পদ্মা সেতু ও বিশ্বব্যাংক
×
মাসুদ সিদ্দিকী
প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২০ | ১২:০০
বাংলাদেশ একটি বদ্বীপ। বাংলার ইতিহাস রচনা করেছে বাংলার নদ-নদী। নদীর তীরে গড়ে উঠেছে আমাদের সভ্যতা, ঘরবাড়ি, সংস্কৃতি। নদ-নদীর কারণেই বাংলাদেশ সুজলা, সুফলা ও শস্যশ্যামলা। বাংলাদেশের একটি প্রধান নদী পদ্মা। এই নদীর ধ্বংসলীলা দেখে বাঙালি ক্রোধভরে তার নাম দিয়েছে কীর্তিনাশা। পদ্মা নিয়ে রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ বলেছেন, "তবু তাহা ভুল জানি, রাজবল্লভের কীর্তি ভাঙ্গে কীর্তিনাশা;/ তবু পদ্মার রূপ একুশ রত্নের চেয়ে আর ঢের গাঢ়-/ আরো ঢের প্রাণ তার, বেগ তার, ঢের জল, জল আরো"।
দেশের পূর্ব এলাকার সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকার জীবনযাত্রার মানের বৈষম্য দূর করতে পদ্মা সেতু প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। মূল সেতুর টেন্ডার প্রক্রিয়ার সময় বিশ্বব্যাংক প্রথম আপত্তি তোলে। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সরকারের টানাপোড়েন শুরু হয়। পরবর্তীতে সুপারভিশন কনসালট্যান্সি প্যাকেজের টেন্ডার মূল্যায়নে কথিত দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ব্যাংক মাঝপথে কাজ বন্ধ করে দেয়। পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে ঋণ প্রত্যাহার করে। বিষয়টি গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা পায়। গোয়েবলসীয় কায়দায় সত্যকে আড়াল করে দুর্নীতির উপাখ্যান তৈরি করা হয়। দেশের ভেতরে ও বাইরে যেন তাসের ঘর নাটকের মঞ্চায়নের আয়োজন সম্পন্ন করা হয়। কিন্তু দুর্নীতি দমন কমিশন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। তারা মামলা তুলে নেয়। আরও পরে কানাডার আদালতে মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়। এভাবে অশুভ ও অন্যায় চক্রের পরাজয় ঘটে।
কথাগুলো বলছি একটি আকর্ষণীয় বই পড়ে। নাম 'পদ্মা সেতু :সততা ও আত্মবিশ্বাসের বিজয়'। লেখক মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র ছিলেন। ১৯৮১ ব্যাচে সুপিরিয়র সার্ভিস পরীক্ষায় সফল হয়ে সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের উইলিয়ামস কলেজ থেকে অর্থনীতিতে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি তার সফল কর্মজীবন শেষ করেন সরকারের সিনিয়র সচিব হিসেবে। তাকে পদ্মা সেতু প্রকল্পে কথিত দুর্নীতির দায় নিয়ে কারাগারে যেতে হয়েছিল।
বইটিতে লেখক পদ্মা সেতু নিয়ে বিশেষজ্ঞ আলোচনা করেছেন। আলোচনায় উঠে এসেছে দাতা সংস্থার অর্থায়নে নেওয়া উন্নয়ন প্রকল্পের পেছনে থাকা রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রসঙ্গ। বইটির উৎসর্গপত্রে বলা হয়েছে- 'যার আত্মবিশ্বাস ও সাহসী সিদ্ধান্তে নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত পদ্মা সেতু আজ দৃশ্যমান। পদ্মা সেতুর রূপকার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা'। মুখবন্ধ লিখেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান। তিনিও এই ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন।
