ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

জীবিতরা ফিরুক জীবন নিয়ে

জীবিতরা ফিরুক জীবন নিয়ে
×

এস. এম. আব্রাহাম লিংকন

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২০ | ১২:০০

চলমান করোনা সংকটকালে আমাদের দেশের অনেক মানুষ কেউ বেড়াতে, কেউ চিকিৎসা আবার কেউ পড়ালেখা করতে গিয়ে আকস্মিক লকডাউনে পাশের দেশে আটকা পড়েছেন। লকডাউন কথাটি শিক্ষিত সমাজ বুঝতে পারলেও এর মানে সাধারণ মানুষ জানে না। বাংলাদেশ ও ভারতে এ কথাটি বাস্তবিক অর্থে সত্য। ভারতে এর প্রয়োগ বেশ কঠোর ছিল।
আমাদের দেশের অনেক পরিবার যাদের সামর্থ্য ছিল, তারা কেউ কেউ বিদেশে আটকা পড়লেও পরে বিমান ম্যানেজ করে ফিরেছেন। কিন্তু কুড়িগ্রাম থেকে আসামে বেড়াতে যাওয়া ২৬ বাংলাদেশির ফেরা হয়ে ওঠেনি। তারা আকস্মিক লকডাউনে ভারতের আসামের জোরহাটে আটকা পড়েন। লকডাউন শুরুর সময় তারা আসামের এমন দুর্গম এলাকায় বেড়াতে গেছেন যেখানে তারা আকস্মিক লকডাউনের বিষয়টি বুঝতে পারেননি। তারা যখন জানতে পারেন, তখন লকডাউন জেঁকে বসেছে। তারা ফেরার পথে আসামের জোরহাট জেলায় স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাদের বাড়িঘরে অবস্থান করেন। তাদের আশ্রয়ে থেকে হাতে থাকা সামান্য টাকাপয়সাও খাদ্য ক্রয় বাবদ শেষ হয়েছে। একপর্যায়ে তারা যাদের আশ্রয়ে থেকেছেন, তাদের সঙ্গে কাজও করেছেন। বিনিময়ে খাবার ও থাকার জায়গা পেয়েছেন। যারা তাদের আশ্রয় দিয়েছেন, তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই। তারা মানবিক সহযোগিতা দিয়েছেন। যার ফলে খাবার ও থাকার কষ্টগুলো তাদের কাছে কষ্ট মনে হয়নি।
দীর্ঘ লকডাউনে আটকাপড়া অবস্থায় তাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। কিন্তু ফেরার কোনো সুযোগ না থাকায় ইচ্ছার বিরুদ্ধেই তাদের ভারতে থাকতে হয়। এই অবস্থানকে আমরা বড়জোর বলতে পারি অনিচ্ছাকৃত অবস্থান। আটকাপড়া ছাব্বিশ জন যখন জানতে পারলেন গত ৩ মে তাদের অনুমোদিত ইমিগ্রেশন পোর্ট চ্যাংড়াবান্ধা কয়েক ঘণ্টার জন্য খোলা হবে তাদের মতো আটকাপড়াদের দেশে ফেরার সুযোগ দিতে। সেটি শুনেই তারা সেদিন চ্যাংড়াবান্ধা অভিমুখে রওনা দেন। পথিমধ্যে তারা আসামের ধুবড়ি জেলার চপোবৎ থানা পুলিশ কর্তৃক আটক হন। তারা তাদের আটকা পড়ার কারণ বললেও পুলিশ আটক করে জেলে পাঠায়। এখনও তারা সেখানেই আছেন। আটকাবস্থায় বকুল মিয়া নামে একজন জেলখানায় কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়ে গত ১ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। যা আমাদের ও সংশ্নিষ্ট পরিবারের জন্য কষ্টের কারণ। তাদের বিরুদ্ধে কয়েকটি অভিযোগ দায়ের করা হয়। যেগুলো হচ্ছে- ১, ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পরও বেআইনিভাবে ভারতে থাকা। ২. লকডাউনে অতিমারির বিধি ভঙ্গ করা এবং ৩. ভ্রমণ ভিসায় গিয়ে সেখানে কাজ করা।
