক উৎপাদিত হওয়ার নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে চিন্তাধারা তখন ছিল ভাবনার বাইরে। কিন্তু ৯০-এর দশকে প্লাস্টিকের উৎপাদন এবং এর দ্বারা সৃষ্ট বর্জ্যের পরিমাণ তিন গুণেরও বেশি বেড়ে যায় এবং ২০০০ সালের পর থেকে এ দূষণ পুরোপুরি ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায়।

ডেনমার্কের কোপেনহেগেনভিত্তিক সংস্থা 'দ্য ওয়ার্ল্ড কাউন্টস' বলছে, বিশ্বে প্রতিবছর পাঁচ লাখ কোটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করা হয়। এগুলোকে একটার পর একটা জোড়া দিলে সাতবার পৃথিবীকে ঘুরে আসা যাবে এবং এটি ফ্রান্সের সমান আয়তনের দুটি দেশকে ঢেকে দেওয়া যাবে। এর মাত্র ১ শতাংশ পুনর্ব্যবহারের জন্য প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে। আর সমুদ্রে ফেলা হচ্ছে ১০ শতাংশ। সমীক্ষা অনুযায়ী, যেভাবে দূষণ বাড়ছে তাতে ২০৫০ সালে সমুদ্রে মাছের তুলনায় প্লাস্টিকের সংখ্যা বেশি হবে।

পলিথিনের ব্যাগ ও প্লাস্টিক বর্জন করার সময় এসেছে। বিকল্প ভাবনাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ব্যবহার করতে হবে পরিবেশবান্ধব ব্যাগ ও আসবাবপত্র। মোট কথা ব্যবহূত সবকিছু পচনশীল হতে হবে। যেমন পাট থেকে পলিথিন ব্যাগ উদ্ভাবন করেছেন পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ জুট মিল করপোরেশনের বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা ড. মোবারক আহমদ খান। সম্প্রতি এমন আরও এক পলিথিন ব্যাগ তৈরি হয়েছে, যা পানিতে দ্রবীভূত হয়ে যাবে। তা ছাড়া মিশে যাওয়ার পরও তা কোনো বিষাক্ত পদার্থের সৃষ্টি করবে না কিংবা কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাবে না। যুগান্তকারী এ ব্যাগের নাম হলো 'সল্যুব্যাগ'। বিজ্ঞানীদের পলিথিনের ব্যাগ ও প্লাস্টিক নিয়ে বিকল্প ভাবনা ভাবতে হবে এবং গবেষণার জন্য সরকারকে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। এ ছাড়া তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টি, পলিথিনের ব্যাগ ও প্লাস্টিকের কাঁচামাল আমদানি বন্ধ, কারখানার ওপর নিষেধাজ্ঞা, বাজারজাতকরণে বড় অঙ্কের টাকা জরিমানা বা কারাদণ্ডসহ সবার সদিচ্ছাই পারে পলিথিনের ব্যাগ ও প্লাস্টিক দূষণ থেকে দেশ ও বিশ্বকে মুক্ত করতে।

চেয়ারম্যান, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন

আরও পড়ুন

×