বইটিতে বিভিন্ন অধ্যায়ে সেতুর পরামর্শক নিয়োগ, টেন্ডার আহ্বান, মূল্যায়ন, বিশ্বব্যাংকের আপত্তি, দুর্নীতির অভিযোগ, দুর্নীতি দমন কমিশনে মামলা, লেখকের কারাবরণ ও সসম্মানে মুক্তির কথা রয়েছে। লেখককে পরে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে পদায়ন করা হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের মেয়াদ শেষে তিনি অবসরে যান। স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্রের কারণে লেখক ও তার পরিবারকে সীমাহীন দুঃখ ও কষ্ট পোহাতে হয়েছে। কারাগারের ডায়েরিতে তিনি তার অগ্নিপরীক্ষার কথা ছোটগল্পের মতো বলেছেন। এই অংশের বর্ণনা পাঠকের চিত্তকে দ্রবীভূত করবে। এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে কারা নায়ক ও কারা খলনায়ক, লেখক তা চমৎকার করে প্রকাশ করেছেন।
সমসাময়িক বিষয় নিয়ে লিখতে গেলে লেখককে ঝুঁকি নিতে হয়। লেখক নিজেও তাতে অংশগ্রহণকারী। সত্য কথা বলা ও প্রকাশ করার সাহস লেখকের আছে। বইটি প্রকাশ করে তিনি একটি মিথ্যার রূপকল্পকে ভেঙে দিয়েছেন। পদ্মা সেতুর আলোচনা ও ব্যাখ্যায় তিনি একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। তার আলোচনা নির্মোহ। তথ্য সংগ্রহ ও বিচার বিশ্নেষণের পদ্ধতি বইটিকে একটি মূল্যবান আকর গ্রন্থের মর্যাদায় উন্নীত করেছে।
লেখক সহজ ভাষায় এই সুখপাঠ্য গ্রন্থটি রচনা করেছেন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিষয়ে উৎসাহী সাধারণ পাঠক, উন্নয়ন কর্মী, নীতিনির্ধারক, গবেষক, সিভিল সার্ভিসের সদস্যসহ সবার কাছে বইটি সমাদৃত হবে। বইটির প্রকাশক বিদ্যাপ্রকাশের অধিকারী মজিবর রহমান খোকা।
উপসংহারে বিশ্বব্যাংকের বিতর্কিত অবস্থান নিয়ে একটি গল্প বলি। ইংরেজ কবি বায়রন তার বউকে সবসময় জ্বালাতন করতেন। গ্রিকের স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নিয়ে তিনি মারা যান। মৃত্যুসংবাদ পেয়ে স্ত্রী বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন- আমি সত্যিই বুঝতে পারছি না, সে মারা গেছে, না মৃত্যুর অভিনয় করছে। পদ্মা সেতুর বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ বাস্তব নাকি অভিনয় ছিল? বইটি পড়ে বুঝতে পারবেন।
সরকারের সাবেক সচিব
দেশের পূর্ব এলাকার সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকার জীবনযাত্রার মানের বৈষম্য দূর করতে পদ্মা সেতু প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। মূল সেতুর টেন্ডার প্রক্রিয়ার সময় বিশ্বব্যাংক প্রথম আপত্তি তোলে। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সরকারের টানাপোড়েন শুরু হয়। পরবর্তীতে সুপারভিশন কনসালট্যান্সি প্যাকেজের টেন্ডার মূল্যায়নে কথিত দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ব্যাংক মাঝপথে কাজ বন্ধ করে দেয়। পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে ঋণ প্রত্যাহার করে। বিষয়টি গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা পায়। গোয়েবলসীয় কায়দায় সত্যকে আড়াল করে দুর্নীতির উপাখ্যান তৈরি করা হয়। দেশের ভেতরে ও বাইরে যেন তাসের ঘর নাটকের মঞ্চায়নের আয়োজন সম্পন্ন করা হয়। কিন্তু দুর্নীতি দমন কমিশন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। তারা মামলা তুলে নেয়। আরও পরে কানাডার আদালতে মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়। এভাবে অশুভ ও অন্যায় চক্রের পরাজয় ঘটে।