ভারতে আটক ব্যক্তিদের পরিবারের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক রেজাউল করিমের মাধ্যমে সরকারের সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ে একটি স্মারকলিপি প্রেরণ করা হয়। জেলা প্রশাসক সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেন। আটকেপড়াদের দেশে ফেরতের জন্য 'বাংলাদেশ-ভারত বর্ডার ভিকটিমস লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ফোরাম' থেকে রাজশাহী ও ঢাকার ভারতীয় দূতাবাস, ভারতীয় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বরাবর আবেদন করা হয়। ভারতীয় মানবাধিকার কমিশন বিষয়টি ডায়েরিভুক্ত করে। যার নম্বর ৪৮৫২৭/ সিআর/২০২০। তারা আবেদনটি ৭৯ নম্বর মামলা ৩.৪.২০২০ তারিখের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। বিষয়টি তারা আমাকে জানিয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনও ভারতীয় দূতাবাসকে লিখিত জানিয়েছে।
ইতোমধ্যে আটকদের দেশে ফেরতের দাবিতে দেশে-বিদেশে মানবাধিকার, নাগরিক সংগঠন এবং ব্যক্তি পর্যায়ে বিভিন্ন তৎপরতা দেখা যায়। ঢাকা ও কুড়িগ্রামে একাধিকবার মানববন্ধন হতে দেখা যায়। বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচারের কারণে আমরা এসব তৎপরতা অবগত। বিষয়টি যাতে দ্রুত নিষ্পত্তি হয়, সে জন্য ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ধুবড়ি জেলা লিগ্যাল এইড সেলের একজন আইনজীবীকে ২৬ বাংলাদেশির জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি জানিয়েছিলেন রাজশাহীর ভারতীয় দূতাবাসের সহকারী হাইকমিশনার সঞ্জীব কুমার ভাটি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত বর্ডার ভিকটিমস লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ফোরামের অনুরোধে ভারতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান 'মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ-মাসুম' দুই আইনজীবী নিয়োগ করেছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে বাংলাদেশ দূতাবাসের গুয়াহাটির সহকারী হাইকমিশনার তানভীর রসুল ধুবড়ি জেলে আটক ২৬ বাংলাদেশির সঙ্গে দেখা করেছেন। তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাদের মুক্তির জন্য দূতাবাসের পক্ষ থেকেও একজন আইনজীবী নিয়োগ দিয়েছেন। একটি বিষয় পরিস্কার যে, এই আটক ২৬ বাংলাদেশির জন্য বেশকিছু তৎপরতা হয়েছে। আগামী ৬ জুলাই পুলিশ প্রতিবেদন সাপেক্ষে সেখানকার আদালতে শুনানির জন্য দিন ধার্য হয়েছে।
এই মুহূর্তে দরকার হচ্ছে তাদের কাঙ্ক্ষিত মুক্তি ও দেশে ফেরত আসা। এ কথা স্বীকার করতে বাধা নেই যে, উভয় দেশের সীমান্তে চোরাচালান হয়। কিন্তু যে ২৬ বাংলাদেশি ভারত ভ্রমণে গিয়ে আটক হয়েছেন, তারা কেউ চোরাকারবারি নন। আমি দায়িত্ব নিয়েই বলছি তাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে কোনো মামলা নেই। ভারতীয় পুলিশ তাদের আটকের সময় তাদের কাছ থেকে কোনো বেআইনি দ্রব্য পায়নি। তাদের বিরুদ্ধে চোরাকারবারের অভিযোগ আনেনি। এই আটকরা বেআইনি পথে সে দেশে যাননি। ভারত সরকারের প্রদত্ত ভিসা বা ভ্যালিড ট্রাভেল ডকুমেন্টে নিয়ে ভ্রমণে গেছেন তারা। সঙ্গত কারণে তারা অনুপ্রবেশকারী নন। যে কারণে বাংলাদেশ সরকার তার নাগরিকদের সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছে। এ উদহারণ নেই- এযাবৎকালে বাংলাদেশ সরকার কোনো চোরাকারবারিকে ফেরত আনতে সহযোগিতা দিয়েছে।
