কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ
আবদুর রহমান বদি ও তার স্ত্রী সংসদ সদস্য শাহীন আক্তার চৌধুরী
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০২ জুলাই ২০২০ | ১৪:৫৯
করোনা মহামারির এ সময়ে দেশ যখন বিপর্যস্ত, করোনার পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিয়ে যখন বিস্তর অভিযোগ, তখন একটি চক্র যেভাবে একে 'সুযোগ' হিসেবে গ্রহণ করে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, তা লজ্জাজনক ও নিন্দনীয়। করোনাদুর্যোগের শুরু থেকেই স্বাস্থ্য সরঞ্জাম ক্রয়ে দুর্নীতিসহ নানা অনিয়ম আমরা দেখেছি। এখনও দেশে করোনা সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী, কয়েকদিন ধরে গড়ে প্রতিদিন প্রায় চার হাজার করোনা রোগী শনাক্ত হচ্ছে এবং গড়ে প্রায় চল্লিশ জন মারা যাচ্ছে- এ সময়েও সুযোগ সন্ধানীদের তৎপরতা কমেনি বরং বেড়েছে। 'এবার কিট বাণিজ্য' ও 'প্লাজমা ডোনার সেজে ভয়ংকর প্রতারণা' শীর্ষক বৃহস্পতিবারের সমকালের প্রথম পাতার দুটি প্রতিবেদনও সেটি প্রমাণ করছে। একদল যেমন প্রশাসনে দায়িত্বশীল পদে থেকেও এসব অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে, তেমনি বাইরে থেকেও একটি চক্র করোনা রোগী ও তাদের স্বজনদের জিম্মি করে প্রতারণা করে যাচ্ছে।
সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী- দেশে করোনা সংক্রমণ শুরুর পর নমুনা পরীক্ষার জন্য প্রায় ১০ লাখ কিট আমদানি করা হয়েছে। এই কিট বাণিজ্যেও যেভাবে একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যেভাবে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে চক্র প্রতিটি কিট কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি করছে, তাতে আমরা বিস্মিত। আমরা দেখছি কিট সংকটের কারণে অনেকের নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট পেতে দেরি হচ্ছে। নতুন করে যক্ষ্ণা শনাক্তকরণ মেশিন জেনেক্সপার্টের মাধ্যমে করোনা পরীক্ষার যে অনুমোদন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দিয়েছে, তা আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। কারণ দেশব্যাপী বিস্তৃত সংক্রামক ব্যাধি যক্ষ্ণার পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাদ দিয়ে করোনার নমুনা পরীক্ষা করলে যক্ষ্ণা রোগীরা ঝুঁকিতে পড়বেন। এমনিতেই জেনেক্সপার্ট মেশিনের মাধ্যমে পরীক্ষায় সাফল্যের হারও খুব বেশি নয়, তার ওপর এ মেশিনের অনুমোদনের পর ওই চক্রটি নমুনা পরীক্ষা নিয়ে নতুন করে বাণিজ্যের ছক কষতে শুরু করেছে বলেছে অভিযোগ উঠেছে। আমরা জানি, আরটিপিসিআর টেস্টের মাধ্যমে করোনাভাইরাস সংক্রমণ নির্ণয় করা হয়? এতদিন এ পরীক্ষা সরকার বিনামূল্যে করার সুযোগ দিলেও এখন থেকে পরীক্ষাটির জন্য ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত ফি নির্ধারণ করা হয়। সিদ্ধান্তটি কতটা যৌক্তিক- এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিনামূল্যে হলে ধনী-গরিব সবাই টেস্ট করাতে যেতেন। এখন যাদের খাবারেরই টাকা নেই, তারা কীভাবে করাবেন! বরং আমরা মনে করি, ইতোমধ্যে যেসব অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, সেসব বন্ধ করে সবাইকে বিনামূল্যে সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে কিট বাণিজ্যের টাকা যাদের পকেটে যাচ্ছে, সে চক্রটিকে চিহ্নিত করে শাস্তি দেওয়া জরুরি।
আমরা দেখেছি, করোনা আক্রান্তদের নানা চিকিৎসা পদ্ধতির সঙ্গে করোনা থেকে সুস্থ হওয়া মানুষের দেহ থেকে পল্গাজমা (রক্ত রস) সংগ্রহ করে মুমূর্ষু করোনা রোগীর দেহে প্রয়োগ করলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলে আসছেন চিকিৎসকরা। এ জন্য করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির স্বজনরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দিয়ে পল্গাজমা ডোনারের সন্ধান করেন। আর একে পুঁজি করে প্লাজমা ডোনারের নামে প্রতারণার ভয়ংকর ফাঁদের যে চিত্র সমকালের প্রতিবেদনে এসেছে, তা আরও দুঃখজনক। এখানেও রয়েছে একটি চক্র। যারা যাতায়াত ভাড়ার নামে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা দাবি করে। অনেকে আবার নিজেকে দরিদ্র দাবি করে বড় অঙ্কের টাকাও দাবি করে। স্বজনদের চিকিৎসার কথা ভেবে টাকা পাঠানোর পর চক্রটির ফোন বন্ধ করে ঠকানোর বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। করোনাদুর্যোগের এ সময়ে কতটা অবিবেচক ও অমানবিক হলে এমনটা হতে পারে!
- বিষয় :
- পৌষ মাস
- কারও সর্বনাশ
- সর্বনাশ