কথাগুলো বলছি একটি আকর্ষণীয় বই পড়ে। নাম 'পদ্মা সেতু :সততা ও আত্মবিশ্বাসের বিজয়'। লেখক মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র ছিলেন। ১৯৮১ ব্যাচে সুপিরিয়র সার্ভিস পরীক্ষায় সফল হয়ে সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের উইলিয়ামস কলেজ থেকে অর্থনীতিতে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি তার সফল কর্মজীবন শেষ করেন সরকারের সিনিয়র সচিব হিসেবে। তাকে পদ্মা সেতু প্রকল্পে কথিত দুর্নীতির দায় নিয়ে কারাগারে যেতে হয়েছিল।
বইটিতে লেখক পদ্মা সেতু নিয়ে বিশেষজ্ঞ আলোচনা করেছেন। আলোচনায় উঠে এসেছে দাতা সংস্থার অর্থায়নে নেওয়া উন্নয়ন প্রকল্পের পেছনে থাকা রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রসঙ্গ। বইটির উৎসর্গপত্রে বলা হয়েছে- 'যার আত্মবিশ্বাস ও সাহসী সিদ্ধান্তে নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত পদ্মা সেতু আজ দৃশ্যমান। পদ্মা সেতুর রূপকার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা'। মুখবন্ধ লিখেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান। তিনিও এই ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন।
বইটিতে বিভিন্ন অধ্যায়ে সেতুর পরামর্শক নিয়োগ, টেন্ডার আহ্বান, মূল্যায়ন, বিশ্বব্যাংকের আপত্তি, দুর্নীতির অভিযোগ, দুর্নীতি দমন কমিশনে মামলা, লেখকের কারাবরণ ও সসম্মানে মুক্তির কথা রয়েছে। লেখককে পরে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে পদায়ন করা হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের মেয়াদ শেষে তিনি অবসরে যান। স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্রের কারণে লেখক ও তার পরিবারকে সীমাহীন দুঃখ ও কষ্ট পোহাতে হয়েছে। কারাগারের ডায়েরিতে তিনি তার অগ্নিপরীক্ষার কথা ছোটগল্পের মতো বলেছেন। এই অংশের বর্ণনা পাঠকের চিত্তকে দ্রবীভূত করবে। এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে কারা নায়ক ও কারা খলনায়ক, লেখক তা চমৎকার করে প্রকাশ করেছেন।
সমসাময়িক বিষয় নিয়ে লিখতে গেলে লেখককে ঝুঁকি নিতে হয়। লেখক নিজেও তাতে অংশগ্রহণকারী। সত্য কথা বলা ও প্রকাশ করার সাহস লেখকের আছে। বইটি প্রকাশ করে তিনি একটি মিথ্যার রূপকল্পকে ভেঙে দিয়েছেন। পদ্মা সেতুর আলোচনা ও ব্যাখ্যায় তিনি একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। তার আলোচনা নির্মোহ। তথ্য সংগ্রহ ও বিচার বিশ্নেষণের পদ্ধতি বইটিকে একটি মূল্যবান আকর গ্রন্থের মর্যাদায় উন্নীত করেছে।
লেখক সহজ ভাষায় এই সুখপাঠ্য গ্রন্থটি রচনা করেছেন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিষয়ে উৎসাহী সাধারণ পাঠক, উন্নয়ন কর্মী, নীতিনির্ধারক, গবেষক, সিভিল সার্ভিসের সদস্যসহ সবার কাছে বইটি সমাদৃত হবে। বইটির প্রকাশক বিদ্যাপ্রকাশের অধিকারী মজিবর রহমান খোকা।
উপসংহারে বিশ্বব্যাংকের বিতর্কিত অবস্থান নিয়ে একটি গল্প বলি। ইংরেজ কবি বায়রন তার বউকে সবসময় জ্বালাতন করতেন। গ্রিকের স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নিয়ে তিনি মারা যান। মৃত্যুসংবাদ পেয়ে স্ত্রী বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন- আমি সত্যিই বুঝতে পারছি না, সে মারা গেছে, না মৃত্যুর অভিনয় করছে। পদ্মা সেতুর বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ বাস্তব নাকি অভিনয় ছিল? বইটি পড়ে বুঝতে পারবেন।
সরকারের সাবেক সচিব
- বিষয় :
- পদ্মা সেতু