যে লকডাউনের কারণে ২৬ জন সময়মতো ফিরতে পারেননি, তা ভারত রাষ্ট্র প্রদত্ত আদেশ। লকডাউনে ইমিগ্রেশন ও পরিবহন বন্ধ থাকায় তারা দেশে ফিরবে কীভাবে? এই সময়কালে তাদের ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার দায় ভারতীয় লকডাউন প্রক্রিয়ার। তারা যেখানে লকডাউনের শিকার ছিলেন সেখানে তারা বাধ্য হয়েই থেকেছেন। চলমান লকডাউনের কারণে ভিসার মেয়াদ শেষ হলেও অনেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আটকা পড়ে আছেন। সেসব দেশের সরকার তাদের ভিসার মেয়াদ নির্বাহী আদেশে বর্ধিত করেছে। এ জন্য হয়রানির শিকার হতে হয়নি। এ ধরনের সুবিধা পৃথিবীর বহু দেশেই ভারতীয় নাগরিকরাও পেয়েছেন।
বিষয়টিকে 'অ্যাক্ট অব গড' হিসেবে আমাদের বিবেচনা করা উচিত। কোনো অপরাধ প্রমাণের জন্য ইনটেনশন জরুরি। এখানে আটক বাংলাদেশিরা একান্তই নিরপরাধ ছিলেন। আমাদের দেশের সাগরপাড়ে ঝড়ের সময় প্রায়ই ভারতীয় জেলেরা বাংলাদেশের জলসীমায় এসে পড়েন। আমাদের রাষ্ট্র কিন্তু তাদের দেশে ফিরিয়ে দিয়েছে বারবার। গত দু'বছর আগের প্লাবনে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী থানার বিপরীতে ভারতীয় গীতলদহ এলাকার বেশ কয়েকটি পরিবার ধরলা নদীর বানের পানি থেকে বাঁচতে বাংলাদেশের চর গোরকমণ্ডলে আশ্রয় নেয়। তারা কয়েকদিন সেখানে থাকেন। আমাদের স্থানীয় নাগরিক ও প্রশাসন তাদের দেখভাল করেন। পানি নেমে গেলে তারা আবার ভারতীয় সীমানায় নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যান। এটি ছিল দৈব ঘটনা, রাষ্ট্র সদয় হয়েছিল। সে সময় ইচ্ছা করলে সীমান্ত অতিক্রমের অপরাধে তাদের আইনের আওতায় আনা অসম্ভব ছিল না।
ভারতের কাছে অনুরোধ- এই আটকরা দৈব দুর্ঘটনার শিকার। তাদের অবস্থানকালকে অ্যাক্ট অব গড বিবেচনা করে পরিত্রাণ দেওয়া। তাদের বিরুদ্ধে আনীত মামলাটি রাষ্ট্র প্রত্যাহার করতে পারে বা আদালত তাদের হাজতের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মুক্তি দিয়ে রিপ্যাট্রিয়েশনের আদেশ দিতে পারে। ইতোমধ্যে একজন বন্দিদশায় মৃত্যুবরণ করেছেন। হাজতবাসের মানসিক চাপ হয়তো তিনি ধারণ করতে পারেননি। তার মৃত্যুর কারণ ময়নাতদন্ত হলে পরিস্কার হবে।
আমরা আশা করি লাশ হয়ে ফেরা নয়, বাকিরা অন্তত ফিরুক জীবন নিয়ে। এই ফিরিয়ে দেওয়ায় ভারত রাষ্ট্র ছোট হবে না বরং বন্ধুত্বের ভাবমূর্তির উজ্জ্বলতায় আলোকিত হবে।
আইনজীবী ও সাবেক ছাত্রনেতা; বাংলাদেশ-ভারত বর্ডার ভিকটিমস লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স
ফোরামের আহ্বায়ক

আরও পড়ুন

×